বাচ্চা নেওয়ার আগেই জানতে হবে সম্ভাব্য সব কিছু!

গর্ভধারণের আগে কাউন্সেলিং বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এতে কোনো সমস্যা থাকলে আগে থেকে সচেতন হয়ে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যায়। গর্ভধারণের আগে কাউন্সেলিংয়ের প্রয়োজনীয়তা ও অন্যান্য আরও জরুরি বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন ডা. শামিমা নার্গিস নিলা

প্রশ্ন : প্রি-প্রেগন্যান্সি কাউন্সেলিংয়ের গুরুত্ব কতখানি? আপনারা কী কী বিষয়ে গুরুত্ব দেন?  উত্তর : প্রি-প্রেগন্যান্সি কাউন্সেলিং খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নতুন বিবাহিত দম্পতি তারা বাচ্চা নিতে চায়। তারা কিছুই জানে না বাচ্চা নিয়ে ফেলল। নেওয়ার পর দেখা যায় তার হয়তো ডায়াবেটিস ছিল। তার হয়তো বা প্রেশার ছিল, সে জানেই না। তাই তারা যদি পরিকল্পনা করার সময় আমাদের কাছে আসে, তাহলে আমরা তাদের ইতিহাস নিয়ে, কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, দেখতে চাই যে তাদের কোনো ডিজঅর্ডার রয়েছে কি না। এটি আমরা ঠিক করে নিতে পারব। এরপর গর্ভাবস্থা নিলে মা ও শিশুর কোনো ঝুঁকি থাকে না। আবার এমনও হয়, এ সময় আমরা একটা ভিটামিন দিই, যাকে আমরা জিংক বলি। এটা যদি কেউ গর্ভধারণের তিন মাস আগে থেকে খায়, তাহলে বাচ্চার অনেক সমস্যা হয় না। মূলত ফলিক এসিড, জিংক দুটোই আমরা দিই। আবার কারো যদি ডায়াবেটিস থাকে, সে হয়তো আগে থেকে জানে না, তাকে যদি আমরা নিয়ন্ত্রণ করিয়ে বাচ্চা নেওয়াই তাহলে কনজেনিটাল এনোমালি প্রতিরোধ করতে পারি। উচ্চ রক্তচাপও একই রকম। অনেকে উচ্চ রক্তচাপের বিষয়টি জানে না। আমরা তাকে উচ্চ রক্তচাপ কমিয়ে গর্ভাবস্থা নিতে বলতে পারি। আবার এমনও রয়েছে, যার উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, সে একটি ওষুধ খেতে চাইছে, সে ওষুধ গর্ভাবস্থার জন্য ঠিক নয়। ওটা খাওয়া অবস্থায় গর্ভধারণ করল, তারপর আমার কাছে এলো, আগেই যদি আমাদের কাছে আসে, তাহলে একটি পরামর্শ আমরা দিতে পারি। কিছু জটিল জটিল রোগের বেলায়ও আছে, থেলাসেমিক, ক্যারিয়ার হয়, সেগুলোও এড়ানো যায়।

প্রশ্ন : গর্ভবতী নারী আপনাদের কাছে এলে আপনারা কী দেখেন?  উত্তর : প্রথমেই যখন আসে, আমরা তাদের ইতিহাস নিই। খুবই গুরুত্বপূর্ণ এটি। বিশেষ করে তাদের আগের গর্ভাবস্থার ইতিহাসটা কী, সেটি জানি। আগের গর্ভাবস্থায় তার কোনো জটিলতা রয়েছে কি না, কোনো বাচ্চা তার নষ্ট হয়েছে কি না, আগের বাচ্চার প্রসবটা কেমন ছিল—এগুলো জানি। সেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এরপর তার ঋতুস্রাব চক্রের ইতিহাসটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কবে তার শেষ ঋতুস্রাব হয়েছে, এটি দিয়ে আমরা সন্তান জন্মের একটি দিন ঠিক করি। প্রথম ট্রাইমিস্টারে আসলে আমরা এই ইতিহাসটা খুব নিই। আমাদের দেশের মানুষ তো অত সচেতন নয়, বেশিরভাগ মানুষই বলতে পারে না। এতে আমরা তারিখ ঠিক করতে পারি না। এতে অনেক সমস্যা তৈরি হয়। কিছু পরীক্ষা করি আমরা তার। এতে বুঝতে পারি, তার রক্তস্বল্পতা রয়েছে কি না। অন্যান্য সমস্যা রয়েছে কি না। এ ছাড়া আমরা কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করি। তার ব্লাড গ্রুপিংটা কী? তার হিমোগ্লোবিনের অবস্থা কেমন? তার ডায়াবেটিস আছে কি না বা ডায়াবেটিস হওয়ার প্রবণতা রয়েছে কি না? এই পরীক্ষাগুলো আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো দেখা হয়। এরপর যদি সব তার স্বাভাবিক থাকে, তাকে আমরা নিয়মিত চেকআপে আসতে বলি। এর সঙ্গে আলট্রাসনোগ্রামও করা হয়।

