Published On: Thu, Sep 13th, 2018

দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব আটকে রাখলে যেসব সমস্যা হতে পারে!

বাসায় টিভিতে সিরিয়াল দেখছেন কিংবা অফিসে কোনো মিটিংয়ে ব্যস্ত, এমন সময় প্রাকৃতিক ডাক আসতেই পারে। মস্তিষ্কে সংকেত এল টয়লেটে যাওয়া দরকার। ব্লাডার বা মূত্রথলিতে ইউরিন জমে তলপেটে চাপ শুরু হয়ে গেছে। আপনি মস্তিষ্কের সংকেত অগ্রাহ্য করলেন কিংবা প্রস্রাবের বেগ আটকে রাখলেন। টিভিতে সিরিয়াল শেষ হওয়ার অপেক্ষায় টয়লেটে গেলেন না। কিংবা যেখানে আছেন সেখানকার টয়লেট ব্যবহার করতে অস্বস্তিবোধ করায় কাউকে বলতেও পারছেন না। পুরুষদের জন্য বিভিন্ন জায়গায় পাবলিক টয়লেট থাকলেও মহিলাদের জন্য সে সুযোগ খুবই কম। দুপুরে প্রস্রাবের বেগ এলে তা আটকে রাখেন বাসায় যাওয়া পর্যন্ত। আপনি যদি নিয়মিত এ অভ্যাস চালিয়ে যান তবে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি অপেক্ষা করছে আপনার জন্যে। চলুন তা জেনে নেওয়া যাক।

কিডনিজনিত সমস্যার অনেকগুলো কারণের একটি হচ্ছে, প্রস্রাবের বেগ দীর্ঘসময় আটকে রাখা। একজন স্বাভাবিক ও সুস্থ মানুষের দৈনিক কমপক্ষে ৭-৮বার টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে প্রস্রাব করার জন্য। এটা স্বাভাবিক ঘটনা। এর চেয়ে যদি কম যাওয়া হয় তবে ধরে নিন আপনার শরীরে প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পান করা হচ্ছে না। শরীর থেকে অপ্রয়োজনীয় পানি মূত্রনালীর মাধ্যমে বেরিয়ে যায়। আর তাই পর্যাপ্ত পানি পান করার পর কিংবা তরলজাতীয় খাবার খাওয়ার পর দিনে কয়েকবার টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। ব্লাডার বা মূত্রথলিতে ১৫ আউন্স বা ৮ গ্লাস পরিমান লিকুইড বা পানি জমা রাখতে পারে। যখন ব্লাডারে ইউরিনের চাপ পড়ে তখন মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায় ব্লাডার খালি করার জন্য। আপনি যদি মস্তিষ্কের সংকেতকে কোনো পাত্তা না দিয়ে কাজে লেগে থাকেন দেখা যাবে একসময় আপনি এ সংকেত সহজে বুঝতে পারবেন না। ব্লাডারে ইউরিন বেশি সময় জমে থাকলে সেখানে ব্যাকটেরিয়া জন্মে। এতে করে ব্লাডার বা মূত্রথলিতে ইনফেকশনসহ কিডনির ক্ষতি হতে পারে। আর তাই পুরুষ কিংবা মহিলা কারো ক্ষেত্রেই প্রস্রাবের বেগ আটকে রাখা ঠিক নয়। এতে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকির আশংকা রয়েছে। টরন্টো ন্যাচারোপ্যাথিক হেলথ ক্লিনিকের চিকিৎসক ডা. শ্যামানদিপ বালি হাফিংটনপোস্টের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। টয়লেটের পরিবেশ এমন রাখা উচিত যাতে পরবর্তী ব্যবহারকারী স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবহার করতে পারেন। অনেক সময় নোংরা টয়লেটের কারণে অনেকে প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দিতে বিলম্ব করেন। আর তাই অনেক টয়লেটে এখন ভদ্রভাষায় লেখা থাকে, ‘For the comfort of the next users please leave the washroom as you would expect to find it.’ [১]

