চুল পড়া প্রতিরোধে পিআরপি চিকিৎসা

চুল পড়তে পড়তে অনেকের মাথায় টাক পড়ে যায় বা টাক পড়ার মতো অবস্থা হয়। টাক পড়ার কারণ কী? প্রতিদিন একশ থেকে দেড়শটি চুল পড়া স্বাভাবিক। তবে এর বেশি হলে একে সমস্যা হিসেবে ধরতে হবে। কিছু প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে চুল পড়া অনেকটা প্রতিরোধ করা যায়। এ বিষয়ে কথা বলেছেন ডা. রাশেদ মোহাম্মদ খান

প্রশ্ন : মাথার চুল একসময় কমতে কমতে পাতলা হতে হতে টাকে পরিণত হয়। এর কারণ কী?  উত্তর : এটা আসলে একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। চুলের তিনটি পর্যায় রয়েছে। একটি হলো গ্রোয়িং, মানে গজাচ্ছে। কিছুদিন থাকবে, আবার পড়ে যাবে। এটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। প্রতিদিন একশ থেকে দেড়শ চুল পড়বে ও গজাবে। এটি নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। অনেকেরই পঞ্চাশটা চুল পড়ছে। সে ভয় পেয়ে যায়। আসলে এটি হলো প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। তবে আজকাল চুল পড়ে। এটাও বেড়েছে। কারণ হলো, আমাদের খাদ্যাভ্যাস। আমাদের আজকে তরুণরা প্রচুর ফাস্টফুড খাচ্ছে। সবজি খাচ্ছে না, ফল খাচ্ছে না। এ ছাড়া চুলের বিভিন্ন রকম প্রসাধনী ব্যবহার করছে তারা। চুলে হিট দিচ্ছে। চুলে যত হিট দেবে, চুলের স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যাবে। চুল ভেঙে যাবে। আবার কারো গর্ভাবস্থার পর চুল পড়ে। বড় একটি সার্জারি হলো। চুল পড়ে যেতে পারে। অনেক সময় কিছু ওষুধ রয়েছে। যেগুলো খেলেও চুল পড়ে যেতে পারে। আবার কারো কারো দেখা যায়, গোল গোল হয়ে কোথাও কোথাও চুল পড়ে যাচ্ছে। আমরা একে বলি এলোপেসিয়া এরিয়েটর। অনেকে এটি সমস্যায় টাক পোকার দোষ দিয়ে থাকে। টাক পোকার কোনো অস্তিত্ব আসলে নেই। তবে এর চিকিৎসা রয়েছে। তবে আরো যেটি বলতে চাইছি, এন্ড্রোজেনেটিক এলোপেসিয়া বা বংশগত চুল পড়া। এর বংশগত বিষয় রয়েছে। পরিবারের কারো না কারো মাথায় চুল কম রয়েছে। দেখা যায়, সামনে থেকে চুল পড়ে যাচ্ছে। পেছন থেকে চুল পড়ে যাচ্ছে। পড়ে গিয়ে একটি টাকের সৃষ্টি হচ্ছে। এর একটি জিনগত প্রভাব রয়েছে। সঙ্গে একটি হরমোনের প্রভাব রয়েছে। এন্ড্রোজেন হরমোন। এর প্রভাবেও কিন্তু চুল পড়ে। মাথার টাক যেটা হয়, সেটি এই কারণেই হয়ে থাকে।

প্রশ্ন : চুল পড়া রোধে কি কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে?  উত্তর : হ্যাঁ, রয়েছে। আমরা যেটি বললাম, সেটি খাদ্যাভ্যাস। প্রচুর সবজি খেতে হবে। ফল খেতে হবে। তার সঙ্গে জরুরি হলো ভিটামিন ডি। আজকাল আমাদের পরীক্ষা করলেই দেখা যাবে আমরা ভিটামিন ডি-এর অভাবে ভুগছি। এর মধ্যে হাড়ের ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। ব্যথা বাড়ছে। আমরা রোদে যাই না। খেয়াল করে দেখবেন, রিকশাচালকদের কিন্তু বেশি চুল পড়ে না। কারণ, তারা প্রচুর রোদে যায় এবং তাদের গায়ে ভিটামিন ডি লাগে। অন্যান্য ভিটামিনও কিন্তু চুলের জন্য লাগে। খাদ্যাভ্যাস সঠিক করতে হবে এবং সকালে একটু রোদ পোহাতে পারলে আরো ভালো। কিছু খাবারের অভাবে কিন্তু আজকাল চুল পড়ে যাচ্ছে। একটু রোদ পোহাতে হবে। না হলে ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট খেতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে।

