অস্বাভাবিক এবং বিকৃত যৌনাচার প্যারাফিলিয়া !

Share This
Tags

সেক্স বা যৌনতা- শব্দগুলো বরাবরই সুড়সুড়ি দেয়ার মতো। এতদিন ধরে যৌনতা বিষয়ক যে কোনো আলোচনা ছিল ট্যাবু। কিন্তু বর্তমানে মিডিয়া, ইন্টারনেটের কল্যাণে ‘সেক্স’ শব্দটি আর নিষিদ্ধ নয়। এখন যৌন আচরণ অনেকক্ষেত্রেই অস্বাভাবিক, কখনো কখনো বড্ড নোংরা। অস্বাভাবিক এবং বিকৃত এই যৌনাচারকে মেডিকেলের ভাষায় প্যারাফিলিয়া (Paraphilia) বলে। আজকের আলোচনায় এ ধরনের কিছু কমন বিকৃত যৌন আচরণ সম্পর্কে আমরা জানবো।

স্বমৈথুন/আত্ম মৈথুন (Masturbation): যখন একজন মানুষ অন্য কোনো মানুষের বা প্রানীর সংস্পর্শ ছাড়া নিজে নিজেই যৌনক্রিয়া সম্পন্ন করে এবং চুড়ান্ত পরিতৃপ্তি লাভ করে তাকে আত্ম মৈথুন বা স্বমৈথুন বলা হয়। পুরুষেরা সাধারনত বালিশ বা বিছানার সাথে পুরুষাঙ্গ ঘর্ষনের মাধ্যমে এমনটি করায় অভ্যস্ত হয়ে থাকে। তবে বিভিন্ন ধরনের বোতল, টেষ্ট টিউব, রাবারের তৈরী কৃত্রিম যোনিপথ বা ডিভাইস, খেলনা পুতুল ইত্যাদি সামগ্রীও এজন্য ব্যবহার করতে দেখা যায়। যখন হাতের সাহায্যে একাজটি করা হয় তাকে হস্ত মৈথুন বলে। মহিলারা সাধারনত একটি আঙ্গুলের সাহায্যে আলতোকরে একটা নির্দিষ্ট ছন্দে ভগাঙ্কুর (Clitroris) ও যোনি পাপড়ি (Labia minora) মর্দন করে যৌন পরিতৃপ্তি নিয়ে থাকে। এছাড়া হাত, বালিশ, বিছানা বা এই জাতীয় কিছু দিয়ে যৌনাঙ্গ চেপে ধরে রেখেও অনেকে পূর্ন পরিতৃপ্তি নেয়। রাবারের তৈরী কৃত্রিম পুরুষাঙ্গ, নিজের আঙ্গুল, কাঠের মসৃন দন্ড, টেষ্ট টিউব ইত্যাদি সামগ্রী যোনি পথে প্রবেশ করিয়েও অনেকে আত্ম মৈথুন করে থাকে। আত্ম মৈথুন কে স্বাভাবিক যৌনাচার হিসেবে গন্য করা হয়। তবে কেউ যদি যৌনসঙ্গী থাকা সত্ত্বেও আত্মমৈথুন কেই কেবল পরিতৃপ্তির মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করে তাহলে তা স্বাভাবিক নয় বলে ধরে নেয়া হয়। জনসম্মুখে আত্মমৈথুন করাটাও স্বাভাবিক যৌনাচার নয়, একে বিকৃত যৌনাচার হিসেবে গন্য করা হয় এবং এটা শাস্তিযোগে অপরাধ।

লেসবিয়ানিজম (Lesbianism or Tribadism): দুটি মেয়ের মধ্যে কৃত যৌনাচার কে লেসবিয়ানিজম বলা হয়, এটা একধরনের সমকামীতা। একে একসময় সব দেশেই বিকৃত যৌনাচার এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গন্য করা হতো, বর্তমানে অনেক দেশেই লেসবিয়ানিজমের অনুমতি দেয়া হয়। এটা আসলে স্বাভাবিক কোনো যৌনাচার নয়, এক ধরনের মানসিক বৈকল্যের কারনে এমনটি ঘটতে পারে। এই ধরনের মহিলারা