শিশুর জন্মগত ত্রুটি ঠোঁট কাটা বা তালু কাটার চিকিৎসা কী?

ঠোঁট কাটায় উপরের ঠোঁটটা চেরা থাকে। এটি নাক ,উপরের চোয়াল, উপরের মাড়ি এ পুরো অংশ জুড়ে হয়। ঠোঁট কাটা বা তালু কাটা একটা জন্মগত ত্রুটি। মাতৃগর্ভে যখন একটি শিশুর ঠোঁট ,মুখ সঠিকভাবে গঠন হয় না তখন এমনটি ঘটে।এই জন্মগত ত্রুটিগুলোকে বলে “orofacial clefts”. গর্ভাবস্থার প্রথম দিকের সময় কারো কারো এটা হয়। আক্রান্ত শিশুর ঠোঁট কাটা থাকতে পারে, আবার তালুও কাটা থাকতে পারে কিংবা দুইটিই হতে পারে। আমাদের দেশে অনেক শিশুই এই ত্রুটি নিয়ে জন্মায়। আগে অনেক কুসংস্কার ছিল এই ধরনের শিশুদের নিয়ে। কিন্তু এখন এর চিকিৎসা খুব সহজেই হয়। এই ব্যাপারে আক্রান্ত পরিবারে সচেতনতা আগের চেয়ে বেড়েছে। এই রোগকে অনেকে অভিশাপ বলে মনে করেন। অথচ এই রোগের উন্নত চিকিৎসা এখন আমাদের দেশেই রয়েছে। ঠোঁট কাটা, তালু কাটা জন্মগতভাবে হয়। কেন এই সমস্যা হয়? ঠোঁট কাটা, তালু কাটার সমস্যা দেখলে শিশুকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নেওয়া প্রয়োজন। সাধারণত শিশু জন্মের পরপর এমন সমস্যা দেখলেই চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে। এ বিষয়ে কথা বলেছেন অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল বারী

প্রশ্ন : ঠোঁট কাটা, তালু কাটা বলতে কী বোঝানো হয়? কী কারণে এটি হয়ে থাকে?  উত্তর : এটি কিন্তু একটি জন্মগত রোগ। আমাদের দেশে প্রচলিত একটি কুসংস্কার আছে, এটি একটি অভিশাপ। তবে এটি আর দশটা রোগের মতো একটি রোগ। তবে এই রোগ জন্মগত। সন্তানরা যখন মায়ের পেটে থাকে, তখন থেকে এটা হয়। যদি ঠোঁট কাটা থাকে, তাহলে একে ক্লেপ লিপ বলি। আবার কখনো কখনো ঠোঁট কাটার সঙ্গে তালুটাও কাটা থাকে। তখন আমরা একসঙ্গে ক্লেপ লিপ অ্যান্ড প্যালেট বলি। এই দুটো একসঙ্গে থাকলে মাড়িও কাটা থাকে। এটা একদিকেও হতে পারে, দুদিকেও হতে পারে। আসলে সঠিক কারণ এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। তবে তাত্ত্বিকভাবে যদি আমি বলি, বিদেশে যেটি বলে, বংশগত কারণে অনেক সময় এটি হয়। দ্বিতীয় কারণ হলো, মায়ের পেটে যখন বাচ্চাটা থাকে, তখন ভাইরাস সংক্রমণের কারণে এমন হতে পারে। তৃতীয় হলো পরিবেশগত কারণ। পরিবেশের যে অবস্থাটা, সে কারণে হয়। দেখা গেছে বস্তি এলাকায় বেশি হয়। আর চতুর্থ কারণ হলো পুষ্টি। মানে পুষ্টির অভাব। তবে আমাদের হিসাবে এ বিষয়ে কিছু ভিন্নতা রয়েছে। বাংলাদেশে আমরা দেখেছি বস্তিবাসীর সন্তানদের মধ্যে ঠোঁট কাটা, তালু কাটার সমস্যা আমরা পাই। আমার জীবনে ১২ হাজার ঠোঁট কাটা, তালু কাটা পেয়েছি। আমি কিন্তু কোনো ধনী লোকের বাচ্চাকে পাইনি। খুব অল্পসংখ্যক মধ্যবিত্তদের কয়েকটি কেস পেয়েছি। সবচেয়ে বেশি পেয়েছি একদম দরিদ্র মানুষের মধ্যে। দরিদ্র মানুষের মধ্যে পার্থক্য কী? এখানে পুষ্টি একটি কারণ হিসেবে আসছে। বাচ্চারা যখন মায়ের পেটে ছিল, তখন পুষ্টিটা ভালোভাবে পায়নি। দ্বিতীয়ত, তারা যখন বস্তি এলাকায় থাকে, সেই পরিবেশটা অত্যন্ত খারাপ একটি পরিবেশ। এটি তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। রুবেলা, মিজেলসে এই জাতীয় লোকরাই কিন্তু বেশি আক্রান্ত হয়। তাই আমরা বলি, পুষ্টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রশ্ন : এটি কি পুরোপুরি প্রতিকারযোগ্য?  উত্তর : অবশ্যই। এটি একটি নিরাময়যোগ্য, চিকিৎসাযোগ্য একটি রোগ। এই রোগ নিয়ে যদি সময়মতো আসে আমাদের কাছে এবং যদি চিকিৎসা দেওয়া হয়, তাহলে পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। তবে সময়মতো আসতে হবে। ঠোঁট কাটার ক্ষেত্রে, বাচ্চার ওজন যদি পাঁচ কেজি হয়, বয়স যদি তিন মাস বা চার মাস হয়, তখন যদি আসে, অস্ত্রোপচার করলে ফল খুব ভালো পাওয়া যায়। আর তালুর ক্ষেত্রে ১০/১২ মাস, বেশি হলে ১৮ মাসের মধ্যে যদি করা যায়, তাহলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। তার কোনো নেজাল ভয়েজ (নাকি স্বর) থাকবে না বা কান পাকা থাকবে না, তার খাবার নাক দিয়ে আসবে না।