 

প্রশ্ন : চিকিৎসা কী?  উত্তর : আমরা যেটা বলছিলাম, ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি সাপ্লিমেন্ট দিলাম, এর সঙ্গে এন্ড্রোজেন যেটা, যার কারণে চুল পড়ে যায়, তার বিরুদ্ধে কিছু অ্যান্টিএন্ড্রোজেন রয়েছে, সেগুলো দিই। কম বয়সে ওষুধগুলো বেশি কার্যকর। বেশি বয়সে, এই ওষুধগুলো তেমন কার্যকর হয় না। কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। বেশি বয়সে আমরা এই ওষুধগুলো দিতে চাই না। যাদের ২০/২৫ বছর বয়সে চুল পড়ে যাচ্ছে, তাদের জন্য আমরা এই ওষুধগুলো দিই। দেখা যায়, চুল তো পড়া কমেই, কিছু চুল গজায়ও। সঙ্গে একটি লোশন রয়েছে, সেটিও আমরা দিতে পারি। দিলে কিন্তু আমরা চুলটাকে ধরে রাখতে পারি। এরপর দেখা যায় মাঝেমধ্যে কঠিন হয়ে যায়। ধরে রাখা যাচ্ছে না। চুল পড়ছে। এখন নতুন একটি চিকিৎসা এসেছে। একে আমরা পিআরপি বলি।

প্রশ্ন : পিআরপি কতবার দিতে হয় বা এর খরচ কেমন?  উত্তর : পিআরপির কিট খুব দামি দামি রয়েছে। আসলে খরচটা নির্ভর করে কী কিট বা উপাদান ব্যবহার করছি, এর ওপর। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছুটা কম দামি জিনিস ব্যবহার করে, পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে প্রত্যেক সেশন করা যায়। আমরা সাধারণত এক মাস পর পর সেশন দিই, পাঁচ থেকে আটটি। রোগী যখন বলবে আমি সন্তুষ্ট, তখন আমরা এটি বন্ধ করতে পারি। এর পর মাঝেমধ্যে বছরে এক-দুবার পিআরপি দিলে দেখা যাবে চুল ধরে রাখা সম্ভব।

প্রশ্ন : পিআরপি বেশ আধুনিক চিকিৎসা?  উত্তর : পিআরপি কেবল চুলের জন্য নয়, ত্বকের ক্ষতের জন্য ব্যবহার করতে পারি। আপনার ঘা ভালো হচ্ছে না, সেখানে পিআরপি ব্যবহার করে ঘা শুকিয়ে ফেলতে পারি। এ ছাড়া আরো বিষয় রয়েছে, যেখানে পিআরপি ব্যবহার করতে পারি। পিআরপি হলো প্লাটিলেট রিচ প্লাজমা। আমাদের রক্তের মধ্যে একটি কণিকা রয়েছে, যাকে প্লাটিলেট বলি আমরা। এর মধ্যে প্রচুর গ্রোথ (বৃদ্ধি) উপাদান রয়েছে। আমরা যেটা করি, রোগীর শরীর থেকে রক্ত নেব, রক্ত নিয়ে প্লাটিলেটকে আলাদা করব। সেটা যদি আমরা ছোট ছোট করে মাথায় ইনজেকশন দিয়ে দিই, তাহলে দেখা যাবে যেই ফলিকলগুলো মরে যাচ্ছিল বা যেখান থেকে চুল গজানোর কোনো সম্ভাবনা ছিল না, সেগুলো আবার জীবিত হয়ে চুল গজানো শুরু করে। তবে মনে রাখতে হবে, চুল পড়া কমাতে পিআরপি একাই যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট, জীবনযাপনের ধরনের পরিবর্তন, মানসিক চাপ কমানো—এগুলো থাকতে হবে।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>