এসির কারণে যেসব মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে আপনার শরীরের!

গরমের দিনের সবচেয়ে কার্যকরী বন্ধুর কথা জিজ্ঞেস করলে কার নাম আগে মাথায় আসে? —অবশ্যই ইলেকট্রিক ফ্যান। কিন্তু কখনো কখনো চারপাশের হাওয়া এতোটাই উত্তপ্ত হয়ে যায়, ফ্যানে আর কাজ করে না। তাছাড়া আমাদের এশিয়ান দেশ গুলোর আরেকটি বিরাট সমস্যা হচ্ছে লোডশেডিং, যার ফলে কঠিন গরমে আমাদের প্রায়ই কষ্ট পেতে হয়। ধরুন আপনার ঘর প্রচণ্ড গরম হয়ে গেছে, এই অবস্থায় আপনার করনীয় কি হবে? মানে কিভাবে আপনার ঘরকে ঠাণ্ডা করবেন? ফ্রিজের দরজা খুলে রেখে? —যদিও এটা সম্পূর্ণ বোকামু আইডিয়া, তারপরেও এয়ার কন্ডিশনার (Air conditioners) বা এসি অনেকটা এই রূপেই কাজ করে, তবে একটু আলাদা ম্যাকানিজম ব্যবহার করে। তো চলুন সবকিছু বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

এয়ার কন্ডিশনার: গ্রীষ্মের বাতাস এতো গরম হওয়ার কারণ হচ্ছে এতে অনেক বেশি আদ্রতা এবং বাষ্প মিশিয়ে থাকে। তাছাড়া মাথার উপরের সূর্য তো সর্বদা আগুন ঢেলেই যায়। ঘরের ভেতর সূর্যর তাপ থেকে রেহায় পাওয়া গেলেও আদ্র বা বাস্প মেশানো বাতাস থেকে বাঁচা দুষ্কর হয়ে পড়ে। তাহলে এই অতিরিক্ত গরমকে হটানোর বুদ্ধি কি? পদার্থ বিজ্ঞান অনুসারে শক্তির কোন উৎপত্তি বা শেষ নেই, অর্থাৎ ঘরের ভেতর তৈরি হওয়া উত্তাপকে আপনি কখনোই ধ্বংস করতে পারবেন না। কিন্তু শক্তি রুপ বদলাতে পারে, অর্থাৎ আপনি অপ্রয়োজনীয় তাপকে বাইরে পাম্প করে ছুড়ে ফেলতে পারেন এবং শীতল বাতাস প্রবেশ করানোর মাধ্যমে ঘরকে ঠাণ্ডা করতে পারেন। এতে শক্তি এক রুপ থেকে আরেক রূপে পরিবর্তিত হয়ে যাবে। তাহলে ফ্রিজের দরজা খুলে রাখলে কি হবে? ফ্রিজ তো অনেক ঠাণ্ডা থাকে আর দরজা খুলে রাখলে তো ঠাণ্ডা বাতাস বেড়িয়ে আসবে আর ঘর ঠাণ্ডা হয়ে যাবে, তাই না? হ্যাঁ, কিছুক্ষণ হয়তো আপনাকে ঠাণ্ডা বাতাস প্রদান করবে, কিন্তু ধীরেধীরে ফ্রিজ নিজেই উত্তপ্ত হতে আরম্ভ করবে। কেনোনা ফ্রিজের নিজেরই বাইরের উত্তাপ থেকে বাঁচার জন্য সোলার বাক্সের গঠন হয়। কিন্তু আপনি ফ্রিজের মতো একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘর ঠাণ্ডা করতে পারবেন, তবে ঘরে ফ্রিজের দরজা খুলে রেখে নয়, বরং ঘরের চারিদিকে ফ্রিজ আবৃত করিয়ে। অর্থাৎ আপনাকে এমন প্রযুক্তি উন্নতি করার দরকার হবে যাতে মনে হয় আপনার ঘরটি হলো ফ্রিজের দরজার ভেতরের অংশ। তবেই এটি ঠিকঠাক মতো কাজ করবে, আর এয়ার কন্ডিশনার এর পেছনের সমস্থ আইডিয়া এটাই। এসি এবং আপনার বাড়ির ফ্রিজ ঠিক একই পদ্ধতিতেই কাজ করে, কিন্তু এসিকে এক বিশাল ফ্রিজ বলতে পারেন, কেনোনা এখানে আপনার সম্পূর্ণ রুমটিই ফ্রিজের ন্যায় আচরণ করে। এয়ার কন্ডিশনার এবং ফ্রিজের বাতাস ঠাণ্ডা করার সূত্রও এক। পদার্থ বিজ্ঞান অনুসারে যখন কোন তরলকে গ্যাসে পরিণত করা হবে তখন তাপের