যেসব কারণে জ্ঞান হারাতে পারেন আপনি !

হঠাৎ জ্ঞান হারানো সাধারণত ক্ষণস্থায়ী, যা হওয়ার প্রধান কারণ মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যাওয়া। কখনো কখনো এটা মারাত্মক কোন অসুখের কারণে হয়ে থাকে। এ জন্য হঠাৎ অজ্ঞান হলে তা অবহেলা না করে জরুরিভাবে নিতে হবে যতক্ষণ না এর কারণ জানা যায় এবং তার চিকিৎসা করা না হয়। তবে বারবার জ্ঞান হারালে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

হঠাৎ জ্ঞান হারানোর কারণ  নিউরোকার্ডিওজেনিকের ( রিফ্লেক্স বা ভেসোভেগাল ) সময় রক্ত চাপ কমে যায়। ফলে হঠাৎ ক্ষণিকের জন্য মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ তথা অক্সিজেন কমে যাওয়ায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এ ধরনের অবস্থা হয়ে থাকে যখন মানুষ, ক. হঠাৎ রক্ত দেখে ভয় পায়  খ. গরিলা হঠাৎ সামনে এসে মুখ ভেংচি দেয়  গ. নিজের কোন নিকট আত্মীয়ের মৃত্যু সংবাদ শুনলে  ঘ. অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে  ঙ. গরম ও বন্ধ স্থানে অনেকক্ষণ আটকা থাকলে। অকুপেশনাল– এ ধরনের অবস্থা শরীরের কিছু কাজের সময় হতে পারে। যেমন, ক. কাশি দেয়ার সময় খ. মলত্যাগের সময় গ. বেশি ওজন তোলার সময় ঘ. হাঁচি দিলে ঙ. প্রসাব করার সময়। স্থান পরিবর্তনে রক্তচাপ কমে যায়। কখনো কেউ বসা অথবা শোয়া অবস্থা থেকে হঠাৎ দাঁড়িয়ে যান, তখন জ্ঞান হারাতে পারেন। কারণ এই সময় রক্ত শরীরের ওপরের অংশ থেকে নিচে অর্থাৎ পায়ে চলে আসে কিন্তু স্নায়ুতন্ত্রের প্রভাবে যদি রক্তচাপ ঠিক না থাকে তখন মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ কমে যায়। কারণ-ক. শরীরে অত্যধিক পানিশূন্যতা, ফলে রক্তচাপ কমে যায়। ডায়াবেটিস রোগের সঠিক চিকিৎসা না করলে বারবার প্রসাব হয়ে বা রক্তে সুগার বেশি থাকলে স্নায়ুর কার্জক্ষমতা হ্রাস পেলে। কিছু কিছু ওষুধ যেমন- বেটা ব্লকার, মূত্রবৃদ্ধিকারী ওষুধ, অন্যান্য উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ খেলে। মদ পান করে জ্ঞান হারান। পারকিনসন ডিজিজে স্নায়ুদুর্বলতায় রক্তচাপ কমে গেলে। হঠাৎ মাথা একদিকে ঘুরালে, কলার বা টাই বেশি চেপে পরলে, অথবা শেভ করার সময় ঘাড়ে ক্যারোটিড সাইনাসে চাপ পড়লে ( ৫০ বছরের বেশি বয়সে পরুষের এটা হতে পারে। তাছাড়া, হৃতপিন্ডের কারণেও জ্ঞান হারাতে পারেন যেমন- অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, হার্টের ভাল্ব সরু হয়ে যাওয়া, উচ্চ রক্তচাপ বা হার্ট অ্যাটাক হলে।

হঠাৎ অজ্ঞান হওয়ার আগে কী কী লক্ষণ দেখা যায়:  ১. পা ভারী বোধ ২. চোখে ঝাপসা দেখা ৩. গরম বোধ হওয়া ৪. মাথা ঘোরা ও মাথা পাতলা বোধ হওয়া ৫. বমির ভাব ৬. শরীর ঘেমে যাওয়া ৭. বমি ও হাই তোলা

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন: জ্ঞান হারানোর আগে যদি বুকে ব্যথা হয়, বুক ধড়ফড় করে, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন হয়- ১. জ্ঞান হারিয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হলে ২. জ্ঞান হারানোর আগে প্রসাব বা পায়খানা জয়ে থাকলে ৩. হার্টের অসুখ থাকলে ৪. গর্ভবতী হলে ৫. বারবার জ্ঞান হারালে ৬. ডায়াবেটিস থাকলে

