কখন বুঝবেন যে আপনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত!

ডায়াবেটিস হলে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। পরিমিত খাবার, শারীরিক শ্রম ও ক্ষেত্রবিশেষে ওষুধ সেবনের মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়েও সুস্থ থাকা যায়। তবে সবচেয়ে আগে প্রয়োজন রোগটি শনাক্ত করা। অনেক ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগী জানেন না যে রোগটি পুষছেন। তাই আগে জানা প্রয়োজন ডায়াবেটিস আছে কি না! কিন্তু কী করে জানবেন সেটা? আসুন, দেখে নিই ডায়াবেটিস রোগের প্রধান লক্ষণগুলো কী কী?
১. ঘন ঘন পানির পিপাসা।  ২. ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া।  ৩. অতিরিক্ত ক্ষুধা।  ৪. শরীরের ওজন কমে যাওয়া।

অন্যান্য উপসর্গ: প্রধান লক্ষণগুলো ছাড়াও এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরে নানা উপসর্গ দেখা যায়। এসব হলো শরীরে চুলকানি, বাত ব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখা, ঘন ঘন চশমা বদল, পা জ্বালাপোড়া করা এবং অবশ বোধ করা, কাটা-ছেঁড়া সহজে না শুকানো। যদি আপনার এসব শারীরিক উপসর্গ থাকে তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

কাদের ঝুঁকি আছে: এ ছাড়া লক্ষণ না থাকলেও প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক লোকজনেরই ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে যাদের ওজন বেশি, কায়িক পরিশ্রম করে না যারা, যাদের বাবা-মা, ভাইবোনের ডায়াবেটিস আছে, যারা উচ্চ রক্তচাপের রোগী, যাদের রক্তে এইচডিএল কোলেস্টেরল ৩৫–এর নিচে এবং ট্রাইগ্লিসারাইড ২৫০–এর বেশি। যেসব নারীর গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস রোগ ধরা পড়েছিল ও যাঁদের হৃদ্‌রোগ রয়েছে।

