৩০০০ বছর আগে থেকে ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে রসুন!

রসুন একটি শক্তিশালী-সুগন্ধযুক্ত, তেজী-স্বাদযুক্ত ঔষধি। এটি খাদ্য স্বাদ বাড়তে মসলা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। শত্তিশালী সুগন্ধের কারণে সবজি, মাংস থেকে শুরু করে কাচ্চি, কারি রান্না রসুন ছাড়া চিন্তাই করা যায় না। উপমহাদেশের রান্নায় দীর্ঘদিন ধরেই রসুন ব্যবহার হচ্ছে। কেবল উপমহাদেশে না পৃথিবীর প্রায় সব জায়গায়ই এখন রসুন মসলা হিসেবে পরিচয় লাভ করেছে। শুধুমাত্র রান্নার স্বাদ বাড়াতে নয় বরং ঐতিহ্যগতভাবেই এটি ঔষধী হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রায় ৩০০০ বছর আগে থেকে রসুন ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিশ্বের প্রায় সব স্থানেই রসুনকে বিভিন্ন রোগ নিরায়মের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। উপাদান হিসেবে রসুনে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ময়শ্চার, প্রোটিন, ফ্যাট, মিনারেল ফাইবার ও কার্বোহাইড্রেট। ভিটামিন ও মিনারেলের মধ্যে রয়েছে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, থিয়ামিন, রিবোফ্লোভিন, ভিটামিন সি। এছাড়া রসুনে আয়োডিন, সালফার ও ক্লোরিনও রয়েছে অল্প পরিমানে। রসুনের উপকারিতার বিষয়টি দিন দিন চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুত্ব পাচ্ছে। বিজ্ঞানের জনক বলে পরিচিত হিম্পোক্রিটস মানবদেহের ক্যান্সার, ঘা, কুষ্ঠ সারাতে, রোগ সংক্রমণ প্রতিরোধ ও পরিপাকতন্ত্রের হজমজনিত সমস্যা দূর করতে রোগীকে রসুন খাওয়ার পরামর্শ দিতেন বলে জানা যায়। এটি শরীরে সেলেনিয়াম ও ভিটামিন সি’র মাত্রাকে বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে যা শরীর পক্ষে অত্যন্ত উপযোগী৷ নিয়মিত কাঁচা রসুন সেবনে মোট কোলেস্টেরলের মাত্রা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে। কাঁচা রসুন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, বিভিন্ন সংক্রমণ রোধ করে, ক্ষত দূরীকরণে সাহায্য করে, সর্দিকাশি ও প্রদাহ দূর করে।

লুই পাস্তুর পাস্তুরাইজেশন আবিষ্কার করে বিখ্যাত হয়েছিলেন। ১৮৫৮ সালের দিকে তিনি রসুনের এন্টি ব্যাকটেরিয়াল গুনাগুনের কারনে একে ব্যবহার করেন। রসুনে রয়েছে এলিসিন যা ব্রডস্পেকট্রাম যা অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে কাজ করে। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে সার্জনরা রসুনের জুসকে আহত লোকদের চিকিৎসায় এন্টিসেপটিক হিসেবে ব্যবহার করতেন। কাঁচা রসুন চিবিয়ে খাওয়ায় শরীরে ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাশ প্রতিরোধী ক্ষমতা তৈরি হয়। এসব কারনে রসুনকে গরিবের পেনিসিলিন বলা হয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাঝারি সাইজের একটি রসুনে এক লাখ ইউনিট পেনিসিলিনের সমান অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যক্ষমতা রয়েছে। শুধু তাই নয়, ব্যাকটেরিয়া ও প্রোটোজোয়ার মাধ্যমে সৃষ্টি অ্যামিবিক ডিসেনট্রি নির্মূলের ক্ষেত্রে রসুন বেশ কার্যকরী বলে জানা যায়। চিকিৎসকেরা রসুনকে “সুপার ফুড” হিসেবে গণ্য করে থাকেন। কেন জানেন? কারণ এই শতকের সবথেকে ভয়ঙ্কর দুটি রোগ, ব্লাড প্রেসার এবং হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা কমায় রসুন। চলুন দেখে নেই রসুনের উপকারীতাগুলো।

