অসাধারণ সব গুণে ভরপুর আঙুর!

নিজের দেহকে সুস্থ এবং নীরোগ রাখতে কে না চায়। আমরা প্রতিনিয়তই চেষ্টা করি সুস্থ-সুন্দন জীবন যাপনের। আর সুস্থ থাকতে আমরা প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা চালাই। ডাক্তারের কাছে যাওয়া, ওষুধ খাওয়া কিংবা প্রকৃতির মাঝ থেকেই খুঁজে বের করার চেষ্টা করি দেহকে সুস্থ রাখার মূলমন্ত্র। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, প্রকৃতিতে অনেক কিছুই আছে যা আমাদের দেহকে নীরোগ এবং সুস্থ রাখতে বেশ কার্যকরী। ‘আঙুর’ এবং ’কিসমিস’ এমনই একটি প্রাকৃতিক উপাদান। যা আপনাকে সুস্থ-সবল জীবন যাপনে সহায়তা করবে। আঙুর বিদেশি ফল হলেও এখন তা অনেকটা দেশি ফলের মতোই পরিচিত হয়ে গেছে। প্রতিদিন মাত্র আধাকাপ পরিমাণে আঙুর দূর করার ক্ষমতা রাখে নানা শারীরিক সমস্যা। আসুন জেনে নেই আঙুরের স্বাস্থ্য গুনাগুন সম্পর্কে-

১. আঙুরের ফাইটোকেমিক্যাল হৃদপিণ্ডের পেশির ক্ষতি নিজ থেকেই পূরণে বিশেষভাবে সহায়তা করে থাকে। প্রতিদিন আঙুর খেলে হৃদপিণ্ডের সুস্থতা এবং দেহের কলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।  ২. রক্তশূন্যতার কারণে অবসাদ, শারীরিক দুর্বলতা, বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যতে পারে, এমনকি বিষণ্ণতাও দেখা দিতে পারে। কিশমিশে আছে, প্রচুর পরিমাণে লৌহ উপাদান, যা রক্তশূন্যতা দূর করতে সাহায্য করে।  ৩. আঙুরের আয়রন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় মিনারেল রক্তের হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে।  ৪. অ্যামেরিকান সোসাইটি অফ বোন অ্যান্ড মিনারেলস রিসার্চের মতে আঙুর মাইক্রো নিউট্রিইয়েন্টস যেমন, ক্যালসিয়াম, আয়রন এবং ম্যাংগানিজে ভরপুর একটি ফল যা হাড়ের গঠন এবং মজবুত হওয়ার জন্য অত্যন্ত জরুরী।  ৫. অর্গানিক এসিড, চিনি এবং সেলুসাস যা লেক্সাটিভের উপাদান কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে বিশেষভাবে কার্যকরী যা আঙুরের মধ্যে বিদ্যমান। এছাড়াও আঙুরে প্রচুর পরিমাণে ইনস্যলুবেল ফাইবার রয়েছে যা আমাদের পরিপাকনালী পরিষ্কার রাখে।  ৬. আঙুরের ইউরিক এসিডের এসিডিটি কমিয়ে দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে। এটি আমাদের পরিপাকতন্ত্র থেকে এসিডের মাত্রা কমিয়ে দেয় এবং কিডনির ওপর চাপ কমায়। এছাড়া কিডনির যেকোনো সমস্যা থেকে আমাদের মুক্ত রাখে।  ৭. আঙুর রক্তের নাইট্রিক অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধি করে যা রক্তনালীর প্রতিবন্ধক দূর করতে সাহায্য করে। এতে করে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা প্রায় ৬০% কমে যায়। এছাড়া অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর আঙুর দেহের কলেস্টোরল শুষে নেয়ার ক্ষমতা রাখে। মিশিগান ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণা থেকে জানা গেছে, কালো আঙুর খেলে হৃদপিণ্ডে রক্ত চলাচল ভাল হয়। এর ফাইটোকেমিক্যাল হার্টের পেশীকে সুস্থ রাখে। পাশাপাশি কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতেও সাহায্য করে।  ৮. রক্তস্বল্পতা বা রক্তে হিমোগ্লোবিনের স্বল্পতা আমাদের দেশে খুব সাধারণ একটি ব্যাপার। রক্তসল্পতার কারণে দুর্বলতা, অল্পতেই হাপিয়ে উঠার প্রবণতা দেখা দেয়। এই সমস্যার সমাধান করে আঙুর। আবার তাৎক্ষনিক দুর্বতা কাটাতে আঙুর বেশ কার্যকরী। এতে রয়েছে চিনি, গ্লুকোজ এবং ফ্রুক্টোজ, যা তাৎক্ষণিকভাবে দেহে অ্যানার্জি সরবরাহ করে। আঙুরের আয়রন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় মিনারেল রক্তের হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে। সুতরাং প্রতিদিন আঙুর খাওয়ার অভ্যাস করুন।  ৯. দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত থাকলে দেহে কোনো রোগ বাসা বাধতে পারে না। আঙুরে রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফ্লেভানয়েড, মিনারেল, ভিটামিন সি, কে এবং এ। এইসবই আমাদের দেহের ইমিউন সিস্টেম অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত করতে সহায়তা করে। তাই প্রতিদিন নাগুর খাবার অভ্যাস করুন। মেডিসিনাল ফুড নামক জার্নালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায় যে, এক গ্লাস লাল আঙুরের জুস মধ্যবয়সি মানুষের ইমিউনিটির উন্নতিতে সাহায্য করে। আঙুরের জুস পান করলে ভিটামিন সি এর মাত্রা বৃদ্ধি পায়।  ১০. সম্প্রতি একটি গবেষণায় দেখা যায় আঙুরের স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ করার ক্ষমতা রয়েছে। আঙুরের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট দেহে ক্যান্সারের কোষ তৈরি হতে বাধা প্রদান করে এবং ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। আঙুরে আরো রয়েছে ক্যাটেচিন, যা পলিফেনলিক অ্যাসিড। এটি দেহকে ক্যান্সার মুক্ত রাখতে সাহায্য করে। আঙুরের পাতলা খোসায় রেসভেরাট্রোল নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদানের দেখা মেলে। গবেষণায় দেখা যায় এই রেসভেরাট্রোল অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট দেহে ক্যান্সারের কোষ গঠন করতে বাঁধা প্রদান করে থাকে।  ১১. অর্গানিক অ্যাসিড, চিনি এবং সেলুসাস যা লেক্সাটিভের উপাদান কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে বিশেষভাবে কার্যকরী যা আঙুরের মধ্যে বিদ্যমান। এছাড়াও আঙুরে প্রচুর পরিমাণে ইনস্যলুবেল ফাইবার রয়েছে যা আমাদের পরিপাকনালী পরিষ্কার রাখে। তাই চিকিৎসকরা কোষ্ঠকাঠিন্যের রোগীদের নিয়মিত আঙুর খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কোলিন, বেটা কেরটিন, আঁশ থাকার কারণে এটি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে। এ ছাড়া আঙুর ফল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। আঙুর খেলে ওজন কমে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যারা মাইগ্রেনে ভুগছে, তারা আঙুর খেলে ব্যথা অনেকটা কমে। তাই আমরা প্রতিদিন খাবার তালিকায় এটি রাখতে পারি।  ১২. বাচ্চাদের আঙুর খাওয়ার অভ্যাস করালে দাঁতের সুরক্ষা হবে। আবার একই স্বাদ পাওয়ার সাথে সাথে বিপুল পরিমাণ উপকারও পাবে। চিনি থাকার পাশাপাশি আঙুরে রয়েছে ওলিনোলিক অ্যাসিড, যা মুখের ভেতরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে বাঁধা দেয়।  ১৩. কিসমিসের মধ্যে রয়েছে পলিফেনলস এবং অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিইনফেমেটরী উপাদান, যা কাঁটা-ছেড়া বা ক্ষত হতে ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা দূরে রাখে।

