পায়ে পানি আসার কারণ কি? জেনে নিন এর চিকিৎসা!

দুই পা ফুলে যাওয়া বা পায়ে পানি আসা একটি খুবই মারাত্মক রোগের লক্ষণ। শরীরের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় অঙ্গের যেমন হৃদযন্ত্র, লিভার, কিডনি, খাদ্যনালীর কাজের ব্যাঘাত ঘটলে পায়ে ও গায়ে পানি আসে। নিম্নে গায়ে ও পায়ে পানি আসার কয়েকটি কারণ সম্বন্ধে আলোচনা করা হলোঃ

১. হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা কমে গেলে (Congestive Cardiac Failure)  উচ্চ রক্তচাপ, হার্টের রক্ত চলাচলের ব্যাঘাত, হূদযন্ত্রের ভাল্বের সমস্যা হলে, হার্টের মাংসপেশীর কার্যকারিতা কমে আসে ফলে পায়ে, পেটে, বুকে পানি আসে। এসব রোগীর বুকে ব্যথা, উচ্চ রক্ত চাপ, বুক ধড়ফড় করা, অতিরিক্ত ক্লান্তবোধ, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি লক্ষণ থাকে।  ২. লিভারের সমস্যা  লিভার সিরোসিস হলে প্রথমে পেটে ও পরে পায়ে ও বুকে পানি জমে যায়। হেপাটাইটিস ভাইরাস বি ও সি, অতিরিক্ত মধ্যপান, লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমে লিভারের সিরোসিস হয়। এসব রোগীর খাবারে অরুচি, হলুদ প্রস্রাব, রক্ত বমি ইত্যাদি লক্ষণ থাকে।  ৩. কিডনীর সমস্যা- নেফ্রোটিক সিনড্রোম  নেফ্রাইটিস ও কিডনী বিকল হলে প্রথমে মুখে, পরে পায়ে ও বুকে পানি আসে। এসব রোগীর বেশী বেশী প্রস্রাব, বমি বমি লাগা, খাবারে অরুচি, প্রস্রাব ফেনা ফেনা, প্রস্রাবের রং ঘন সরিষার তেলের মত, কম প্রস্রাব হওয়া ইত্যাদি লক্ষণ থাকে।  ৪. রক্তে আমিষের মাত্রা কমে গেলে  পরিমিত খাবার না খেলে, হজম না হলে, খাদ্য নালী থেকে আমিষ বের হয়ে গেলে অথবা কিডনী দিয়ে আমিষ বেরিয়ে গেলে, আমিষ শরীরে তৈরী না হলে রক্তে আমিষের মাত্রা কমে যায়। রক্তে আমিষ কমে গেলে পায়ে, পেটে ও বুকে পানি আসে।  ৫. থাইরয়েড হরমোনের সমস্যা  থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা শরীরে কমে গেলে পায়ে পানি আসে। এই রোগে রোগীর গলগন্ড, শীত শীত লাগা, মোটা হয়ে যাওয়া, মাসিকের রক্ত বেশী যাওয়া, কোষ্টকাঠ্যিন্য হওয়া ইত্যাদি লক্ষণগুলো থাকে। ৬. ওষুধের কারণে পা ফুলে যাওয়া  ব্যথার ওষুধ যেমন: ডাইক্লোফেনাক, ন্যাপরোক্সেন, আইবুপ্রোফেন, ইটোরিকক্সিব খেলে পায়ে পানি আসে। এছাড়া উচ্চ রক্ত চাপের ওষুধ ক্যালাসিয়াম চ্যানেল ব্লকার (Calcium Channel Blocker) যেমন নিফেডিপিন, অ্যামলোডিপিন এসব ওষুধ খেলে পায়ে পানি আসতে পারে।  পায়ে পানি আসলে করণীয়  পায়ে পানি আসলে রোগীকে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে হবে। রোগীর ইতিহাস, শারীরিক পর্যবেক্ষণ ও কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা যেমন CBC, Urine R/E, বুকের X-ray, ইসিজি, হরমোন, পেটের আলট্রাসনোগ্রাম, হার্টের ইকো-কার্ডিওগ্রাম ইত্যাদি করে পানি আসার কারণ নির্ণয় করা যায়। তবে রোগীর অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। [১]

