কোমর ব্যথা কেন হয় এবং এর প্রতিকার কী?

এমন মানুষ হয়ত পৃথিবীতে পাবেন না যিনি তার জীবনে একবারও কোমরে ব্যথা অনুভব করেননি। মেরুদণ্ডের নিচের হাড়ের মধ্যবর্তী তরুণাস্থি বা ডিস্কের বয়সজনিত পরিবর্তনের ফলে এ ব্যথার সুত্রপাত হয়। তরুণাস্থির এই পরিবর্তনের সাথে সাথে মেরুদণ্ডের নিচের দিকে সংবেদনশীলতার পরিবর্তন হয়। সাধারণত এ পরিবর্তন ৩০ বছর বয়স থেকে শুরু হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ রোগের কোনো উপসর্গ থাকে না। তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে রোগের উপসর্গও বাড়তে থাকে।
কোমর ব্যথা প্রচলিত সমস্যা। ৮০ ভাগ মানুষের জীবনে কোনো না কোনো সময় কোমর ব্যথা হয়। কোমর ব্যথা নিয়ে বিভিন্ন বিষয় আরো কথা বলেছেন ডা. মিনহাজ রহিম চৌধুরী

প্রশ্ন : কোন কোন কারণে কোমর ব্যথা হতে পারে?  উত্তর : এটি খুবই প্রচলিত। আসলেই খুবই প্রচলিত। আমরা বলি যে পৃথিবীতে যত মানুষ রয়েছে, তাদের শতকরা ৮০ ভাগেরই জীবনে কোনো না কোনো সময়ে কোমরে ব্যথা হবে। তাহলে এই অতি প্রচলিত সমস্যা নিয়ে মানুষের মধ্যে অনেক ভুলভ্রান্তি রয়েছে। মানুষের মধ্যে অনেক রকম ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। আজকের আলোচনায় মূল একটা বার্তা দেবো শুরুতেই, সেটি হলো কোমর ব্যথা হলে কিন্তু আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আসলে শতকরা ৭০ ভাগই সাধারণ কোমর ব্যথা, আমি কিছু করি অথবা না করি তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে চলে যাবে। তাহলে ৭০ ভাগ কোমর ব্যথা কিছু না করলেও চলে যাবে। ভয়ের কিছু নেই। সে ক্ষেত্রে অনেক রকম ভুল রয়েছে আমাদের। কোমর ব্যথা হলেই সাত দিন/১৪ দিন আমাকে বিছানায় শুয়ে থাকতে হবে। এটা কিন্তু মোটেও সঠিক নয়। আমাকে শক্ত বিছানায় শুতে হবে, ফ্লোরে শুতে হবে। এসব চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমি সাধারণ বিছানায় ঘুমাতে পারব। আমাদের দেশে যেগুলো ব্যবহার হয়, সেখানেই ঘুমাতে পারব। ফোম না হলেই হয়। কোমর ব্যথা হলে একজন চিকিৎসকের দায়িত্ব হবে প্রথমেই, কারণ নির্ণয় করা। ৭০ ভাগ কারণ সাধারণ। সাধারণত এই সাধারণ ব্যথাটা কোমরের একপাশকে আক্রমণ করে। এরপরও আমরা বলি, এর বাইরে কিন্তু কিছু ব্যথা রয়েছে। যেমন—আমরা বলি প্রদাহজনিত কোমর ব্যথা একটি রয়েছে। তরুণ ছেলেদের বেশি হয়, মেয়েদেরও হয়। সেটা কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সুতরাং এই রোগ নির্ণয় করলে সেখানে আবার নির্দিষ্ট কিছু চিকিৎসা লাগবে। একটি রোগ রয়েছে, আমরা বলি এনকাইলোজিং স্পনডিলাইটিস। কোমরে তীব্র ব্যথা হয়। আজকাল অনেক নাম একসঙ্গে জড়িয়ে বলা হয়।

