জনপ্রিয় ওষুধ অ্যাসপিরিনের জানা-অজানা তথ্য!

বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষ হৃদরোগ প্রতিরোধের জন্য অ্যাসপিরিন সেবন করে থাকেন। আর অ্যাসপিরিন সেবনের ক্ষেত্রে সকালকেই বেছে নেন বেশিরভাগ সেবনকারী। কিন্তু এক গবেষণায় বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, ঘুমানোর আগে বা বেড টাইমে অ্যাসপিরিন সেবনই বেশি উপকারী। বিশেষজ্ঞদের মতে সকালে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অন্য সময়ের চেয়ে তিনগুণ বেশি। আর নিয়মিত স্বল্প মাত্রার অ্যাসপিরিন সেবনের ফলে রক্ত কিছুটা পাতলা হয় এবং রক্তের অণুচক্রিকা বা প্লাটিলেট জমাট বাঁধতে দেয় না।

অ্যাসপিরিন আসলে কী? অ্যাসপিরিন বস্তুত সেলিসাইলিক এসিডের একটি উপজাত কম্পাউন্ড। সেলিসাইলিক এসিড উত্তেজক ওষুধ বিধায় এটা সরাসরি মুখে খাওয়া যায় না, একে ল্যাবরেটরি সিনথেসিসের মাধ্যমে বিভিন্ন উপজাত প্রস্তুত করে শরীরের অভ্যন্তরে ব্যবহারের উপযোগী করা হয়। ১৮৫৩ সালে অ্যাসপিরিন আবিষ্কৃত হয় এবং ১৮৯৯ সালের পর থেকে এটা ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আগেই ধারণা দেয়া হয়েছে যে, অ্যাসপিরিন (এসিটাইল সেলিসাইলিক এসিড) একটি প্রাক-ওষুধ, শোষণের পর সেলিসাইলিক এসিডে রূপান্তরিত হয়, যা ওষুধের active form অর্থাৎ এই সেলিসাইলিক এসিডই ওষুধের কার্যাবলি সম্পন্ন করে। পৃথিবীতে হাতেগোনা কয়েকটি ওষুধের মধ্যে অ্যাসপিরিনই প্রধানতম ওষুধ যার রয়েছে বহুবিধ উপকারিতা।

১. ব্যথানাশক হিসেবে (হালকা থেকে মাঝারি): ১. মাথাব্যথা ২. মাংসপেশির ব্যথা ৩. হাড় ও হাড়সন্ধির ব্যথা ৪. দাঁতের ব্যথা।  ২. প্রদাহনিরোধী হিসেবে: ১. রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস (বাত), ২. রিউম্যাটিক ফিভার (বাতজ্বর), ৩. এনকাইলোজিং স্পনডাইলোসিস, ৪. অস্টিওআর্থ্রাইটিস, ৫. একিউট অ্যান্ড ক্রোনিক গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস।  ৩. জ্বরনাশক হিসেবে:  ডেঙ্গুসহ যেসব রোগে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি থাকে সেসব রোগ ছাড়া এবং বাতজ্বরসহ অন্যান্য জ্বরনাশক হিসেবে।  ৪. রক্ত জমাটরোধক হিসেবে: ১. ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ ও মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন (হৃদরোগ) ২. আর্টারিয়াল থ্রোমবোএমবোলিজম ৩. পালমোনারি এমবোলিজম ৪. এথেরোস্কেরোটিক ডিজিজ ৫. পোস্ট-অপারেটিভ ডিপ ভেন থ্রোমবোসিস  ৫. লোকাল ব্যবহার: ১. অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে, ২. ছত্রাকনাশক হিসেবে, ৩. চর্মরোগ- কেরাটোলাইটিক এজেন্ট হিসেবে।  ৬. অন্যান্য উপকারিতা: ১. মেয়েদের মাসিকের ব্যথায় অ্যাসপিরিন খুবই কার্যকর ও ফলপ্রসূ ওষুধ হিসেবে প্রমাণিত। ২. অন্ত্রে সংক্রমণে ব্যবহৃত হয়। যেমন- কলেরা, ইনফেকটিভ ডায়রিয়া ইত্যাদি। ৩. চোখের রোগ ক্যাটারেক্ট রোধে ভূমিকা পালন করে। ৪. পুরুষের বীর্য সিনথেসিসে কার্যকর বলে ধারণা করা হয়। ৫. জটিল চর্মরোগ-সিসটেমিক লুপাস ইরাইথেমেটোসাসে ব্যবহৃত হয়। ৬. বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে গর্ভকালীন খিঁচুনিতে ব্যবহৃত হয়। ৭. রোগ নির্ণয়- জরায়ুর মুখে ক্যান্সার নির্ণয়ে ব্যবহৃত হয়।