পুরুষদের প্রতি আগ্রহহীন এবং উদাসীন থাকে এবং এদের নারী সঙ্গীটির প্রতিও এদের অদম্য হিংসা থেকে থাকে। সাধারনত পরষ্পরের যৌনাঙ্গ ঘর্ষন, ওষ্ঠ চুম্বন, স্তন মর্দন, ভগাঙ্কুর মর্দন এসব ক্রিয়ার মাধ্যমে লেসবিয়ানিজম করা হয়ে থাকে। নিঃসঙ্গতা, একাকীত্ব, পারিবারিক কলহ ইত্যাদিকে অনেক সময় এই বৈকল্যের কারন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ছাত্রী নিবাসের ছাত্রী বা ডরমেটরিতে থাকা মেয়েদের ও অনেকসময় এমন কাজে উৎসাহিত হতে দেখা যায়। এভাবে পুরুষের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা এবং কেবল নারীর প্রতি যৌনউত্তেজনা অনুভব করা একধরনের মানসিক ব্যধি তাই মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করে এর থেকে মুক্তি পাবার চেষ্টা করা উচিত।  বিসটিয়ালিটি (Bestiality): পশু-পাখির সাথে মানুষের অবৈধ যৌনাচারকে বিসটিয়ালিটি বলে। এটা একধরনের অস্বাভাবিক এবং বিকৃত যৌনাচার বলে গন্য হয়। এই ধরনের লোকগুলো নিসঙ্গতার কারণে একধরনের মানসিক ব্যধিতে ভোগে এই ধরনের বিকৃত যৌনাচারে লিপ্ত হয়। সাধারনত রাখাল শ্রেনীর পেশাজীবিদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশী থাকতে দেখা যায়। গরু, বাছুর, ছাগল, গাধা, শুকর, হাস, রাজহাস, মুরগি থেকে শুরু করে অন্য পশুপাখীদের সাথেও এমন কাজ করার ঘটনা ঘটতে পারে। এটা শাস্তি যোগ্য অপরাধ। সামাজিক, ধর্মীয়, রাষ্ট্রীয় কোনোভাবেই এমন পাপাচারের স্বীকৃতি দেয়া হয়না। এর ফলে অপরাধীর যৌনাঙ্গ অনেক সময় আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং মানুষটি একসময় পুরোপুরি মানসিক বিকৃতির দিকে চলে যেতে থাকে। তাই কারো মনে এমন প্রবণতা জাগ্রত হলে শুরুতেই মনোরোগ চিকিৎসকের স্মরনাপন্ন হওয়া উচিত।  স্যাডিজম (Sadism): এটা একধরনের বিকৃত যৌন রুচি (Sexual Perversion)। এই ধরনের বিকৃতিতে পুরুষ সঙ্গীটি তার স্ত্রী যৌনসঙ্গীকে আঘাত করে, ব্যথা দিয়ে বা বিভিন্ন অত্যাচার করে চরম যৌনতৃপ্তি (Gratification) লাভ করে। এই বিকৃত রুচির লোকটিকে বলা হয় স্যাডিস্ট (Sadist)। স্যাডিস্ট তার সঙ্গীনিকে লাঠি বা চাবুক দিয়ে পিটিয়ে, কামড়ে দিয়ে এমনকি ছুরি দিয়ে কেটে বা অন্যভাবে আঘাত করে বেদনার্ত হতে দেখে পরিতৃপ্তি লাভ করে। বিকৃতির চুড়ান্ত পর্যায়ে অনেক স্যাডিস্ট তার সঙ্গীনিকে হত্যা করে তার যৌনতৃপ্তি লাভ করে, তখন একে বলা হয় Lust murder । কোনো কোনো মহিলাও এমন বিকৃত রুচির যৌনাচারে অভ্যস্ত হতে পারে। এ ধরনের মানসিক বৈকল্যের জন্য অবশ্যই মনোরোগ চিকিৎসকের স্মরনাপন্ন হওয়া উচিত।  