কেন হয় ব্রেইন টিউমার? এর প্রতিকার ও প্রতিরোধ কী?

মস্তিষ্কের টিউমারের সমস্যায় অনেকেই ভুগে থাকেন। মাথাব্যথা, বমি ও চোখে কম দেখা মস্তিষ্কের টিউমারের লক্ষণ। মস্তিষ্কের টিউমার দুই ধরনের হয়—বিনাইন ও ম্যালিগনেন্ট। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করা হলে দুটো ক্ষেত্রেই ঝুঁকি হতে পারে। এমন লক্ষণ দেখলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। মস্তিষ্কের টিউমারের চিকিৎসায় বাংলাদেশ এখন এগিয়েছে। এ বিষয়ে কথা বলেছেন ডা. মো. জিল্লুর রহমান

প্রশ্ন : মস্তিষ্কের টিউমারের কারণ কী?  উত্তর : আসলে মস্তিষ্কের টিউমারের নির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি। তবে অনেকগুলো কারণের জন্য এটি হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বংশগত ধারা থাকে কারো কারো। বংশে যদি বাবা-মা বা নিকটাত্মীয় মস্তিষ্কের টিউমারের রোগে ভুগে থাকেন, তাহলে তাদের মস্তিষ্কের টিউমার হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। ঘন ঘন এক্স-রে বা রেডিয়েশন যদি নেওয়া হয়, তাহলে দেখা যায় কারো কারো মস্তিষ্কের টিউমার হয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কতগুলো রোগ আছে, যেমন নিউরোফাইব্রোমেটোসিস, শরীরে অনেকগুলো দানা দানা থাকে—এ ধরনের মানুষের কিছু কিছু মস্তিষ্কের টিউমার হয়। এই সমস্ত কারণের জন্য মোটামুটি মস্তিষ্কের টিউমার হয়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে মস্তিষ্কের টিউমারের কারণ জানা যায়নি।  প্রশ্ন : মস্তিষ্কের টিউমারের লক্ষণ কী?  উত্তর : এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। আসলে অনেকেই জানার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন যে মস্তিষ্কের টিউমার হলে আমরা কীভাবে বুঝব? সহজ কথায় বলা যায়, কোনো রোগী বা কোনো মানুষের যদি দেখা যায় ঘন ঘন মাথাব্যথা হচ্ছে, বমি হচ্ছে বা চোখে ঝাপসা দেখছে, তাহলে সতর্ক হতে হবে। এ তিনটি যদি হয় একসঙ্গে, তাহলে বুঝতে হবে যে তার মাথায় কোনো সমস্যা হচ্ছে। তখন আমরা সাধারণত পরীক্ষা করতে বলি। এই তিনটি জিনিস যদি একসঙ্গে থাকে তখন তার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

প্রশ্ন : মস্তিষ্কের টিউমার আছে নিশ্চিত হওয়ার পর আপনাদের পদক্ষেপ কী থাকে?  উত্তর : মস্তিষ্কের টিউমারের মধ্যে কতগুলো আছে বিনাইন টিউমার। এটা ভালো ধরনের মস্তিষ্কের টিউমার। কম ক্ষতিকর। আরেকটি হলো ম্যালিগনেন্ট টিউমার। এগুলো বেশ ক্ষতিকর। বিনাইন টিউমারগুলোর সুবিধা হলো যদি আমি অস্ত্রোপচার করতে পারি এবং প্রাথমিক পর্যায়ে যদি ধরা পড়ে, তাহলে ১০০ ভাগ নিরাময় হয়ে যায়। আর ম্যালিগনেন্ট টিউমার যদি হয়, তখন অস্ত্রোপচার করে যতটুকু বের করা সম্ভব করা হয়। পরবর্তী পর্যায়ের জন্য বায়োপসি করি। এটি করলে ম্যালিগনেন্সির গ্রেডিং বা পর্যায় বোঝা যায়। পর্যায় অনুযায়ী তখন আমরা রেডিওথেরাপি বা কেমোথেরাপি দিই। এর পর পরবর্তী চিকিৎসা পদ্ধতি শুরু করতে হয়। মেয়েদের মেনিনজিওমা বলে একটি টিউমার হয়, ছেলেদেরও হতে পারে, তবে মেয়েদের বেশি হতে পারে—এ ধরনের টিউমার হলে সাধারণত মস্তিষ্কের ক্ষতি খুব বেশি হয় না। এই টিউমার যদি আমরা অস্ত্রোপচার করি দেখা যায় ১০০ ভাগ ঠিক হয়। সুখের কথা হলো, এই সব মস্তিষ্কের টিউমারই কিন্তু খারাপ নয়। বিনাইন টিউমার অস্ত্রোপচার করলে ১০০ ভাগ ঠিক হয়। আমাদের দেশে এটা করা সম্ভব। আমরা সব নিউরোসার্জন এটা করছি। এর জন্য ভয় না পেয়ে ছোটাছুটি না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত।