ডা. বালি বলেন, আপনি দীর্ঘ সময় ধরে আপনার প্রস্রাব আটকে রাখলে আপনার মূত্রথলটি হতে পারে ব্যাকটেরিয়ার প্রজনন ক্ষেত্র। আপনি যখন কোন মিটিং-এ থাকেন অথবা কোন গুরুত্বপূর্ণ ইমেইল পড়তে থাকেন তখন প্রাকৃতিক ডাকে সারা দেয়াটা আপনার কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। এছাড়াও আপনি হয়তো অফিসের টয়লেট ব্যবহার করতে অস্বস্তি বোধ করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে আপনার কিডনির যত্ন নেয়ার অর্থই হচ্ছে আপনি কখন বিপদজনক বলয়ে প্রবেশ করছেন তা বুঝতে পারা। মূত্রথলি গড়ে ১৫ আউন্স তরল ধরে রাখতে সক্ষম। দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব আটকে রাখলে তা আপনার মূত্রথলিকে প্রসারিত করে। যখন মূত্রথলি পরিপূর্ণ হয়ে যায় তখন সে মস্তিস্কে সংকেত পাঠায়, এটি মূত্রাশয়ের স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া। যার কারণে আপনি নিকটস্থ টয়লেটে যাওয়ার তাড়না অনুভব করেন। কিন্তু আপনি যদি প্রায়ই প্রস্রাব করা থেকে নিজেকে বিরত রাখেন তাহলে কখন আপনার প্রস্রাব করা প্রয়োজন তা জানার ক্ষমতা হারাতে পারেন আপনি- কথাটি বলেন টরন্টো এর ন্যাচারোপ্যাথিক হেলথ ক্লিনিকের ন্যাচারোপ্যাথিক চিকিৎসক ডা. চামনদীপ বালি। ডা. বালি বলেন, আপনি দীর্ঘ সময় ধরে আপনার প্রস্রাব আটকে রাখলে আপনার মূত্রথলটি হতে পারে ব্যাকটেরিয়ার প্রজনন ক্ষেত্র। এই ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ তৈরি করতে পারে, যা কিডনিতে ছড়িয়ে পড়লে শরীরের অনেক ক্ষতি হতে পারে।
যদিও প্রস্রাব করতে যাওয়ার সময় বের করাটা অনেক সময়ই বেশ কঠিন হয়ে যায়। টরন্টো জেনারেল হাসপাতালের ইউরোলজিস্ট ডা.মাইকেল রবিনেট এর মতে, স্কুল শিক্ষক এবং ক্রেন অপারেটর এই দুটি পেশার মানুষদের অন্য পেশার মানুষদের তুলনায় ওয়াশরুম ব্যবহার করতে দেখা যায় কম। ফ্লোরিডার সেন্ট পিটারসবারগ এর সানকস্ট মেডিকেল ক্লিনিকের ইউরোলজিস্ট ডা. মার্ক গরডন বলেন, ‘নারীরা পরিচ্ছন্নতার উদ্বেগের কারণে প্রস্রাব আটকে রাখেন বেশি’। ডা. গরডন বলেন, ‘স্বাভাবিক প্রস্রাবের হার দিনে ৮-১০ বার’।

দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব আটকে রাখার ফলে যে স্বাস্থ্যসমস্যাগুলো হতে পারে :  ১. মূত্রনালির সংক্রমণ: সাধারণত ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের কারণে হয়ে থাকে মূত্রনালির সংক্রমণ বা ইউটিআই। ইউটিআই হলে সংক্রমণ কিডনিতেও ছড়িয়ে যেতে পারে। এর ফলে প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়া, নিম্নমাত্রার জ্বর থাকা ও প্রস্রাবের প্রচণ্ড বেগ আসলেও প্রস্রাব খুব কম হওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা যায়। এক্ষেত্রে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।  ২. প্রস্রাবের সময় ব্যথা করা : দীর্ঘসময় ধরে প্রস্রাব আটকে রাখার ফলে প্রস্রাবের সময় তীব্র ব্যথা হতে পারে।  ৩. জ্বর: দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব আটকে রাখলে প্রস্রাবে উপস্থিত ব্যাকটেরিয়া শরীর থেকে বের হতে পারেনা। এর ফলশ্রুতিতে জ্বর আসতে পারে।  ৪. মূত্রাশয় ফুলে যাওয়া এবং ক্যান্সার: আপনি যখন পানি পান করেন তখন মূত্রাশয় আস্তে আস্তে পরিপূর্ণ হতে থাকে। তাই যখন এই পানি মূত্র হিসেবে শরীর থেকে বের হয়ে না যায় তখন মূত্রথলি ফুলে যায়। এর চিকিৎসা করা না হলে মূত্রাশয় ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে।  ৫. কিডনি পাথর: পানি কিডনিকে পরিষ্কার করে। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব আটকে রাখার ফলে কিডনির উপর মারাত্মক প্রভাব পরে। এর ফলে কিডনিতে পাথর হতে পারে।  ৬. সিস্টাইটিস: সিস্টাইটিস একটি সংক্রমণজনিত সমস্যা যা মূত্রনালির চারপাশে হয়। এটি নারীদের একটি বড় সমস্যা, যার কারণে মূত্রাশয়ের চারপাশের প্রাচীরে প্রদাহ হয়।  ৭. তলপেটে ব্যথা: দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব আটকে রাখলে তলপেটে তীব্র থেকে মাঝারি ধরণের ব্যথা হয়।  ৮. পাকস্থলীর সংক্রমণ: দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব আটকে রাখলে শুধু তলপেটে ব্যথা হবে এমন নয়, এর ফলে পাকস্থলীতে সংক্রমণ হওয়ারও ঝুঁকি থাকে।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>