ম্যাসোকিজম (Masochism): ম্যাসোকিজম হলো স্যাডিজমের ঠিক বিপরীত। এই ধরনের বিকৃত যৌনাচারে পুরুষ সঙ্গীটি স্ত্রী সঙ্গীটি দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে তার পুর্নাঙ্গ যৌনতৃপ্তি লাভ করে। এজন্য পুরুষটি মহিলা সঙ্গীকে উলঙ্গ অবস্থায় তাকে আঘাত করার জন্য অনেক সময় বাধ্য করে। কোনো কোনো মহিলাও এমন বিকৃত রুচির যৌনাচারে অভ্যস্ত হতে পারে। এ ধরনের মানসিক বৈকল্যের জন্য অবশ্যই মনোরোগ চিকিৎসকের স্মরনাপন্ন হওয়া উচিত।  একজিবিশনিজম (Exhibitionism): এ ধরনের বিকৃত যৌনাচারি জনসম্মুখে তার যৌনাঙ্গ প্রদর্শন করে যৌনতৃপ্তি লাভ করে। সাধারনত বিকৃত রুচির পুরুষটি চলন্ত ট্রেনের কামড়া, বাস, বাস স্টপেজ, স্নানাগারের সম্মুখ, সমুদ্রের পার ইত্যাদি স্থানে মহিলাদের সামনে ইচ্ছাকৃত ভাবে তার যৌনাঙ্গ প্রদর্শন করে এবং কখনো কখনো হস্তমৈথুন করে তার পরিতৃপ্তি লাভ করে। ইদানিং অনেক মহিলাদের মধ্যেও এমন বিকৃতি দেখা যায়।

ওরাল সেক্স (Sexual oralism):
মুখ গহ্ববর দ্বারা বিপরীত লিঙ্গ বা সমলিঙ্গের যৌনাঙ্গ চোষন (Sucking) বা লেহন করে যে যৌন ক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় তাকে ওরাল সেক্স বলা হয়। এটা দু ধরনের, যখন পুরুষ সঙ্গীটি স্ত্রী সঙ্গীর যৌনাঙ্গ চোষন করে পুর্ন যৌন পরিতৃপ্তি গ্রহন করে তাকে কনিলিঙ্গাস (Connillingus) বলা হয়। আবার স্ত্রী সঙ্গীটি পুরুষ সঙ্গীর যৌনাঙ্গ চোষন করে পুর্ন যৌন পরিতৃপ্তি গ্রহন করলে তাকে ফেলাসিও (Fellatio) বলা হয়। যুগলদের মধ্যে কনিলিঙ্গাস এবং ফেলাসিও ই যখন চরম যৌন পরিতৃপ্তি লাভের একমাত্র ক্রিয়া হিসেবে ব্যবহৃত হয় তখন তা অস্বাভাবিক যৌনাচার হিসেবে গন্য করা হয়। যখন কোনো যুগল মুল রতি ক্রিয়া বা মিলনের পূর্বে Love play এর অংশ হিসেবে ওরাল সেক্স করে তখন তা স্বাভাবিক যৌনাচার হিসেবেই গন্য করা হয়।  ইনসেস্ট (Incest): আপন আত্মীয় স্বজন যাদের সাথে সামাজিক বা ধর্মীয় ভাবে বিবাহ নিষিদ্ধ তাদের সাথে যৌনাচার করাকে ইনসেষ্ট বলা হয়। আপন মা, বাবা, ভাই, বোন, মামা, চাচা, খালা, ফুফু, নানা, দাদা, নানী, দাদী, ভাগ্না, ভাগ্নি, ভাতিজা, ভাতিজি , সৎ ভাই বোন, সৎ মা-বাবা (হিন্দু ও খৃষ্ট ধর্মে আপন চাচাতো/মামাতো ভাইবোন) এদের সাথে বিবাহ ধর্মীয় ভাবে নিষিদ্ধ, এদের সাথে কোনো অবস্থায় যৌন সম্পর্ক স্থাপনই ইনসেষ্ট হিসেবে গন্য হয়। সাধারণত মাতাল বা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় এমনটি ঘটে থাকে, এছাড়া চরম যৌন উত্তেজনাকর অবস্থায়, অল্পবয়সে একাকী এবং ঘনিষ্টভাবে থাকার কারনেও এমনটি হয়ে থাকতে পারে। পরবর্তীতে পরিণত বয়সে এ জন্য মানুষ কে চরম অনুতপ্ত হতে হয় এবং এজন্য অনেকেই অনেক ধরনের মানসিক ব্যধিতে ভুগে থাকে।  