কালো আঙুরের গুণ!  ইউরোপে ছয়-সাত হাজার বছর আগে প্রথম কালো আঙুরের চাষ শুরু হয়। এমনটাই বলা হয়েছে ইতিহাসে। বাংলাদেশ ও এর পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে সবুজ আঙুরের চেয়ে কালো আঙুরের জনপ্রিয়তা তুলনামূলক কম। তবে পুষ্টিবিদরা জানাচ্ছেন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর কালো আঙুর খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ভাল। শুধু হার্ট বা ত্বকই নয়, দৃষ্টিশক্তি থেকে শুরু করে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ এমনই বেশ কিছু শারীরিক সমস্যায় দারুণ কাজ দেয় এই আঙুর। জেনে নিন কালো আঙুরের কিছু গুণ।

১. মস্তিস্কের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে কালো আঙুর। স্মৃতিশক্তি বাড়ায়, মাইগ্রেন, অ্যালঝাইমার্সের মতো রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা রয়েছে কালো আঙুরের। ২. কালো আঙুরে থাকে লুটেন এবং জিয়াজ্যানথিন, যা আমাদের দৃষ্টিশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে। ৩. ভিটামিন সি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর কালো আঙুর ত্বকে রক্ত সঞ্চালন উন্নত করে। এর ফলে বলিরেখা, কালো ছোপ, শুষ্ক ত্বকের বিভিন্ন সমস্যায় কালো আঙুর খুবই উপকারী। ৪. কালো আঙুরে রয়েছে ভিটামিন সি, কে এবং এ যা দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এ ছাড়াও এই আঙুরের ফ্ল্যাবনয়েডস, খনিজ, অর্গ্যানিক অ্যাসিড কোষ্ঠ্যকাঠিন্য এবং হজমের সমস্যা ও কিডনির বিভিন্ন সমস্যায় ভালো কাজ দেয়। ৫. ইনসুলিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে কালো আঙুর।

কোলেস্টেরল ও মাইগ্রেনের ব্যথা কমায় আঙুর  আঙুরের প্রায় ৭৯ ভাগই হলো পানি। এ ছাড়া এটি ফ্রুকটোজ ও ভিটামিন মিনারেলসে ভরপুর একটি ফল। ভিটামিনের মধ্যে রয়েছে এ, বি, সি কে। আঙুরে প্রদাহরোধী উপাদান থাকার কারণে এটি রক্তের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করে, হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। এ ছাড়া আঙুরে ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট থাকার কারণে এটি বার্ধক্য রোধে সাহায্য করে। আঙুরে পলিফেনল থাকার কারণে এটি মেটাবলিক রেটকে প্রশমিত করে এবং খাবার হজমে সাহায্য করে। আঙুরে ফসফরাস, ভিটামিন এ, বেটা কেরোটিন ইত্যাদি থাকার কারণে এটি ত্বককে সুরক্ষা দেয়। এ ছাড়া আঙুরে কলিন, বিটা কেরোটিন থাকার কারণে এটি কোষের ক্ষতি প্রতিরোধেও কাজ করে। আঙুরে যেহেতু পানির পরিমাণ বেশি থাকে, তাই পানিস্বল্পতা দূর করতে আঙুর সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>