পায়ে পানি আসা নিয়ে ভাবনা?  পা ফুলে গেলে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। নিশ্চয়ই কিডনি খারাপ হয়ে গেছে বা শরীরে রস নেমেছে। তবে পা ফোলা বা পায়ে পানি আসার নানাবিধ কারণ আছে। অনেক সময় তা হয়তো মামুলি বা জটিল কোনো সমস্যার লক্ষণ। পায়ে পানি আসার বিষয়ে তাই অন্যান্য লক্ষণ বিবেচনা করে তবেই সিদ্ধান্তে আসা উচিত। বয়স্ক ব্যক্তি, বিশেষ করে নারীদের, ওজনাধিক্য রোগীদের, মাসিক চলাকালে, গর্ভাবস্থায়, দীর্ঘ সময় যানবাহনে পা ঝুলিয়ে বসে থাকার কারণে বা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে অনেকের পায়ে পানি নামতে পারে। এটি সাময়িক এবং পা উঁচু করে শুয়ে থাকলে তা এমনিতেই চলে যায়। এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে পা ফোলার কারণটি গুরুতরও হতে পারে। কিডনি ও যকৃতের সমস্যায় শরীরে, বিশেষ করে পায়ে পানি আসে। এর সঙ্গে অরুচি, বমি ভাব, দুর্বলতা, পেটে ও মুখেও পানি আসা, প্রস্রাবের সমস্যা ইত্যাদি আছে কি না খেয়াল করুন। দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের শরীরে পানি এলে কিডনি জটিলতার কথা মাথায় রাখা উচিত। অপুষ্টি ও রক্তশূন্যতায় পায়ে পানি জমতে পারে। ক্লান্তি ও ঘুম ঘুম ভাব, মনোযোগের অভাব, অনিয়মিত মাসিক, শুষ্ক ত্বক ইত্যাদি সঙ্গে থাকলে থাইরয়েডের সমস্যা আছে কি না দেখুন। কেননা হরমোনের এই জটিলতায় পায়ে পানি আসা খুবই স্বাভাবিক। কিছু কিছু ওষুধও পায়ে পানি আসার জন্য দায়ী। যেমন: ব্যথানাশক, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি, উচ্চ রক্তচাপে ব্যবহূত অ্যামলোডিপিন, ডায়াবেটিসে ব্যবহূত পায়োগ্লিটাজোন, এমনকি ইনসুলিন ইত্যাদি। গর্ভকালীন অবস্থায় পা ফোলাটা খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়। কিন্তু এই সঙ্গে যদি উচ্চ রক্তচাপ ও প্রস্রাবে আমিষ যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে, তবে তা হতে পারে প্রি অ্যাকলাম্পসিয়ার মতো মারাত্মক সমস্যার লক্ষণ। সাধারণত ওপরের এসব পা ফোলার সঙ্গে ব্যথা থাকার কথা নয়। তবে হঠাৎ করে পায়ে তীব্র ব্যথা ও চামড়া লাল হয়ে পা ফুলে গেলে সাবধান হওয়া উচিত। এটি হতে পারে সংক্রমণ বা পায়ে রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়ার মতো গুরুতর ও জরুরি কোনো সমস্যা, যার শিগগিরই চিকিৎসা প্রয়োজন। [২]

পায়ে পানি আসা প্রতিরোধে করণীয়  পায়ে পানি আসা এবং পা ফুলে যাওয়া সমস্যাটি অনেকের মধ্যেই দেখা যায়। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ওজন বৃদ্ধি, থাইরয়েড সমস্যা, রক্তস্বল্পতা, লিভার ও কিডনির সমস্যায় যারা ভোগেন তাদের অনেকেরই এই সমস্যা দেখা দেয়। তবে এই সমস্যার সমাধান খুব কঠিন কিছুই নয়। জীবনযাপনে সামান্য পরিবর্তনেই পায়ে পানি আসার সমস্যা প্রতিরোধ করতে পারবেন খুব সহজেই।

১. পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান  কিডনি ও লিভার সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে নিয়মিত পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পানের বিকল্প নেই। এ ছাড়া দেহ সঠিকভাবে হাইড্রেট থাকলে পায়ে পানি আসার সমস্যা অনেকাংশেই দূর হয়ে যায়।  ২. লবণ ও চিনি সমৃদ্ধ খাবার কম খান  অতিরিক্ত লবণ ও লবণ জাতীয় খাবার দেহের ভেতরের পানি জাতীয় ফ্লুইড ধরে রাখে, যার কারণে পানি জমার সমস্যা দেখা দেয়। আবার চিনি ও চিনি জাতীয় খাবার ইনসুলিনের মাত্রা বাড়িয়ে তোলে। যা দেহ থেকে সোডিয়াম অর্থাৎ লবণ দূর করতে বাঁধা প্রদান করে। তাই এই দুটি খাবারই এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন।  ৩. ডিউরেটিক ও পটাশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খান  খাদ্য তালিকায় গ্রিন টি, তিসি, বাঁধাকপি, আপেল সিডার ভিনেগার ও ডিউরেটিক খাবার রাখুন। পটাশিয়ামযুক্ত খাবার দেহের ইলেক্টোলাইটের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে। যার ফলে পায়ে পানি আসার সমস্যা থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব হয়। তাই প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় কলা, বাঙ্গি, কিশমিশ জাতীয় পটাশিয়ামযুক্ত খাবার রাখুন।  ৪. হারবাল চা পান করুন  ধনে পাতার চা, গ্রিন টি, পুদিনা পাতার চা ধরণের হারবাল চা মধু দিয়ে পান করার অভ্যাস করলে অনেকাংশেই পায়ে পানি আসার সমস্যা দূর করা সম্ভব।  ৫. রসুনের ব্যবহার  প্রতিদিন সকালে খালি পেটে কাঁচা রসুন খেলে দেহের মেদ অর্থাৎ অতিরিক্ত ফ্যাট কেটে যায়। যা পানি আসা সমস্যার অন্যতম প্রধান কারণ।  ৬. বরফের ব্যবহার  যদি পায়ে পানি আসার সমস্যা বেশী হয়, তাহলে আক্রান্ত স্থানে একটি পাতলা কাপড়ে বরফ পেচিয়ে ধরে থাকুন। এতে অনেকটাই সমাধান পাবেন। তবে এটি ডায়বেটিস রোগীদের জন্য প্রযোজ্য নয়।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>