শোষণ ঘটবে। আর এসির কপার কয়েলের মধ্যে এক বিশেষ ধরনের কেমিক্যাল থাকে যেখানে তরল থেকে গ্যাস এই প্রক্রিয়াকে ফোর্স করে বারবার করানো হয়, আর এভাবেই চারপাশের আবহাওয়া থেকে গরম শোষণ করে নেওয়া হয়। তাছাড়া এসির মধ্যে ফ্যান থাকে, যেটি ভেতরের গরম হাওয়াকে ঠাণ্ডা পাইপের উপর দিয়ে পরিচালিত করে। যখন গরম বাতাসকে এই নলের উপর দিকে প্রবাহিত করানো হয়, নলের ভেতরে চলা বিক্রিয়ার কারণে এটি গরমকে শোষণ করে নেয়। কিন্তু লাগাতার এই বিক্রিয়া (তরল থেকে গ্যাস হওয়ার বিক্রিয়া) চলার জন্য এতো তরল পদার্থ আসে কোথা থেকে? এয়ার কন্ডিশনার, সর্বদা ঠাণ্ডা করার ব্যবস্থাকে চালু করে রাখতে নলের ঐ গ্যাসকে আবার তরলে পরিণত করে দেয় যাতে বিক্রিয়া অবিরত চলতেই থাকে।

এসির প্রক্রিয়া ঠিকঠাক চলার জন্য একটি কম্প্রেসর থাকে, যেটি গ্যাসকে চাপের মধ্যে ফেলে দেয় বা কমপ্রেস করতে আরম্ভ করে, আর এই প্রসেসের ফলে অপ্রয়োজনীয় তাপের সৃষ্টি হয়। আপনি নিশ্চয় পাম্পার ব্যাবহার করে বাই-সাইকেলের চাকা পাম্প করেছেন; সেখানে লক্ষ্য করে দেখবেন যে, বাতাস পাম্প করার সময় অর্থাৎ বাতাসে চাপের সৃষ্টি করার ফলে পাম্পার গরম হয়ে যায়। কেনোনা আপনি বাতাসকে চাপ প্রয়োগ করে কম আয়তনের জায়গায় বেশি করে ঠুসে দিচ্ছেন। আর এই জন্যই সাইকেলের পাম্পার আর টিউবের তাপমাত্রা বাইরের পরিবেশের তাপমাত্রা থেকে বেশি হয়ে থাকে। কিন্তু এবার আপনি সাইকেলের টিউবে থাকা চাপা বাতাসকে বেড় করে দেন তবে দেখবেন সেখান থেকে ফ্রেস আর শীতল বাতাস বেড় হবে—আর ঠিক এর উল্টা কারণে আপনার বাই-সাইকেল পাম্পার গরম হয়েছিলো। যখন গ্যাস চিপাচাপা জায়গা থেকে বড় প্রশস্ত জায়গার দিকে প্রসারিত হয় তখন সেটা নিজের তাপমাত্রা হারিয়ে ফেলে আর শীতল হয়ে যায়। যাই হোক, এসির কম্প্রেসরে উৎপাদিত অতিরিক্ত তাপ আরেকটি কন্ডেনসিয়াল কয়েল এবং ফ্যানের মাধ্যমে বাইরে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। আর অপরদিকে যখন গ্যাস ঠাণ্ডা হয়ে যায়, সেটি আবার তরলে পরিণত হয়। আর এটা একই সাইকেলে কাজ করতে থাকে, তরল গ্যাসে পরিণত হয়, তাপ শোষণ করে, আবার গ্যাসকে কমপ্রেস করা হয়, অতিরিক্ত তাপ উৎপন্ন হয়, সেটাকে বেড় করে দেওয়া হয়, গ্যাস ঠাণ্ডা হয়ে আবার তরলে পরিণত হয়। আবার অনেক এসিতে হিটিং এলিমেন্ট লাগানো থাকে, ফলে সেটি শীতের সময় ঠাণ্ডা বাতাসকে গরম করে রুমের তাপমাত্রা আরামদায়ক করে তোলে।

এসি কিভাবে পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে? এয়ার কন্ডিশনারের ঠাণ্ডা বাতাসের সতেজ অনুভূতি সত্যিই অসাধারণ, এবং এমন কাউকে নিশ্চয় খুঁজেই পাওয়া যাবে না, যে এই অনুভূতি পছন্দ করবে না। আবার ফ্রিজের ঠাণ্ডা পানি, শরীর আর মনকে কতোটা সতেজ করতে পারে সেটার প্রমান গরম কালে পাওয়া যায়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে