পায়ের বিব্রতকর ৩টি সমস্যা ও সহজ সমাধান

পায়ের তলাসহ অন্যান্য অংশ অনেক সময় শক্ত হয়ে যায়। চলতি ভাষায় একে ‘কড়া পড়া’ বলে। খেজুর কাঁটা বা অন্য কোনো গাছের কাঁটার মতো তীক্ষ্ণ কিছুর আঘাত পেলে পরবর্তী সময়ে পায়ে এমন কড়া পড়তে পারে। ইংরেজিতে একে বলা হয় কর্ন। পায়ের যেসব অংশে ক্রমাগত চাপ পড়ে বা ঘষা লাগে, দীর্ঘদিন পরে সেসব অংশের ত্বক শক্ত হয়ে যায়। একে বলা হয় ক্যালাস। কর্নের ওপর সরাসরি চাপ লাগলে প্রচণ্ড ব্যথা লাগে। ক্যালাসের ব্যথা সাধারণত তীব্র হয় না। ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে পায়ের মাপ অনুযায়ী জুতা না পরার কারণেই এ ধরনের সমস্যা হয়। এতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে পায়ের তলার ত্বক শক্ত হয়ে যায়। তাই অবশ্যই আরামদায়ক জুতা পরতে হবে। জুতা যেন অতিরিক্ত ঢিলে বা বেশি আঁটসাঁট না হয়। পায়ে ক্রমাগত চাপ পড়া বন্ধ হলে ধীরে ধীরে ক্যালাস সেরে যায়। তবে জুতা পরিবর্তনের পরেও সমস্যা না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। পায়ের ত্বকে কখনো কোনো কিছু ঢুকে গেলে নিজে থেকে সেটি বের করার চেষ্টা করবেন না, এতে কড়া পড়ার আশঙ্কা বাড়ে। কড়া হলে কুসুম গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে নিয়ে প্রতিদিন কিছুক্ষণ পা ডুবিয়ে রাখতে পারেন। মাস খানেকের মধ্যে উপশম না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কর্ন ও ক্যালাসের ক্ষেত্রে সাধারণত নির্দিষ্ট রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার, ক্রায়োসার্জারি বা লেজারের সাহায্যে চিকিৎসা করা হয়।

পায়ের কড়া পড়ার ঘরোয়া প্রতিকার: পা আপনাকে আপনার ইচ্ছেমতন জায়গায় নিয়ে যায়। পা, যার ওপর ভর দিয়ে আপনি দাঁড়িয়ে থাকেন, হাঁটেন এবং লাফান!!! অথচ পরিচর্যার ক্ষেত্রে এরা হল শরীরের সবথেকে অনাদর-অযত্নে থাকা অঙ্গ। খারাপ ভাবে ফিট হওয়া হিল, মোজা ছাড়া জুতো, অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা মাঠে-ঘাটে খেলাধুলো- পায়ের ওপর চাপ-ধকলের আরও অনেক কারণ আছে। এইসব চাপ-ধকল ছোট শক্ত, পুরু এবং ফুলে থাকা গোল ত্বক হয়ে ফেরত আসে যাকে কড়া পড়া বলে। এগুলো যন্ত্রণাদায়ক এবং অস্বস্তিকর। ক্ষত, আঘাত, অতিসক্রিয় ঘামের গ্রন্থি বা ডায়াবেটিসের মতন শারীরিক অবস্থার জন্যও পায়ের কড়া পড়তে পারে। কড়া সারাবার অসংখ্য ওটিসি প্রোডাক্ট পাওয়া গেলেও, এখানে কয়েকটা সহজসরল ঘরোয়া সমাধান বলা হল যা এইসব বাজে দেখতে ফুলে থাকার হাত থেকে রেহাই দেয়।