প্রশ্ন : সাধারণত কত সময় লাগে এই অস্ত্রোপচার করতে?  উত্তর : আদর্শ সময় হলো দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। কিন্তু যেহেতু বাংলাদেশে এখন এই সংখ্যাটা অনেক, যেহেতু আমরা অনেক অস্ত্রোপচার করছি, তাই দেড় ঘণ্টার মধ্যে একটি তালু এবং সোয়া ঘণ্টার মধ্যে একটি ঠোঁট কাটার অস্ত্রোপচার করতে পারি। তবে বিষয়টি একজন ভালো অ্যানেসথেশিয়ানিস্টের ওপর অনেকটা নির্ভর করে। আদর্শ সময় হলো দুই ঘণ্টা।

প্রশ্ন : এর জন্য তো সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হয়। শেষ পর্যন্ত কি আপনারা এই চিকিৎসাটা দিতে পারেন?  উত্তর : সরকারি হাসপাতালে এটি সম্ভব হয়। তবে বেসরকারিভাবে এটি একটু কঠিন হয়। আমরা যেটি করি, অস্ত্রোপচারের আগে পেডিয়াট্রিশিয়ানের কেয়ারে থাকতে বলি। উনি যখন ক্লিয়ারেন্স দেন, তখন প্লাস্টিক সার্জনরা অস্ত্রোপচার করি। করে যদি মনে করি, একজন মেক্সিলোফেসিয়াল সার্জনের পরামর্শ লাগবে, তার কাছে আমরা পাঠিয়ে দিই। তার পরামর্শ যখন নিয়ে আসে, তখন আমরা অস্ত্রোপচার করি। করার পরে স্পিচ ১০০ ভাগ ভালো করার জন্য স্পিচ থেরাপিস্টের কাছে আমরা পাঠিয়ে দিই। তার আগে যদি দেখি হার্টের সমস্যা রয়েছে, অবশ্যই আমরা কার্ডিওলজিস্টের কাছে পাঠাই, তার পরামর্শের জন্য। তাঁরা যদি পরামর্শ দেন এই রোগী অস্ত্রোপচার করা যাবে, তখনই আমরা অস্ত্রোপচারে যাই। এতগুলো বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে অস্ত্রোপচার হয়।

প্রশ্ন : তালু কাটা, ঠোঁট কাটার ক্ষেত্রে সার্জারি করার উপযুক্ত সময় কোনটি?  উত্তর : বাচ্চাদের যেহেতু পুষ্টির একটি ঘাটতি থাকে। সে জন্য আমরা বলি, তিন মাস বয়স থেকেই একে শুরু করা উচিত এবং এক বছরের মধ্যে একে শেষ করতে হবে। তাহলে শিশুটির খুঁতগুলো কিছুই থাকবে না। যে বাচ্চার তালু কাটার সমস্যা থাকবে তাকে ১০ মাসের মধ্যে সার্জারি শেষ করতে পারলে, তার কথা বলারও কোনো সমস্যা হবে না। এখানে আমরা কিছু সময়ের জন্য স্পিচ থেরাপিস্টও ডাকি, স্পিচ থেরাপি দিয়ে কথা বলাকে স্বাভাবিক করার জন্য। আর ঠোঁট কাটার যে সমস্যাগুলো- যদি তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে করতে পারি, তাহলে ওর ক্ষেত্রে আপনি বুঝতে পারবেন না যে তার সমস্যা ছিল। আর আমি একটু বলতে চাই, এসব দিকে মায়েরা কেন যেন একটু সচেতন কম। অনেকে মনে করেন, এটি আল্লাহ দিয়েছে, এভাবেই চলবে। এ রকম করে তারা বয়স অনেক বাড়ায়। তারপর কিছু কিছু ক্ষেতে তারা আমাদের কাছে আসে বয়স বাড়িয়ে। ওই ক্ষেত্রে আমরা তাদের বলি, এখন স্পিচ থেরাপি দিয়েও ভয়েস পরিবর্তন করা যাবে না।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>