প্রত্যেকটি সুবিধারই কোন না কোন অসুবিধা নিশ্চয় থাকে। আর আমরা তো এসি বা ফ্রিজ ব্যবহার করে ঠাণ্ডা তৈরি করি না, জাস্ট তাপকে ঠাণ্ডায় পরিণত করি। আর পদার্থ বিজ্ঞানের সূত্র অনুসারে ঠাণ্ডা তৈরি করতে গিয়ে আমরা বিপরীতে গরমও উৎপন্ন করছি। এসি আপনার রুমের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রন করে সেটাকে শীতল করছে, কিন্তু এর বিপরীতে উৎপাদিত গরমকে বাইরে ছুড়ছে, ফলে পরিবেশ গরম হচ্ছে, আমরা আমাদের পৃথিবীকে উত্তপ্ত করে তুলছি, ফলে গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর মতো ভয়াবহ সমস্যার দিয়ে অগ্রসর হয়ে পরছি। অনেক পরিবেশ বিজ্ঞানী কম এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহার করার পরামর্শ দেয়। কিন্তু এটাও ভুলে গেলে চলবে না যে, এসি শুধু মাত্র শীতল অনুভূতি আর আরাম নয়, সাথে এসি রুমে বসে কাজ করলে সেটা আরো মনোযোগী করে তুলতে পারে আপনাকে এবং এসি স্বাস্থ্য’র জন্যঅ উপকারী। তাহলে ক্ষতিটা কোথায়?  প্রথমত ক্ষতি হচ্ছে, আমরা এসি চালাতে গিয়ে অনেক বেশি পরিমানে এনার্জি খরচ করছি। এসি ওয়ালা এবং এসি ব্যতিত বাড়ির বৈদ্যুতিক বিলে আকাশ পাতাল পার্থক্য এসে পড়ে। এসি দুই দিনে যে বিদ্যুৎ খরচ করে, সেটা ব্যবহার করে একটি সাধারন বাড়ি পুরা মাস চলতে সক্ষম।  আরেকটি মারাত্মক ক্ষতির কারণ হচ্ছে বেশিরভাগ এসি এবং রেফ্রিজারেটরে বর্তমানে ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (Chlorofluorocarbons) বা সিএসসি (CFCs) নামক এক কেমিক্যাল ব্যবহৃত হয়। যখন কোন পুরাতন এসি বা রেফ্রিজারেটর নষ্ট হয়ে যায় বা বলতে পারেন যখন এর জীবনকাল শেষ হয়ে যায়, এই ক্যামিকাল বায়ুমন্ডলের মধ্যে পালিয়ে যায় এবং উড়তে উড়তে আন্তর-আকাশে চলে যায়। এটি আন্তর-আকাশে গিয়ে আমাদের পৃথিবীর ওজোন-স্তরের অনেক ক্ষতি সাধন করে। ওজোন-স্তর আমাদের পৃথিবীর ডিফল্ট সানস্ক্রিন হিসেবে কাজ করে, সূর্য থেকে আশা ক্ষতিকর রশ্মিকে আটকে দেয়, যেটা আমাদের ত্বকে ক্যান্সারের সৃষ্টি করতে পারে। তবে অনেক দেশে বর্তমানে এয়ার কন্ডিশনার এ সিএফসি ব্যবহার করা ব্যান করে দিয়েছে। সিএফসি’র বদলে এইচসিএফসি (HCFCs) ব্যবহার করা হয়, যেটা ওজোন বন্ধুত্বপূর্ণ কেমিক্যাল। [১]

এসির কারণে যে ১০ ক্ষতি হচ্ছে আপনার শরীরের: ভারতের দিল্লির বিএলকে সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডাক্তার আর কে সিংহল জানান, নিয়মিত এসি ঘরে থাকলে বেশ কিছু কুপ্রভাবে আক্রান্ত হতে পারে আপনার শরীর।