প্রশ্ন : প্রদাহজনিত কোমর ব্যথার কারণ কী? উত্তর : প্রদাহজনিত কোমর ব্যথার একটি নাম এনকাইলোজিং স্পনডিলাইটিস। কোমরে তীব্র ব্যথা হয়। আজকাল অনেক নাম একসঙ্গে জড়িয়ে বলা হয়। এর কিছু কারণ জেনেটিক। বংশপরম্পরায় হয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা যদি সাধারণভাবে বলি, তাহলে প্রদাহজনিত বাত কিন্তু হয়। আমাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ শক্তি থাকে। এর দায়িত্ব হলো শরীরকে পাহারা দেওয়া। এরা কিন্তু হঠাৎ করে প্রতারণা করে। তারা নিজেরাই জয়েন্ট, মাংসপেশি, হাড় এগুলোকে আক্রমণ করে। একটি সময় ছিল, পৃথিবীতে এর কোনো ভালো চিকিৎসা ছিল না। এখন কিন্তু অনেক রকম ভালো ওষুধ বের হয়েছে। আমরা এখনো বলি একে নির্মূল করা যায় না, তবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। অনেক সময় কিন্তু বয়স্কদের ম্যালিগন্যান্সি বা ক্যানসারজাতীয় রোগ হয়। তাহলে আমরা যদি ব্ড় মাপের রোগের কথা বলি, এটিই। তবে বেশিরভাগই সাধারণ কোমর ব্যথা। এগুলো নিয়ে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। এগুলো সাধারণত নড়াচড়ার সমস্যার কারণে হয়, যেভাবে দাঁড়ানো দরকার, যেভাবে করা দরকার, সেটি না করতে পারার জন্য এমন হয়। ধীরে ধীরে ভেতরে আঘাত হয়। এগুলো হঠাৎ তীব্র আকার ধারণ করে। এরপরও আমরা বলছি যে বেশিরভাগ রোগীরই ব্যথা চলে যাবে। কারো কারো ক্ষেত্রে হয়তো মাঝেমধ্যে আক্রমণ হতে পারে। তবে মাঝেমধ্যে আক্রমণ হলে সেটিও বেশিদিন থাকবে না। তিন দিন/চার দিন/পাঁচ দিনের মধ্যে চলে যাবে। একেবারেই শুয়ে থাকতে হবে বিছানায়, এটা মোটেও সঠিক নয়। কেবল তিন সপ্তাহ/চার সপ্তাহ আমাকে হাসপাতালে থাকতে হবে, এটারও প্রয়োজন নেই। খুব তীব্র আকারে ব্যথা হলে দুই/তিন দিন কেউ হয়তো বিশ্রাম নিতে পারেন। ব্যথাটা কমে গেলে বাড়ির মধ্যে পায়চারি করবেন, হাঁটবেন, তারপর যত দ্রুত সম্ভব কর্মস্থলে ফিরে যাবেন। এটাই স্বাভাবিক। অনেক সময় বাংলাদেশে টিবি রোগেও কিন্তু কোমর ব্যথা হয়। অনেক সময় কিছু ফোড়া হয়। এখান থেকে কোমরে ব্যথা হতে পারে। আরেকটি সমস্যা রয়েছে ডিস্ক প্রলাপস। ডিস্ক বের হয়ে গিয়ে নার্ভ রয়েছে, সেখানে চাপ দেয়। তখনকার ব্যথা কিন্তু ভিন্ন। এটা পায়ে চলে যায়, সেটা কিন্তু একেবারে হাঁটুর নিচে যাবে, পায়ের পাতা পর্যন্ত। সেখানে কিন্তু বেশিরভাগ রোগী কনজারভেটিভ চিকিৎসা ভালো হয়ে যায়। কিছু কিছু রোগীর সার্জারি লাগবে। তবে সার্জারি কাদের লাগবে? যাদের অবশ অবশ লাগে পায়ের দিকের জায়গাগুলো, যাদের প্রস্রাব-পায়খানায় সমস্যা হচ্ছে, এই দলের রোগীদের সার্জারি লাগবে।