শিশুদের ক্ষেত্রে: যেসব শিশুর ওজন বেশি, যাদের বাবা-মা, দাদা-দাদি, ফুফু, ভাই-বোনের ডায়াবেটিস আছে, যাদের শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দিয়েছে, যাদের জন্মের সময় ওজন কম ছিল এবং যেসব শিশুর মায়ের গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে।  গর্ভকালীন ডায়াবেটিস: গর্ভাবস্থায় কখন ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা প্রয়োজন তা অনেকেই জানেন না। এ ক্ষেত্রে গর্ভধারণের পরপরই একবার ডায়াবেটিস পরীক্ষা করতে হবে পাশাপাশি গর্ভকালীন ২৪-২৮ সপ্তাহের সময়ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা প্রয়োজন। যাদের গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হয় তাঁদের প্রসবের ছয়-বারো সপ্তাহ পর পরীক্ষা করতে হবে। আপনি কি ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে আছেন? অতিরিক্ত ক্ষুধা বা তৃষ্ণা, ওজন কমা, দৃষ্টিশক্তি হ্রাস প্রভৃতি উপসর্গ সাধারণত ডায়াবেটিসের লক্ষণ। কিন্তু লক্ষণগুলো সব সময় না-ও থাকতে পারে। প্রতি ২ জন ডায়াবেটিস রোগীর মধ্যে ১ জন জানেন না যে তিনি এ রোগে আক্রান্ত। অনেক ক্ষেত্রে চোখের জটিলতা, হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, কিডনি জটিলতা, পায়ে পচন, খোস-পাঁচড়া প্রভৃতি জটিলতা নিয়ে ডায়াবেটিস শনাক্ত হয়। সঠিক সময়ে রোগনির্ণয় তাই ডায়াবেটিসের চিকিৎসা ও জটিলতা প্রতিরোধের অন্যতম পূর্বশর্ত। তাই ডায়াবেটিসের কোনো লক্ষণ না থাকলেও যাঁরা ঝুঁকিতে রয়েছেন তাঁদের নিয়মিত ডায়াবেটিস পরীক্ষা করানো উচিত।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে করণীয়:  বর্তমান বিশ্বে যে রোগগুলো জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে তার মধ্যে ডায়াবেটিস অন্যতম। এটি কোন জীবাণু ঘটিত বা ছোঁয়াচে রোগ নয়। শরীরে প্রয়োজনীয় হরমোন ইনসুলিনের অভাবে অথবা ইনসুলিনের কার্যকারিতা হ্রাস পাওয়ার কারণে এই রোগ দেখা দেয়। অতিরিক্ত মোটা ব্যক্তি যারা অধিক খাদ্য গ্রহণ করেন এবং যারা কায়িক পরিশ্রম করেন না বা কম করেন তাদের এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। কোন কোন ক্ষেত্রে পূর্ব পুরুষের এই রোগ থাকলে ডায়াবেটিস হতে পারে। গর্ভকালীন সময়েও এই রোগ হতে পারে। আগে বলা হতো কোন ব্যক্তির বারবার প্রস্রাব হলে সে ডায়াবেটিসে বা বহুমূত্র রোগে আক্রান্ত। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে বার বার প্রস্রাব হলেই ডায়াবেটিস না বরং বিভিন্ন উপসর্গ পর্যালোচনা করে এবং রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করে কেবল ডায়াবেটিস রোগ শনাক্ত করা যায়। খালি পেটে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ৭ মিলিমোল/লিটার বা তার বেশি হলে এবং খাবার ২ ঘণ্টা পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ১১.১ মিলি মোল/লিটার বা তার বেশি হলে ডায়াবেটিস হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। ডায়াবেটিস মূলত ২ ধরনের। টাইপ-১ বা ইনসুলিন ডিপেনডেন্ট ডায়াবেটিস মেলাইটাস যা ইনসুলিন উত্পাদন কম হলে বা না হলে দেখা দেয়। টাইপ-২ বা নন ইনসুলিন ডিপেনডেন্ট ডায়াবেটিস মেলাইটাস যা ইনসুলিন ঠিকমত কাজ না করলে বা উত্পাদন অনুপাতে রোগীর শরীরের ওজন বেশি হলে দেখা দেয়। এছাড়াও গর্ভকালীন সময়েও রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যায়। কিন্তু সন্তান জন্ম দানের পর সেরে যায়। কিন্তু সচেতন না থাকলে পরবর্তীতে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। ডায়াবেটিস হলেই ভয়ের কিছু নেই যদি তা নিয়ন্ত্রণে থাকে। পরিমিত খাদ্য গ্রহণ, কায়িক পরিশ্রম যেমন-দৈনন্দিন কাজ-কর্ম, নিয়মানুযায়ী হাঁটা ও ব্যায়াম করা, উচ্চতা অনুযায়ী শরীরের ওজন সঠিক রাখা ইত্যাদি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন বা ইনসুলিন ইঞ্জেকশন নিতে হবে। অনেক সময় রক্তের গ্লুকোজের পরিমাণ কমে গেলে বা বেড়ে গেলে রোগী অসুস্থ বোধ করতে পারেন। সেই ক্ষেত্রে গ্লুকোমিটার দিয়ে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ মেপে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অনেকে ডায়াবেটিস হলে খাবার একেবারেই বন্ধ করে দেন। কিন্তু এই ক্ষেত্রে জটিলতা আরো বেড়ে যায়। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় কার্বোহাইড্রেডযুক্ত খাবারের চেয়ে প্রোটিনযুক্ত খাবারের সংখ্যা বেশি থাকে। পাশাপাশি প্রতিদিন মৌসুমি ফলের মধ্যে যে কোন ১টি ফল খেতে হবে। এছাড়াও ডায়াবেটিস রোগীদের হাত-পায়ের যত্ন নিতে হবে। ডায়াবেটিস রোগীদের যে কোন ক্ষত শুকাতে সময় নেয়। তাই সতর্ক থাকতে হবে যেন শরীরে কোন ক্ষত না হয়। ধূমপান, মদ্যপান বা সাদা পাতা-জর্দ্দা দিয়ে পান খাওয়ার অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে। দৈনিক ৪০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা হাঁটার অভ্যাস করতে হবে। যাদের এখনও ডায়াবেটিস হয়নি কিন্তু হওয়ার সম্ভাবনা আছে সেই ক্ষেত্রে তাদেরও সচেতন থাকতে হবে।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>