কৃমি থেকে মুক্তি পেতে যা যা করবেন, জেনে নিন

কৃমি আকারে খুবই ছোট। প্রায় দেখাই যায় না। কিন্তু জেনে অবাক হবেন, এ রকম একটি কৃমি মানুষের অন্ত্র থেকে দিনে শূন্য দশমিক ২ মিলিলিটার রক্ত শুষে নেয়। অনেক কৃমি শরীরে থাকলে প্রতিদিনই বেশ কিছু পরিমাণ রক্ত হারিয়ে যায়। ফলে শিশুরা অপুষ্টি ও রক্তশূন্যতায় ভোগে। বড়রাও কম ভোগেন না। কৃমি মানুষের শরীরে বসবাসরত একটি ক্ষতিকর পরজীবী। সাধারণত এরা মানুষের অন্ত্রে বাস করে শরীর থেকে পুষ্টি গ্রহণ করে বেঁচে থাকে এবং বংশ বৃদ্ধি করে৷ কৃমির ডিম্বাণু মানুষের মুখের সাহায্যে প্রবেশ করতে পারে আবার ত্বকের সাহায্যেও লাভা হিসেবেও প্রবেশ করতে পারে। অনেক সময় কৃমি মানুষের যকৃত বা অন্য কোন অঙ্গতেও আক্রমণ করতে পারে। কৃমি দেখতে অনেকটা কেঁচোর মতো এবং এই কৃমির রঙ হালকা হলুদ হয়ে থাকে। পরিণত অবস্থায় একটি কৃমি ৬ থেকে ১৪ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। আমাদের দেশে কেঁচো কৃমি, বক্র কৃমি ও সুতা কৃমিতে আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি৷

কৃমির প্রকারভেদ: কৃমি বিভিন্ন রকম হতে পারে। যেমন- গোল কৃমি (এগুলো সাধারণত গোল, পাতলা, সাদা বা গোলাপী রঙের হয় এবং লম্বায় ১০ থেকে ১২ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে), সুতা কৃমি (এগুলো সুতার মত, ছোট, পাতলা এবং সাদা রঙের হয়), বক্র কৃমি (এগুলো আকারে খুবই ছোট, গারো গোলাপী রঙের হয় এবং খালি চোখে দেয়া যায় না), ফিতা কৃমি (এগুলো ২ থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে)।

যেভাবে বংশবৃদ্ধি করে:  ১. সাধারণত দূষিত পানি, নোংরা খাবার এবং অপরিষ্কার শাকসবজি বা ফলমূলের মাধ্যমে কেঁচো কৃমির ডিম আমাদের মুখে প্রবেশ করে। আবার, আক্রান্ত ব্যাক্তির পোশাক থেকে বা হাত ঠিকমতো না ধুলেও কেঁচো কৃমির ডিম আমাদের পেটে যেতে পারে।  ২. এই ডিম সেখান থেকে খাদ্যনালীর ক্ষুদ্রান্তে যায় এবং ক্ষুদ্রান্তের এনজাইম বা পাচকরসের সাহায্যে ডিম থেকে লার্ভা বের হয়৷  ৩. লার্ভাগুলো আবার রক্তের মাধ্যমে যকৃত, হৃদপিণ্ড এবং ফুসফুসে প্রবেশ করে এবং ফুসফুসের এলভিওলাই ছিদ্র করে শ্বাসনালী দিয়ে অন্ননালী পার হয়ে পাকস্থলীতে প্রবেশ করে ক্ষুদ্রান্ত্রে অবস্থান করে।  ৪. লার্ভাগুলো ক্ষুদ্রান্ত্রে এসে পূর্ণতা লাভ করে এবং ডিম পাড়ে৷  ৫. একটা স্ত্রী কৃমি মানুষের অন্ত্রে সাধারনত দৈনিক প্রায় ২ লাখ ডিম পারে।  ৬. ১০ থেকে ৪০ দিনের মধ্যে ডিম থেকে বাচ্চা কৃমি তৈরী হয়।  ৭. পরে তা পায়খানার সাথে বাহিরে বেরিয়ে আসে।  ৮. পুনরায় সেই মল থেকে কৃমির ডিম এবং লার্ভা খাবারের সাহায্যে অথবা ত্বকের মাধ্যমে আবার সুস্থ মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।