প্রশ্ন : অস্ত্রোপচারের পরে আপনাদের কী পরামর্শ থাকে? উত্তর : বিনাইন টিউমার হওয়ার তিন মাস পর পর আমরা সাধারণত রোগীকে ফলোআপ করি। সাধারণত এই সব টিউমার অস্ত্রোপচার করার পর খিঁচুনি রোগ হয়। আমরা বলি কনভালশন। ওই জন্যই সাধারণত অ্যান্টিকনভালশন দেওয়া হয়। এটি দিয়ে আমরা রোগীর ফলোআপ করি। তারপর যখন প্রতি তিন মাস পর ফলোআপে আসে একটি এমআরআই বা সিটিস্ক্যান করে দেখতে হয় যে পুনরায় হলো কি না। অনেক সময় দেখা যায়, বিনাইন টিউমার অস্ত্রোপচার করার পরেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবার হতে পারে। সেই জন্য যদি বছরে একবার ফলোআপ করা যায়, তাহলে আমরা আগেভাগে বিষয়টি ধরতে পারি। সেটিও তখন নিরাময় করা সম্ভব। আর দেরি হয়ে গেলে দেখা যায় অনেক বড় হয়ে গেল, তখন জটিলতা বেড়ে যায়। সে জন্য ফলোআপে থাকতে হবে।

প্রশ্ন : অস্ত্রোপচারের পর রোগীর জীবনযাপন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কী পরামর্শ থাকে?  উত্তর : এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অস্ত্রোপচার করার পর আমরা বলি প্রায় সাধারণ জীবনযাপন করার জন্য। ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো এড়িয়ে যেতে বলি। যেমন সিগারেট খাওয়া, স্বাভাবিক যে জীবন একে মেনে চলা, এগুলো করতে বলি। যদি রক্তচাপ থাকে, ডায়াবেটিস থাকে সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য যে পদ্ধতি, সেগুলো মেনে চলা। সব নিয়ম মেনে চললে এই রোগী স্বাভাবিক মানুষের মতো জীবনযাপন করতে পারে। [১]