সোডোমি (Sodomy): গুহ্যদার বা পায়ুপথ দিয়ে যৌনাচার করাকে সোডোমি বলা হয়। সোডোমি যদিও দুটি পুরুষের মধ্যেই বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় তবে একজন পুরুষ একজন মহিলার পায়ুপথে যৌনাঙ্গ প্রবেশ করালেও তা সোডোমি হিসেবে গন্য করা হয়। সোডোমিকে স্বাভাবিক যৌনাচার হিসেবে গন্য করা হয়না। যেসব দেশে সমকামীতার অনুমতি নেই সেখানে সোডোমি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। স্ত্রীর সাথে সোডোমি করা ধর্মীয় ভাবে নিষিদ্ধ করা আছে। স্ত্রীর অনুমতি ব্যতীত এমন যৌনাচার শাস্তিযোগ্য অপরাধ/ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হয়। সমকামীতা হিসেবে সোডোমি নাবিক, জেলখানার কয়েদী, প্রতিরক্ষাবাহিনী এবং ছাত্রাবাসে থাকা ছাত্রদের মধ্যে বেশী দেখা যায়। এমন ব্যভিচারের কারনে যৌনবাহিত রোগ (যেমন এইডস) খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

পেডোফিলিয়া (Pedophilia) এ শব্দটির সাথে অনেকেই পরিচিত, বাংলায় যাকে শিশুকাম বলে। যখন বয়স্ক ব্যক্তিরা কোনো বাচ্চার প্রতি যৌনাকাঙ্ক্ষা অনুভব করে, তখন বুঝতে হবে তিনি পেডোফিলিক। চাইল্ড পর্নোগ্রাফি দেখা অধিকাংশ ব্যক্তির মধ্যে শিশুকামিতার বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। আমাদের ৩য় গল্পের পূজা পেডোফিলিয়ার শিকার হয়েছিল।  এক্সিবিশনিজম (Exhibitionism) লেখার শুরুতেই যে ঘটনাটা উল্লেখ করা হয়েছে, তাকে বলা হয় এক্সিবিশনিজম। অপরিচিত কাউকে বা জনসম্মুখে নিজের গোপনাঙ্গ দেখিয়ে যৌন তৃপ্তি পাওয়াকেই এক্সিবিশনিজম বলে। একটি সুইডিশ সার্ভে মতে, সুইডেনের ২.১% নারী ও ৪.১% পুরুষ মনে করে, অপরিচিত কারও কাছে নিজেদের গোপনাঙ্গের প্রকাশ তাদেরকে উত্তেজিত করে। মাঝেমাঝেই আমরা শুনি, অমুক মডেল ঘোষণা দিয়েছে তার প্রিয় কোনো দল খেলায় জিতলে তিনি উলঙ্গ হয়ে রাস্তায় নামবেন। কিংবা ক্রিকেট খেলার মাঠে হঠাৎ করেই এক তরুণী উলঙ্গ হয়ে দৌড়ানো শুরু করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এমন ব্যক্তিরা এক্সিবিশনিজমে আক্রান্ত থাকে।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>