কৃমি হওয়ার কারণ: কৃমির ডিম বা লার্ভা সাধারণত দূষিত পানি, নোংরা খাবার এবং অপরিষ্কার শাকসবজি বা ফলমূল, আক্রান্ত ব্যাক্তির পোশাক বা হাত ঠিকমতো পরিস্কার না করলে আমাদের মুখে প্রবেশ করতে পারে। আবার কৃমির লার্ভা মাটি থেকে পায়ের ত্বকের মাদ্ধমেও শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বেশ কিছু কারণে কৃমি হতে পারে। যেমন- ১. দূষিত পানি বা খাবার খেলে।  ২. রান্নার পূর্বে শাকসবজি, মাছ, মাংস ইত্যাদি ভালভাবে না ধুয়ে রান্না করলে।  ৩. সাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার না করলে।  ৪. পায়খানার পরে, খেলাধুলা বা কাজকর্মের শেষে এবং খাবার খাওয়ার পূর্বে সাবান দিয়ে ভালভাবে হাত পরিস্কার না করলে।  ৫. অন্যের পোশাক, তোয়ালে বা রুমাল ইত্যাদি ব্যবহার করলে।

কৃমির চিকিৎসা: কৃমি আছে কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য অনেক ক্ষেত্রে মল পরীক্ষা করার প্রয়োজন হয়না। পায়খানা বা বমির সঙ্গে কেঁচো কৃমি বের হলে, রাতে মল দ্বার চুলকালে ধরে নেয়া যায় যে তার কৃমি আছে। যদি মল পরীক্ষার সুযোগ কিংবা সামর্থ্য না থাকে তাহলেও কৃমি আছে এরূপ সন্দেহ হলে মল পরীক্ষা না করিয়েও কৃমির ঔষধ খাওয়া যেতে পারে। তবে চিকিৎসা গ্রহনের আগে মল পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া ভালো৷ গর্ভবতী মহিলা, জ্বর ও ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে কৃমির ঔষধ খাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বয়সভেদে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় ঔষধ খেতে হবে৷

কৃমি প্রতিরোধে করনীয়: কৃমি প্রতিরোধে নিম্নলিখিত বিষয়ে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে:  ১. সবসময় বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ খাবার খেতে হবে।  ২. নিয়মিত গোসল করতে হবে এবং পরিষ্কার জামা কাপড় পরিধান করতে হবে।  ৩. নখ বড় রাখা যাবে না। কারন- অনেক ক্ষেত্রেই বড় নখের কারনে কৃমির ডিম নখের সাহায্যে পেটে প্রবেশ করতে পারে।  ৪. রান্নার পূর্বে ভালোভাবে শাক সবজি, মাছ, মাংস ইত্যাদি ধুয়ে তারপরে রান্না করতে হবে।  ৫. খাবার রান্না ও পরিবেশনের সময় অবশ্যই সাবান দিয়ে ভালভাবে হাত ধুতে হবে।  ৬. মল ত্যাগের পর অবশ্যই সাবান বা ছাই দিয়ে হাত ভালভাবে পরিস্কার করতে হবে।  ৭. জন্মের প্রথম ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে।  ৮. অবশ্যই বাইরে যাওয়ার সময় জুতা বা স্যান্ডেল ব্যবহার করতে হবে।  ৯. মল নিষ্কাশনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে।  ১০. পায়খানা বা টয়লেট সব সময় পরিষ্কার রাখতে হবে।  ১১. প্রতি চার মাস অন্তর পরিবারের সবাইকে বয়স অনুযায়ী নির্দিষ্ট মাত্রার কৃমির ঔষধ খাওয়াতে হবে।  ১২. বাড়িতে কৃমি আক্রান্ত কেউ থাকলে সকলেরই সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এরকম ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শমত সবাইকে কৃমির ঔষধ খেতে হবে।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>