কাউকে অজ্ঞান হয়ে যেতে দেখলে যা করবেন: অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এমন একটি অবস্থা, যেখানে ব্যক্তি বাইরের উদ্দীপনা প্রয়োগে কোনো সাড়া দেয় না। যেকোনো পরিমাণ উদ্দীপনায় সম্পূর্ণ সাড়াহীন অবস্থাকে কোমা বলে। চোখের তারা আলোর প্রতিক্রিয়া দেখে অজ্ঞানের বিভিন্ন পর্যায় বোঝা যায়। যদি আলো ফেললে চোখের তারা সংকুচিত হয়, সেটাকে বলে স্টেট সুপারন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে চোখের তারায় আলো ফেললে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় না এবং চোখের তারা প্রসারিত হয়ে যায়। কখনো কখনো কোমার সঙ্গে খিঁচুনি থাকে। চলতি পথে, কর্মস্থলে, বাড়িতে হঠাৎ কাউকে অচেতন হয়ে পড়তে দেখলে আপনি কী করবেন? অসুস্থ ব্যক্তির সহায়তায় এগিয়ে যাওয়া কর্তব্য। এমন পরিস্থিতিতে ঘাবড়ে না গিয়ে প্রাথমিক কিছু পদক্ষেপ নিলে হয়তো মানুষটার জীবন রক্ষা পাবে। নানা কারণে মানুষ সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলতে পারে। বুকে বা মাথায় আঘাত, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, শরীরে পানিশূন্যতা বা লবণশূন্যতা, রক্তে শর্করার মাত্রা হ্রাস, হঠাৎ রক্তচাপ হ্রাস, হৃদ্‌রোগ, মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহে ঘাটতি, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোক, মৃগীরোগ ইত্যাদি কারণে মানুষ আচমকা জ্ঞান হারায়। ওষুধ বা অ্যালকোহলের প্রতিক্রিয়া, এমনকি বিষক্রিয়াও হতে পারে কারণ। এমন অবস্থায়, কারণ যখন জানা নেই বা বুঝতে পারছেন না কিছু, তখন সেই মুহূর্তে আপনি কী করতে পারেন? কয়েকটি পরামর্শ:  ১. প্রথমে রোগীর চেতনা কতটুকু আছে বোঝার চেষ্টা করুন। জোরে ডাক দিয়ে দেখুন সাড়া দেয় কি না। ২. নাকের কাছে হাত দিয়ে বা বুকের ওঠানামা দেখে বোঝার চেষ্টা করুন শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে কি না। ৩. আক্রান্ত ব্যক্তিকে সোজা করে শুইয়ে দিন। বেশি নাড়াচড়া করবেন না বা স্থান বদলাবেন না। কারণ, আপনি জানেন না পড়ে গিয়ে কোনো হাড় ভেঙেছে কি না। সংজ্ঞা না থাকলে একটু একদিকে কাত করে রাখুন, চিত বা উপুড় না করে। এতে মুখে জমা লালা গলায় আটকে যাবে না। ৪. ব্যবহৃত পোশাক ঢিলা করে দিন। পা দুটো একটু উঁচু করে দিন। মাথা পেছন দিকে কাত করে থুতনি উঁচু করে ধরুন। ৫. নিশ্বাস বন্ধ থাকলে মুখে মুখ লাগিয়ে জোরে বাতাস দিতে পারেন। দেখবেন বুক ওঠানামা করছে কি না। খিঁচুনি হতে থাকলে চেপে না ধরে খোলামেলা জায়গায় কাত করে শুইয়ে রাখুন। ৬. অচেতন ব্যক্তিকে কিছু খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন না, মুখে পানি দেবেন না, স্যান্ডেল জুতা মুখের কাছে ধরার দরকার নেই। ৭. ডায়াবেটিস আছে জানা থাকলে সম্ভব হলে রক্তে শর্করার মাত্রা মাপুন। অথবা না মেপেই মুখের ভেতর খানিকটা চিনি দিতে পারেন। ৮. শরীর থেকে ইঁদুর মারার বিষ বা কীটনাশকের গন্ধ পেলে দ্রুত সব জামাকাপড় খুলে দিন ও পারলে ত্বক পানি দিয়ে ধুয়ে দিন। ৯. রক্তচাপ কম থাকলে পায়ের দিক উঁচু করে দিন।

ডাঃ মোঃ আকমান আলী।  ডা. এ হাসনাত শাহীন, হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ, বিআইএইচএস হাসপাতাল, ঢাকা।  ডা. মিজানুর রহমান কল্লোল,সহযোগী অধ্যাপক, অর্থোপেডিকস ও ট্রমাটোলজি বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।  ডা. শাকিল মাহমুদ, সহকারী অধ্যাপক, গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজ, সাভার।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>