ব্রেইন টিউমারের বিষয়ে এই বিষয়গুলো জানা উচিৎ সবার: হু (WHO) এর মতে, কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের (CNS) উচ্চ মাত্রার (৩ ও ৪ মাত্রার) টিউমারকেই ব্রেইন ক্যান্সার হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ব্রেইন টিউমার এমন একটি স্বাস্থ্য সমস্যা যা যেকোন বয়সের, যেকোন লিঙ্গের, যেকোন আকারের, যেকোন বর্ণের এবং যেকোন বাসস্থানের মানুষের হতে পারে, যদিও ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে এর ধরন ও স্তরে পার্থক্য হতে দেখা যায়। চিকিৎসক এবং বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন ব্রেইন ক্যান্সারের জিনকৌশল এবং চিকিৎসার বিষয়টি বোঝার। ব্রেইন ক্যান্সার নির্ণয়ের উপায় এবং নিরাময় এর বিষয়ে যে বিষয়গুলো জানা থাকা উচিৎ সেরকম বিষয়ই জানবো আজকের ফিচারে– ১. সব ব্রেইন টিউমারই ক্যান্সার নয়। কিছু আছে সম্পূর্ণ অক্ষতিকর আবার কিছু আছে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী কোষের দলা বা পিন্ড যা মস্তিষ্কের গাঠনিক টিস্যুকে টার্গেট করে। ক্যান্সার কোষগুলো শরীরের অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে যেতে পারে।  ২. আপনি মনে করে থাকেন যে ব্রেইন ক্যান্সার এমন এক ধরণের ক্যান্সার যা শুধু মস্তিষ্কের কোষ বা কলাতেই প্রভাব ফেলে, তাহলে আপনি ভুল জানেন। বস্তুত বিভিন্ন ধরণের ব্রেইন টিউমার আছে যা আকার, অবস্থান, কোষের উৎপত্তি ও মাত্রার উপর ভিত্তি করে শ্রেণী বিভক্ত করা হয়। তাই বলা যায় যে, সব ব্রেইন টিউমার এক রকমের নয়।  ৩. ব্রেইন টিউমার সাধারণত দুটি ভাগে বিভিক্ত যেমন- প্রাইমারী টিউমার এবং সেকেন্ডারি টিউমার। প্রাইমারী টিউমার মস্তিষ্কের কলা আক্রান্ত করে এবং সেখানেই বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে সেকেন্ডারি টিউমারকে মেটাস্ট্যাটিক টিউমার বলে এবং এটি শরীরের নির্দিষ্ট কিছু অঙ্গ যেমন- ফুসফুস, ব্রেস্ট, কিডনি, পাকস্থলী ও অন্ত্র এবং সময়ের সাথে সাথে মস্তিস্কেও ছড়িয়ে পড়ে। প্রাইমারী টিউমারের চেয়ে সেকেন্ডারি টিউমার বেশি হয়ে থাকে।  ৪. ব্রেইন টিউমারের একটি সাধারণ লক্ষণ হচ্ছে তীব্র মাথা ব্যথা হওয়া যা সকালের দিকে তীব্র আকারে দেখা দেয়। ব্রেইন ক্যান্সারের অন্য সাধারণ লক্ষণগুলো হচ্ছে হাত ও পায়ের দুর্বলতা, হাঁটার সময় ভারসাম্যহীনতা, ঝাপসা দৃষ্টি, খিঁচুনি আসা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, স্মৃতি হারানো, বমি এবং হটাৎ করেই মেজাজ বা ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন হওয়া ইত্যাদি। যদি আপনার এধরণের কোন লক্ষণ প্রকাশ পায় তাহলে দ্রুত একজন চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন। তবে মনে রাখবেন যে, রেডিওলজিক্যাল পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া ছাড়া শুধু এই উপসর্গগুলো দেখা দিলেই ভাববেন না যে আপনার ব্রেইন ক্যান্সার হয়েছে।  ৫. যদি চিকিৎসক সন্দেহ প্রকাশ করেন যে আপনার ব্রেইন টিউমার হয়েছে তাহলে ক্লিনিক্যাল টেস্ট করাতে হবে আপনার স্নায়ুতন্ত্রের মূল্যায়নের জন্য। চিকিৎসক আপনাকে সিটি স্ক্যান, এমআরআই স্ক্যান করাতে বলবেন ক্যান্সারের মাত্রা নির্ণয়ের জন্য। টিউমারের পর্যায় নির্ণয়ের জন্য টিউমার টিস্যুর বায়োপসি করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে মাথার খুলি খুলে টিউমার অপসারণ করতে হতে পারে।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>