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে: রসুনে রয়েছে Allicin নামক উপাদান। এটি রক্তের এনজিওটেনসিন ২ (এমন একটি প্রোটিন যা দেহের রক্তচাপ উঠানামার জন্য জন্য দায়ী) এর ক্ষতিকর ক্রিয়াতে বাধা দেয় এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া রসুন থাকা সাইফাইডের যৌগ পলিসালফাইড রক্তের ধমনীকে প্রসারিত করে যার ফলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রিত হয়।  অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল: হাজার বছর ধরেই রসুন অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। রসুনে বিদ্যমান অ্যালিসিন যা ব্রডস্পেকট্রাম যা প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করে, তাই রসুনকে প্রাকৃতিক অ্যান্টি-বায়োটিক বলা হয়। বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়াল, প্যারাসাইটিক ইনফেকশন সারানোর জন্য রসুন ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এ সব কারনে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের সময় ডাক্তাররা রসুনকে এন্টিসেপটিক হিসেবে আহতের উপর প্রয়োগ করতেন। গবেষণায় পাওয়া যায়, শিশুদের কৃমি দূর করতে রসুনের নির্যাস ভাল কাজে দেয়। রসুনের নির্যাস থেকে ‘মাউথ ওয়াশ’ তৈরি করা যায়। এই মাউথ ওয়াস নিয়মিত ব্যবহারে মাড়িতে ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার বন্ধ হয়।  ক্যানসার প্রতিরোধে: নিয়মিত রসুন সেবনে কোলন ক্যানসার প্রতিরোধ হয়ে থাকে। মেয়েদের স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়। এমনকি রেক্টাল ক্যানসারের হাত থেকে রক্ষা করে। গলব্লাডার ক্যানসার হওয়া থেকেও মুক্ত রাখে। রসুন প্রোস্টেট ক্যানসার প্রতিরোধে অনেক বড় ভূমিকা পালন করে। এই রসুন ইস্ট ইনফেকশন দূর করতে সাহায্য করে। এছাড়া নিয়মিত রসুন সেবনে শরীরে সব ধরনের ক্যানসার প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়। রসুনে diallyl sulphide এর উপস্থিতির কারনে এর রয়েছে অ্যান্টিক্যান্সার গুনাগুন। বিভিন্ন গবেষণা থেকে দেখা যায় যে এই diallyl sulphide ক্যান্সার সেলকে রূপান্তরে বাধা দেয়।  হৃদরোগ থেকে বাঁচতে: হৃদপিন্ডের সুস্থতায় রসুন অনেক উপকার আসে বলে জানা যায়। রসুন কোলেস্টরল কমাতে সাহায্য করে। যে কারনে হার্ট অ্যাটাকের ঝুকি কমে যায় । প্রতিদিন রসুনের কয়েকটি কোয়া কাঁচা বা আধা সিদ্ধ করে সেবনে কেলেস্টেরলের মাত্রা কম হয় । আবার রসুন রক্তচাপ ও রক্তে চিনির মাত্রা ঠিক রাখতেও কাজ করে। রসুনের মধ্যে থাকা সালফার-ভিত্তিক যৌগ অ্যালিসিন মূলত এ কাজ করে। এ ক্ষেত্রে মানে রাখা ভাল যে রসুন কাঁচা সেবন সবচেয়ে ভালো। রসুন সিদ্ধ করা হলে অ্যালিসিনের পরিমান কমে যায়।

রক্ত পরিষ্কার করতে: ব্রণের সমস্যা দূর করতে ব্যর্থ হলে তা গোঁড়া থেকে নির্মুল ককরতে হবে। দুই কোয়া রসুন হালকা গরম পানির সঙ্গে খেয়ে নিন, এটি রক্ত পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। ফলে ত্বকের স্বাস্থ্য ভালো থাকে। অনেক সময় শরীরে আঁচিল হয়ে থাকে, এই রসুনের রস আচিলের ক্ষেত্রেও উপকার করে।  পেটের কৃমি নিরাময়: রসুন পেটের কৃমি নিরাময়ে অনেক উপকার করে থাকে। এ কারনে অনেকেই রসুন খেতে উপদেশ দিয়ে থাকেন। ঠান্ডা ও জ্বরের মহৌষধ: প্রায়ই ঠান্ডা ও জ্বরে আক্রান্ত হন এমন ব্যক্তির জন্য রসুন খুব ভাল ওষধ হিসেবে কাজ করতে পারে। শরীর থেকে জ্বর আর ঠান্ডা দূর করার জন্য প্রতিদিন দু-তিন কোয়া রসুন কাঁচা খেতে পারেন। এ ছাড়া রান্না করা বা চায়ের সাথেও রসুন খাওয়া যেতে পারে। কেউ কেউ হয়ত রসুনের গন্ধ সহ্য করতে কষ্ট হয় । সে ক্ষেত্রে রসুনের সাথে আদা ও মধু মিশিয়ে নেওয়া যেতে পারে। এভাবে নিয়মিত সেবনে শুধু সাময়িক দূর হবে না বরং শরীরে ঠান্ডা ও জ্বরের প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে।  ত্বক ও চুলের যত্নে: নিয়মিত রসুন সেবনে ত্বক সুন্দর হয় ও বয়সের ছাপ দূর হয়। এ ছাড়া ফাঙ্গাশ ও ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ থেকে ত্বক সুরক্ষায় নিয়মিত রসুন সেবন করা যেতে পারে। দাদ, খোস পাচড়া ধরনের চর্মরোগ থেকে রসুন উপকার দেয়। চামড়ায় ফোসকা পড়ার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেয় রসুন। চুল পড়া বন্ধ করতে রসুনের ব্যবহার হয়। আবার নতুন চুল গজাতে রসুন ভালো কাজ করে। ত্বক ও চুলের উপকার পেতে নিয়মিত রসুনের নির্যাস বা রসুন সমৃদ্ধ তেল ব্যবহার করতে হবে। — ১ কোয়া রসুন, ১ টেবিল চামচ ওটমিল পাউডার, ৩ ফোঁটা টি ট্রি অয়েল এবং ১ চা চামচ মধু নিন। এবার এই উপকরণ গুলো একসঙ্গে ব্লেন্ড করে পেস্ট তৈরি করুন। মিশ্রণটি পাতলা আবরণে নাকে লাগিয়ে রাখুন ৫ মিনিট। স্ক্রাব করে ধুয়ে ফেলুন। দূর হবে ব্ল্যাকহেডস।