প্রশ্ন : গর্ভাবস্থায় আল্ট্রাসোনোগ্রামের গুরুত্ব কতখানি?  উত্তর : এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা। প্রথম ট্রাইমিস্টারে যখন আসে, তখনই আমরা আল্ট্রাসোনোগ্রাম করি। এর সুবিধা হলো ডেটটা আমরা করতে পারি। দ্বিতীয় হলো গর্ভাবস্থাকে আমরা কনফার্ম করলাম। এর পরে আমরা ২২ থেকে ২০ সপ্তাহের মধ্যে একটি আল্ট্রাসোনোগ্রাম করি। একে আমরা বলি এনোমালি স্ক্যান। এটি করলে শিশুর সব দেখা যায়। মস্তিষ্কের বৃদ্ধি, হৃদপিণ্ড, ফুসফুস, আঙ্গুল সবকিছু আমরা দেখতে পারি। দেখতে পারি ডেপলপমেন্টাল কোনো এনোম্যালি তার রয়েছে কি না। শেষের দিতে ৩২ থেকে ৩৪ সপ্তাহে আমরা আল্ট্রাসোনোগ্রাম করি। এটি থেকে আমরা বাচ্চার বৃদ্ধিটা দেখতে পাই। তাই আল্ট্রাসোনোগ্রামের ভূমিকাতো অবশ্যই রয়েছে। এ ছাড়া যখন প্রয়োজন তখন আমরা করি। এ ছাড়াও অন্য প্রয়োজনে করা যায়।

প্রশ্ন : গর্ভাবস্থায় সাধারণত কী ধরনের সমস্যা হয়?  উত্তর : খুব প্রচলিত যে সমস্যাটি হয়, সেটি হলো রুচি চলে যায়। খেতে পারে না তারা। এরপর বমির সমস্যা হয়। কারো দিনে চার থেকে পাঁচবার বমি হচ্ছে, সেটা নেওয়া যায়। তবে কারো হয়তো ১০ থেকে ১২ বার বমি হচ্ছে, এরপরও যদি তারা চিকিৎসকের কাছে না আসে, তাহলে শকে চলে যেতে পারে। পাঁচ/ছয়বার হলে না এলেও চলে, তবে অতিরিক্ত বমি হলে, সঙ্গে সঙ্গে চলে আসবেন। অনেকের খুব বুক ধড়ফড় করে। বুক ধড়ফড় করা একটি নির্দিষ্ট মাপ পর্যন্ত স্বাভাবিক। গর্ভাবস্থায় এটা হবেই। এতে ভয়েরও কিছু নেই। রোগী এলে আমরা তাদের আশ্বস্ত করতে পারি। প্রথম তিন মাসে এটি হয়। তিন মাসের পরে মাঝে যেটি হয়, ওই সময় রোগীদের প্রেশার কমে যায়। যাকে আমরা বলি হাইপোটেনশন। এটাও গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিক। স্বাভাবিক একজন মানুষের রক্তচাপ কমে গেলে আমরা যেমন ভয় পাব, গর্ভাবস্থার মাঝামাঝি সময় এটা হলে ভয়ের কিছু নেই। গর্ভাবস্থার মাঝামাঝি সময় রোগীদের খুব দুর্বল লাগে। আবার যেটা বললাম বুক ধড়ফড় করা, এগুলো সব গর্ভাবস্থার সঙ্গে স্বাভাবিক লক্ষণ। আর শেষের দিকে মায়েরা যেই বিষয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে আসেন, বাচ্চা হওয়ার আগের মাসে রোগীরা যে সমস্যা নিয়ে আসে যে বাচ্চার নড়াচড়া কম মনে হচ্ছে। এটা তেমন ভয়ের কিছু না। আমরা বলি আপনারা গুনবেন। ১০ থেকে ১২ বার যদি নড়ে, ১২ ঘণ্টার মধ্যে, তাহলে ভয়ের কিছু নেই। এইগুলো নিয়ে রোগীরা খুব বেশি আমাদের কাছে আসে, তাদের ভয়ের কারণ নিয়ে। আমি বলব, কেবল সমস্যা হলে নয়, নিয়মিত একটি চেকআপে তারা আসবে। [১]