প্রশ্ন : সাধারণ কোমর ব্যথা কমাতে পরামর্শ কী? কোমর ব্যথা কমাতে ব্যায়াম কি কোনো উপকার করতে পারে? উত্তর : বেশিরভাগ কোমর ব্যথা হয় সাধারণ কারণে। বুঝতে হবে যে আমি ভালো হয়ে যাব। এই আত্মবিশ্বাসটুকু থাকতে হবে। সেই সময় ব্যথা কমানোর জন্য কিছু কিছু পদ্ধতি নেওয়া যেতে পারে। সাধারণ ব্যথানাশক ওষুধ অল্প সময়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শমতো নেওয়া যেতে পারে। এর পর গরম স্যাঁক নেওয়া যেতে পারে। তীব্র ব্যথা হলে দুই/তিন দিন বিশ্রাম নেওয়া যেতে পারে। এ রকম কিছু কাজ করলে ব্যথা অনেকটাই কমানো যায়। আসলে তীব্র ব্যথার সময় তো ব্যায়াম করা সম্ভব নয়। তবে যখনই ব্যথা কমে আসতে থাকবে, তখন ব্যায়াম করা যাবে। অবশ্যই ব্যায়ামের গুরুত্ব রয়েছে। এ সময় ব্যায়াম করলে কাজে দেবে। একটু সময় পার হলে একটু হালকা গরম স্যাঁক দেওয়া যেতে পারে। এগুলো করা যায়। সাধারণত পাঁচ থেকে সাত দিন পর রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করা শুরু করবে। রোগী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ভালো হয়ে যাবে। এ পদ্ধতি অনুসরণ করলে সাধারণ কারণে হওয়া কোমর ব্যথা অনেকটাই কমে।  প্রশ্ন : একটু বয়স্কদের কোমর ব্যথায় কি সার্জারি লাগে? উত্তর : আসলে বয়স্ক হলেই লাগবে, সেটি সঠিক নয়। কিন্তু যদি পা অবশ অবশ লাগে, পায়খানা-প্রস্রাবে অসুবিধা হয়—এ ধরনের উপসর্গ যদি তৈরি হয়, সেগুলোর চিহ্ন যদি পাওয়া যায়, তখন কিন্তু নিউরোসার্জনদের সাহায্য লাগবে। তখন দেরি করলে রোগীর ক্ষতি হয়ে যাবে। যত দ্রুত সম্ভব, তত দ্রুত অস্ত্রোপচার করে ফেলতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব রোগকে নির্ণয় করা দরকার। যেসব ব্যথা পায়ের দিকে চলে যাচ্ছে, তার একটি চিকিৎসা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অনেক গভীরে ঢুকে ইনজেকশন দেওয়া হয়। সেটিও করে দেখা যেতে পারে। তবে যদি অনেক ক্ষত হয়, সেখানে সার্জারি করা দরকার হয়।

কোমর ব্যথা কমাতে ৭ মিনিটের ব্যায়াম : কোমরে ব্যথা খুব সাধারণ একটি সমস্যা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা অসতর্ক হাঁটাচলা বা ওঠা-বসার কারণে হয়ে থাকে। সঠিকভাবে হাঁটাচলা বা ওঠা-বসা করলে কোমর ব্যথা সাধারণত হয় না। কিছু ব্যায়াম কোমর ব্যথা প্রশমনে সাহায্য করে, এমনকি ওষুধের চেয়েও ভালো ফল দেয়। খুব অল্প সময়ে সহজে করা যায় এমন কিছু ব্যায়ামের কথাই জানা যাক। এই ব্যায়াম প্রতিদিন রাতে ও সকালে বিছানায় শুয়ে শুয়ে করতে পারেন। সময় লাগবে সর্বোচ্চ সাত মিনিট।
১. সমতল হালকা নরম বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে দুই হাত শরীরের দুই পাশে রেখে দুই পা সোজা করে শুতে হবে। এরপর হাঁটু ভাঁজ না করে এক পা ওপরের দিকে তুলুন যত দূর সম্ভব। ১০ সেকেন্ড পা তুলে রাখতে হবে বা ১০ গোনা পর্যন্ত পা তুলে রাখতে পারেন। একইভাবে অপর পা ওপরে তুলুন এবং একই সময় নিন।  ২.এবার একইভাবে হাঁটু ভাঁজ না করে একসঙ্গে দুই পা তুলতে হবে এবং একই সময় নিন।  ৩. এবার এক হাঁটু ভাঁজ করে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে হাঁটুকে বুকে লাগানোর চেষ্টা করতে হবে। এভাবে ১০ সেকেন্ড পার করতে হবে। একইভাবে অপর হাঁটু বুকে লাগাতে হবে এবং একই সময় পার করুন।  ৪. এবার একসঙ্গে দুই হাঁটু ভাঁজ করে দুহাতে জড়িয়ে বুকে লাগাতে হবে।  ৫. সর্বশেষ ধাপটি হলো দুই পা সোজা করে পায়ের পাতার দিকে সটান করে ১০ সেকেন্ড রাখতে হবে।  প্রতিটি ধাপ ১০ সেকেন্ড দীর্ঘায়িত হবে বা ১০ গোনা পর্যন্ত করতে হবে। এই ধাপগুলো অনুসরণ করে দু-তিনবার সকাল-রাতে করতে হবে, যা কোমরের মাংসপেশির প্রদাহ কমায় ও শক্তিশালী করে তোলে। ফলে কোমরে ব্যথা কমে আসে।

পরামর্শ: ডা. মিনহাজ রহিম চৌধুরী, বিভাগীয় প্রধান, রিউমাটোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। ডা. শওকত আলম, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেজ অ্যান্ড ইউরোলজি। ডা. মো. শরীফুল ইসলাম।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>