রক্তকে পরিশুদ্ধ: কাঁচা রসুন রক্তকে পরিশুদ্ধ করে, তার ফলে ত্বক ভেতর থেকে পরিষ্কার হয়। সকালে উঠে খালি পেটে দু’কোয়া রসুন খান আর প্রচুর পরিমাণে পানি পান করুন দেখবেন ব্রণর সমস্যার সমাধান হচ্ছে।  চোখে ও দাঁতের যত্নে রসুন: রসুন চোখের ছানি পড়ার হাত থেকে রক্ষা করে। আবার দাঁতের ব্যথা সারাতে রসুন সাহায্য করে থাকে।  কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়: রসুনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। নিয়মিত রসুন খেলে রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে থাকে।  হজমের সমস্যা মুক্তি: রসুনের কোয়া কুচি করে নিয়ে তা সামান্য ঘিয়ে ভেজে নিন। এ ভাজা রসুন সবজির সাথে কিংবা খালি খাওয়ার অভ্যাস করুন। এর ফলে হজমের নানা সমস্যা থেকে মুক্তি পাবেন। অন্যদিকে এ অভ্যাসের ফলে কোস্টকাঠিন্যে সমস্যারও সমাধান পেতে পারেন।  শরীরের ফোড়া সারাতে: শরীরের যে কোন স্থানে পুজ ও ব্যথাযুক্ত ফোড়া হলে রসুনের রস তা সারাতে সাহায্য করে থাকে। যেখানে এই পুজ বা ফোড়া হবে, সে স্থানে রসুনের রস লাগিয়ে ১৫মিনিট পরে শুকিয়ে গেলে ধুয়ে ফেলুন। খুব দ্রুতই এর সুফল পাবেন।  অ্যালার্জি প্রতিরোধে: রসুনের মাঝে থাকা কিছু যৌগ যেমন diallyl sulphide ও thiacremonone এর কারনে রসুনের রয়েছে অ্যান্টিআর্থ্রাইটিক গুনাগুন। এই যৌগগুলোর কারনে রসুন অ্যালার্জি জনিত শ্বাসনালীর প্রদাহ নিরাময় করতে সহায়তা করে। কাঁচা রসুনের রস ব্যবহারের ফলে পোকার কামড় বা র‍্যাশের কারনে যে চুলকানির সৃষ্টি হয় সেটা কমিয়ে দেয়।

জমে যাওয়া কফ থেকে মুক্তি: অনেক দিন ধরে জমে থাকা কফের জন্য রসুন অনেক উপকারি ঔষধ হিসেবে কাজ করে। অল্প পরিমাণ তেলে ১/২ কোয়া রসুন ভেজে তা ১ টেবিল চামচ মধুর সাথে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার খেয়ে ফেলুন। এভাবে নিয়মিত সেবনে বুকে জমে যাওয়া কফ থেকে রেহাই পাওয়া পায়।  শরীরকে ডি-টক্সিফাই করা: শরীরকে ডি-টক্সিফাই করতে রসুন অন্যান্য ঔষধের তুলনায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রসুন প্যারাসাইট, ডায়াবেটিস, জেদ, সাঙ্ঘাতিক জ্বর, কৃমি পরিত্রাণ, বিষণ্ণতা ইত্যাদির এর মত বড় বড় রোগ প্রতিরোধ করতে সহায়তা করে।  শ্বসন সংক্রান্ত সমস্যা: রসুন যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিস, ফুসফুসের কনজেশন, হাপানি, হুপিং কাশি ইত্যাদি প্রতিরোধ করে। রসুনের মধ্যে শ্বসন জনিত সকল রোগ আরোগ্যের করার উপাদান বিদ্যমান রয়েছে। যদি কারো যক্ষ্মা বা টিবি জাতীয় কোন সমস্যা ধরা পড়ে তাহলে সারা দিনে একটি রসুনকে কয়েক ভাগে ভাগ করে খেলে যক্ষ্মা রোগ উপশম হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>