হলুদ এবং রুটি: হলুদের অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটারি গুণ ব্যথা কমায় এবং কড়ার নিরাময় করে। হলুদ এবং মধু বা অ্যালুভিরা জেলের পেস্ট লাগিয়ে শুকিয়ে নিন, তারপরে ঝামাপাথর দিয়ে ঘষুন এবং ময়েশ্চারাইজার লাগান। পাউরুটি স্পঞ্জের মতন কাজ করে ও পায়ের কড়া দূর করে। বাসি রুটিকে অ্যাপেল সিডার ভিনেগারে ভিজিয়ে নিয়ে লাগান এবং প্লাস্টিক দিয়ে মুড়িয়ে মোজা পড়ুন।  অ্যাসপিরিন ও এপসম সল্ট: অ্যাসপিরিনের স্যালিসাইক্লিক অ্যাসিড ফোলা কমায়। ৫-৬ অ্যাসিপিরিন ট্যাবলেট গুঁড়ো করে সেটা অ্যাপেল সিডার ভিনেগার এবং জল বা লেবুর রসের সাথে মেশান। পায়ে এই মিশ্রণ লাগিয়ে মুড়ে রাখুন। হালকা করে ঝামাপাথর দিয়ে ঘষে ধুয়ে ফেলুন। এপসম সল্ট ত্বকের মৃত কোষ পরিষ্কার করে। এপসম সল্টের মিশ্রণে পায়ের পাতা ভিজিয়ে রাখুন এবং ত্বকের মৃত কোষকে নরম করতে ঝামাপাথর দিয়ে ঘষুন।  তেল: টারপেন্টাইন অয়েলের অ্যান্টিসেপ্টিক গুণ কড়ার চিকিৎসা করে। এই তেল সরাসরি মালিশ করুন বা টারপেন্টাইন, নারকেল এবং কর্পূর তেলের মিশ্রণ লাগান। ক্যাস্টর অয়েল শক্ত হয়ে যাওয়া ত্বকের ময়েশ্চারাইজ করে এবং কড়া কমায়। এটা লাগিয়ে অ্যাডহেসিভ টেপ লাগিয়ে পুরনো মোজা পড়ুন।  ফল: লেবু পায়ের কড়া নরম করে ক্ষত নিরাময় করে। লেবুর রস সরাসরি লাগান কিংবা কয়েক কোয়া লেবুর রস বানিয়ে লাগান। আনারসের খোসার এনজাইম কড়াকে নরম করে দেয়। খোসা কেটে কড়ার ওপরে রেখে তারপরে ব্যান্ডেজ করে তার ওপর দিয়ে মোজা পরে সারারাত রেখে দিন। পরের দিন ভালো ধুয়ে নারকেল তেল দিয়ে ময়েশ্চারাইজ করুন।  ভিনেগার এবং বেকিং সোডা: ভিনেগারের অ্যান্টিফাঙ্গাল বৈশিষ্ট্য এবং অ্যাসিডের বেশী মাত্রা সংক্রমণ এবং পায়ের কড়া কমায়। জলের মতন ভিনেগার লাগিয়ে পায়ে ব্যান্ডেজ করুন, ঝামাপাথর দিয়ে ঘষুন এবং অলিভ/নারকেল তেল দিয়ে ময়েশ্চারাইজ করুন। বেকিং পাউডার প্রাকৃতিক এক্সফলিয়েটার এবং এর অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান সংক্রমণ আটকায়। বেকিং পাউডারের মিশ্রণে পা ভিজিয়ে রেখে ঝামাপাথর দিয়ে ঘষুন।  রসুন এবং পেঁপে: রসুনের অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান সংক্রমণ প্রতিরোধ করে ও কড়ার নিরাময় করে। কড়ার ওপরে সরাসরি কয়েক কোয়া রসুন কিংবা নুন বা ভিনেগারের সাথে রেখে ব্যান্ডেজ করুন এবং পরেরদিন সকালে ধুয়ে ফেলুন। পেঁপের এনজাইম ব্যাথা এবং কড়া কমায়। রসের মতন করে লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করুন এবং পরেরদিন ঝামাপাথর দিয়ে এক্সফলিয়েট করুন।

পায়ের দুর্গন্ধ এড়াতে:  যত্ত ভয় সব জুতা খোলার সময়। এই বুঝি দুর্গন্ধ ছড়াবে। মাঝেমধ্যে এটা এতটাই ভয়ানক হয় যে আশপাশের মানুষজনও বিরক্ত বোধ করে। ফলাফল ভ্রুজোড়া কুঁচকে সবাই তাকিয়ে থাকে। একটু সচেতন হলেই এড়াতে পারবেন এ ধরনের বিড়ম্বনা। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ আফজালুল করিম বলেন, ‘নানা কারণে পায়ে দুর্গন্ধ হতে পারে। এটি এড়াতে কিছু নিয়ম মানলে ভালো। তা ছাড়া অনেকের স্যান্ডেল পরলেও পায়ের গন্ধ ছড়ায়। পা অপরিষ্কার থাকলে ছত্রাকের আক্রমণ হতে পারে আপনার পায়ে। এতে করে দুর্গন্ধ ছড়ায়। জুতা পরলে অনেক সময় ধরে পায়ে বাতাস লাগে না। ফলে সেখানে ঘেমে যায় আর দুর্গন্ধ ছড়ায়। তাই নিয়মিত পায়ের যত্ন ও পরিচর্যা করা দরকার।’  অনেকেই পা ভালো করে ধোয়ার প্রয়োজনবোধ করেন না। ফলে পা অপরিষ্কার দেখায়। সেখানে ময়লা জমে ত্বকের শ্রী হারায়। ছেলেমেয়ে সবারই পায়ে দুর্গন্ধ হতে পারে। হেয়ারোবিক্স ব্রাইডালের রূপবিশেষজ্ঞ তানজিমা শারমিন জানান, ‘পায়ের প্রতি একটু যত্নবান হলেই দুর্গন্ধ এড়িয়ে চলা সম্ভব। পা পরিষ্কার রাখতে মাসে দুবার হলেও পেডিকিওর করানো উচিত। এতে করে পা ঘামার প্রবণতা কিছুটা কমে যাবে। নিয়মিত ঘুমানোর আগে পা ধুয়ে লোশন বা গ্লিসারিন লাগান। এ ছাড়া জুতা পরার সময় বাতাস চলাচল করতে পারে, এমন জুতা বেছে নিলে গন্ধ কমে আসবে।’