প্রয়োগপথ ও প্রক্রিয়া: সাধারণত মুখে খাওয়ার ওষুধ হিসেবে ও চর্মে স্থানিক ব্যবহৃত হয়ে থাকে। পাকস্থলীতে (stomach) প্রদাহ করে বিধায় ওষুধটি অবশ্যই ভরাপেটে বা আহারের মাঝে সেবন জরুরি। কয়েকটি রোগে ওষুধের মাত্রা : ১. সাধারণ মাত্রা : ৩০০ মিগ্রা করে প্রতিদিন তিনবার, ২. বাতজ্বর : ৫০ মিগ্রা/ কে জি দৈহিক ওজন/ প্রতিদিন, ৩. হৃদযন্ত্র ও ধমনী রোগে মাত্রা: ক. একিউট মারোকার্ডিয়াল ইনফার্কশন- প্রাথমিকভাবে-৩০০ মিগ্রা প্রতিদিন।  ধারাবাহিকভাবে ১০০ মিগ্রাম–১৫০ মিগ্রা প্রতিদিন।  বাতজ্বর- মাত্রা : ৭৫ মিগ্রা থেকে ১০০ মিগ্রা/কে জি দৈহিক ওজন/প্রতিদিন।

কয়েকটি ওষুধের সাথে অ্যাসপিরিনর আন্তঃক্রিয়া  ১. অ্যাসপিরিনের সাথে যদি স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ দেয়া হয় তবে অ্যাসপিরিন দ্রুত শরীর থেকে বেরিয়ে যায়, যার ফলে অ্যাসপিরিনের কার্যকারিতা কমে যায়।  ২. অ্যাসপিরিনের সাথে যদি মুখে খাওয়ার ডায়াবেটিক ওষুধ ব্যবহার করা হয় তবে অ্যাসপিরিনের কার্যকারিতা কমে যায়।  ৩. অ্যাসপিরিন গ্রহণের সাথে এন্টাসিড গ্রহণ যুক্তিসঙ্গত নয়, কারণ এন্টাসিড অ্যাসপিরিন শোষণে বাধা দেয়, এমনকি অ্যাসপিরিনের ব্যথানাশক গুণ কমিয়ে দেয়। সে ক্ষেত্রে এন্টাসিডের বদলে রেনিটিডিন, ফেমোটিডিন, ওমিপ্রাজল ইত্যাদি অ্যান্টিআলসার ওষুধ ব্যবহার করা উচিত।  ৪. অ্যাসপিরিনের সাথে পেনিসিলিন জাতীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে পেনিসিলেনের কার্যকাল বৃদ্ধি পায়, সে ক্ষেত্রে পেলিসিলিনের বিষক্রিয়া হতে পারে।

সতর্কতা: অ্যাসপিরিন অত্যন্ত জনপ্রিয় ওষুধ বিধায় এর ব্যবহার অনেক বেশি। সে জন্য অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে কিছু সতর্কতার প্রতি লক্ষ রাখতে হবে। ডেঙ্গুসহ যেসব রোগে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি থাকে সেসব রোগে অ্যাসপিরিন ব্যবহার নিষেধ। অ্যাসপিরিন পাকস্থলীতে এসিড নিঃসরণ বাড়ায় বিধায় হাইপারএসিডিটিম ও পেপটিক আলসার রোগীদের এ ওষুধ ব্যবহার নিষেধ। এ ছাড়া লিভার ও কিডনি রোগ, হাঁপানি, গেঁটে বাত, গর্ভাবস্থায় (বিশেষ শেষ তিন মাস) এ ওষুধ ব্যবহার নিষেধ।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>