তিনি ১০টি শারীরিক সমস্যার কথা বলেছেন, যা মূলত নিয়মিত এসি ঘরে থাকার ফলে দেখা দেয়। কোন কোন সমস্যা সেগুলি? আসুন, জেনে নেওয়া যাক— ১. এসি ঘরের তাপমাত্রা প্রাকৃতিক তাপমাত্রার চেয়ে কম হয়। এমন পরিবেশে মানবশরীরকে তার স্বাভাবিক তাপমাত্রা ধরে রাখার জন্য অধিক পরিশ্রম করতে হয়। তার ফলে শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ২. সারাক্ষণ এসি-তে থাকলে শরীরে রক্তসঞ্চালনে বিঘ্ন ঘটে। এর ফলে বিভিন্ন অংশের মাংসপেশিতে ক্র্যাম্প সৃষ্টি হয়, এবং মাথা ব্যথা দেখা দিতে পারে। ৩. এসি ঘরে তাপমাত্রার অদলবদল হয় না। ফলে এসি ঘরে থাকতে থাকতে শরীরও এক ধরনের তাপমাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। কোনও কারণে সেই তাপমাত্রার চেয়ে গরম বা ঠান্ডা অবস্থায় থাকতে হলে শরীর সেই তাপমাত্রার সঙ্গে চট করে মানিয়ে নিতে পারে না। এর ফলে উদ্বেগ কিংবা স্ট্রেসের মতো সমস্যা দেখা দেয়। ৪. দিনে অন্তত চার ঘন্টা এসি ঘরে থাকা যাদের অভ্যেস, তাদের মিউকাস গ্ল্যান্ড স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় শক্ত হয়ে যায়। এর ফলে তাদের সাইনাসের সমস্যা দেখা দেয়। ৫. এসি-র ফিল্টার যদি অনেক দিন পরিষ্কার করা না হয়, তা হলে এসি থেকে নির্গত বাতাসে অনেক সময় ধুলোবালি কিংবা ব্যাকটেরিয়া মিশে যায়। এর ফলে সর্দি-কাশি কিংবা জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ৬. এসি ঘরে স্বাভাবিকের তুলনায় আর্দ্রতা কম থাকে। এর ফলে স্কিনের ড্রাইনেস বা শুষ্কতার সমস্যা দেখা দেয়। ৭. এসি শুধু ত্বক নয়, চোখকেও শুষ্ক করে দেয়। এর ফলে চোখে চুলকানি, চোখ লাল হওয়া, চোখ থেকে পানি ঝরা— প্রভৃতি রোগের সৃষ্টি হয়। ৮. এসি ঘরে থাকলে হাঁটু, কোমর, কনুই কিংবা ঘাড়ের কার্যকারিতাও প্রভাবিত হয়। সাধারণত এই সমস্ত জয়েন্টে এসি-র হাওয়ার প্রভাবে যন্ত্রণা দেখা দেয়। ৯. দীর্ঘ সময় ধরে এসি ঘরে থাকলে অ্যাজমা অর্থাৎ হাঁপানির সম্ভাবনা বেড়ে যায়। যদি আপনার ঘন ঘন সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হওয়ার রোগ কিংবা ধুলোর অ্যালার্জি থেকে থাকে, তা হলে এসি ঘরে না থাকাই ভাল। ১০. এসি ঘরে থাকা হলে ধমনী বা শিরা সংকুচিত হয়ে যায়। এর ফলে দেহে রক্ত সঞ্চালন প্রভাবিত হয়। [২]

এসি রুমে আমাদের কী কী সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত? এখন আমি আরো একবার এসি ব্যবহারের নিয়মগুলো সংক্ষেপে বলছি  ১. এসি রুমের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রাখাই উত্তম। ২. এসি রুমে অবস্থানকালে বেশি পানি পান করা উচিত। প্রয়োজনে চা পান করা যেতে পারে। বিশেষ করে সবুজ চা এক্ষেত্রে উপকারী প্রমাণিত হতে পারে। ৩. খুব গরমেও একটানা এসির মধ্যে থাকা উচিত নয়। মাঝেমাঝে এসি বন্ধ রাখুন। আর কখনও সরাসরি এসির বাতাস গায়ে লাগাবেন না। ৪. এসি রুমে বাইরের বাতাস ঢুকতে দিন। সকাল ও সন্ধ্যায় একবার করে ১০ থেকে ২০ মিনিটের জন্য জানালা খুলে রাখুন। আরেকটি বিষয়, এসি রুমে ধূমপান করা উচিত নয়। ৫. এসি রুমে একটি গরম কাপড় রাখা উচিত। প্রয়োজনে যাতে তা গায়ে চাপানো যায়। রাতে ঘুমের সময় এসির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>