গর্ভবতী নারীরা যে ভুলগুলো করেন : গর্ভবতী প্রায় সব নারীই কয়েকটি সাধারণ ভুল করেন। এ ভুলগুলো এড়িয়ে চলতে পারলে স্বাস্থ্যকর গর্ভাবস্থা ধরে রাখা সম্ভব। জেনে নিন তেমনই কয়েকটি ভুল যা গর্ভবতী নারীদের হয়ে থাকে–১. গর্ভাবস্থায় বাড়তি যত্ন প্রয়োজন হয়। কোনো কোনো গর্ভবতী নারী গর্ভাবস্থাকে অসুস্থতা ধরে নিয়ে শুয়ে-বসে থাকেন। এটা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। গর্ভাবস্থায়ও শরীর সচল রাখার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এ কারণে স্বল্পমাত্রায় শারীরিক কার্যক্রম যেমন চালাতে হবে, একইসঙ্গে স্বাস্থ্যকর খাবারও খেতে হবে। এছাড়া কিছু খাবার ও ওষুধপত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ২. গর্ভাবস্থায় প্রয়োজনের তুলনায় কম খাবার খান এমন নারীর সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। অনেকে আবার প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবারও খান।
দুটোই গর্ভাবস্থায় ক্ষতিকর প্রভাব রাখে। অনেক নারীর ওজন মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যায়। এ কারণে নির্দিষ্ট মাত্রা অনুযায়ী খাবার খাওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ৩. গর্ভাবস্থায় সুস্থ থাকার জন্য প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় টিকা নিতে দেরি করা যাবে না। এটি সুস্থ সন্তান জন্মদানের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ৪. সুস্থ গর্ভধারণের জন্য কিছু ব্যায়াম রয়েছে। এগুলো পেটের মাংসপেশিকে স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে এবং সন্তান ধারণে উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে গর্ভাবস্থায় উপযোগী ব্যায়াম করতে হবে। ৫. অনেক গর্ভবর্ত নারী যেমন সঠিক মাত্রায় ভিটামিন ও সাপ্লিমেন্ট খেতে চান না তেমন অনেক নারী আবার অতিরিক্ত ভিটামিন ও সাপ্লিমেন্ট সেবন করেন। উভয় বিষয়ই ক্ষতিকর। এ কারণে চিকিৎসকের পরামর্শমতো সঠিক মাত্রায় ভিটামিন ও সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত। মনে রাখতে হবে, বাড়তি ডোজ যেমন ক্ষতিকর হতে পারে তেমন প্রয়োজনের তুলনায় কম ডোজও ক্ষতিকর হতে পারে। ৬. জিকা ভাইরাসে বর্তমানে সারা বিশ্বের বহু নারী আক্রান্ত হচ্ছেন। গর্ভবতী নারী এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে শিশুর মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। তাই সর্বদা সতর্ক থাকা উচিত যেন মশা না কামড়ায়। এ কারণে গর্ভাবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে ভ্রমণেও সতর্ক থাকা উচিত।  ডা. শামিমা নার্গিস নিলা, পরামর্শক, বাংলাদেশে স্পেশালাইজড হাসপাতাল।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>