ছেলেদের গোড়ালি ফাটার সমস্যায়: ছেলেদের গোড়ালি ফাটার সমস্যা সম্পর্কে পারসোনা অ্যাডামসের ধানমন্ডি শাখার ব্যবস্থাপক মাসুম বিল্লাহ খান বলেন, মূলত শুষ্কতা ও ধুলোবালুর কারণেই গোড়ালি ফাটে। তাই কিছু ব্যাপরে একটু যত্নবান হওয়া প্রয়োজন। এ নিয়ে তাঁর পরামর্শ—
১. যাঁরা জুতা-মোজা ব্যবহার করেন, তাঁদের অবশ্যই প্রতিবার পরিষ্কার মোজা ব্যবহার করতে হবে। মোজা একবার ব্যবহার করলেই সেগুলো পরিষ্কার করতে হবে। অপরিষ্কার মোজার কারণে দুর্গন্ধও হতে পারে, আবার এর কারণে হতে পারে জীবাণুর সংক্রমণ।  ২. যাঁরা স্যান্ডেল ব্যবহার করেন, তাঁদের পায়ে ধুলোবালু লেগে থাকে বেশি। তাই বাসায় ফিরেই পরিষ্কার পানিতে পা ধুয়ে নিতে হবে। সম্ভব হলে কিছুটা গরম পানি দিয়ে পা পরিষ্কার করুন।  ৩. জুতার যে অংশ পায়ের দিকে থাকে, সেটি বেশি শক্ত হলে কিছুটা সমস্যা হতে পারে। তাই জুতা কেনার সময় বিষয়টি খেয়াল রাখুন।  ৪. যাঁদের গোড়ালি ফাটার সমস্যা আছে, তাঁরা সপ্তাহে অন্তত একবার পানিতে একটু লবণ ও কিছুটা শ্যাম্পু মিশিয়ে নিয়ে সেই পানিতে পা ভিজিয়ে রাখুন ২০ মিনিটের জন্য। তারপর পা ভালোভাবে ধুয়ে নিয়ে মুছে ফেলুন। পা শুকানোর পর পেট্রোলিয়াম জেলি ও গ্লিসারিন একসঙ্গে মিশিয়ে পায়ে লাগিয়ে রাখুন।  ৫. পায়ের গোড়ালিতে পেট্রোলিয়াম জেলি ও গ্লিসারিন লাগালে চেষ্টা করুন ঘরে স্যান্ডেল পরে হাঁটতে। ঘরে ব্যবহার করার জন্য আলাদা স্যান্ডেল রাখুন। আর যদি ঘরে স্যান্ডেল ব্যবহার না করেন, সে ক্ষেত্রে পরদিন সকালে অবশ্যই ভালোভাবে গোড়ালি পরিষ্কার করতে হবে। কারণ, ময়েশ্চারাইজার লাগানো অবস্থায় খালি পায়ে ঘরে হাঁটলে ঘরের ধুলো গোড়ালিতে আটকে যাবে।  ৬. প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে পায়ের গোড়ালিতে অলিভ অয়েল লাগাতে পারেন।  ৭. সম্ভব হলে গোসলের আগে পায়ে তেল ম্যাসাজ করতে পারেন।  ৮. ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার খান।  ৯. প্রতি মাসে একবার পেডিকিওর করাতে পারেন।  ১০. ফাটা গোড়ালিতে জীবাণুর সংক্রমণ হলে অথবা কোনো কারণে পায়ের ফাটা অংশ থেকে রক্ত পড়লে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>