হাঁপানিকে আর ভয় নয়, হাঁপানিকে করুন জয় !

আজকাল আশপাশে শিশু-বড় অনেককেই আমরা হাঁপানি বা অ্যাজমাতে আক্রান্ত হতে শুনি। দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে ৭ শতাংশ শিশু ও ৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি হাঁপানিতে আক্রান্ত। অনেকের ধারণা, হাঁপানি বংশগত বলে এটা কখনো ভালো হবে না। আবার অনেকের ধারণা, প্রচলিত চিকিৎসায় সম্পূর্ণ ভালো থাকা সম্ভব নয়। তাই তারা কবিরাজি চিকিৎসার দিকে ঝোঁকেন। আসলে হাঁপানির সঙ্গে লড়তে হলে নিজের রোগটাকে ভালো করে চিনতে হবে, বুঝতে হবে। কেননা এর চিকিৎসার একটা বড় অংশে রোগী নিজেই ভূমিকা পালন করে থাকেন।

হাঁপানি কেবল বংশগত নয়  এ কথা ঠিক যে অ্যালার্জির ইতিহাস আছে এমন পরিবারের সদস্যদের হাঁপানিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। কিন্তু এ রোগের পেছনে আরও অনেক কিছুই দায়ী, যদিও নির্দিষ্ট কোনো একটি কারণ কখনোই খুঁজে পাওয়া যায়নি। যেমন রেসপিরেটরি সিনশাইটিয়াল ভাইরাসের আক্রমণ বেশি হলে শিশুরা ব্যাপকভাবে এতে আক্রান্ত হয়। এ ছাড়া নানা অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী পদার্থ প্রক্রিয়াটিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যায়। যেমন বাড়ির তোষক, বিছানা, পর্দা বা কার্পেটে বিচরণকারী ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণী, কর্মক্ষেত্রে উড়তে থাকা ক্ষতিকর ধুলো, কারো কারো ক্ষেত্রে ফুলের রেণু বা পশুপাখির লোম বা মলমূত্র। গ্রাম এলাকায় লাকড়ি পুড়িয়ে তৈরি হয় ধোঁয়া, যার কারণে অনেকে হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিসে আক্রান্ত হয়। বাইরের ধুলাবালি শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করে প্রতিক্রিয়া ও প্রদাহ বাড়িয়ে দিলেও কারণ হিসেবে খুব একটা ভূমিকা রাখে না। তারপরও ধুলাবালি, শুষ্ক আবহাওয়ায় হাঁপানি রোগীর কষ্ট বেড়ে যায়।

হাঁপানি রোধ করা সম্ভব  অবাক হলেও সত্যি, শিশুর হাঁপানি প্রতিরোধ করতে আসল ভূমিকা রাখবে মাতৃদুগ্ধ। যেসব শিশু ৬ মাস অবধি কেবল মায়ের দুধ পান করেছে তাদের অ্যালার্জি ও হাঁপানির প্রকোপ অন্যদের তুলনায় কম। এক বছর বয়সের পর ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা এবং ১ থেকে ৬ বছরের মধ্যে নিউমোনিয়ার টিকা দিয়ে নেওয়া ভালো। অনেক হাঁপানি রোগী গরুর মাংস, বেগুন, চিংড়ি ইত্যাদি খাওয়া ছেড়ে দেন। কোনো খাবারে অ্যালার্জি থাকলে কেবল ওই খাবারটিই এড়িয়ে চলতে হবে। ঢালাওভাবে খাবার বাদ দেওয়ার দরকার নেই। ধুলাবালি ও ধোঁয়া থেকে দূরে থাকা উচিত। ধূমপান অবশ্যই বর্জনীয়। শিশুদের সামনে ধূমপান করা রীতিমতো অপরাধ বলে বিবেচিত হওয়া উচিত। কিছু ওষুধপত্র হাঁপানির প্রকোপ বাড়িয়ে দেয়, সে বিষয়ে ওয়াকিবহাল থাকা চাই। শীতাতপনিয়ন্ত্রকে থাকা ক্ষতিকর নয়। কিন্তু এসির ফিল্টারে জমে থাকা ধুলা ঘন ঘন পরিষ্কার করে নেওয়া ভালো। আর এসি খুব চিলড বা কনকনে ঠান্ডা না করে ঘরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখা উচিত। হাঁপানি থাকলে কার্পেট ও পোষা প্রাণী থেকে দূরে থাকাই ভালো।

হাঁপানির বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা নিন  শিশুদের হাঁপানি খুব ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে ১৩-১৪ বছরের আগে প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ সেরে যেতে পারে। বড়দেরও দীর্ঘদিনের হাঁপানির বেশ কিছু ভালো হয়ে যায়। দু ধরনের চিকিৎসা আছে হাঁপানির। উপশমকারী ও প্রতিরোধকারী। প্রতিরোধের মূল উপায় হলো অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী পদার্থগুলোকে এড়িয়ে চলা, নিয়মিত কিছু ওষুধ ব্যবহার। আর হঠাৎ হাঁপানির মাত্রা বেড়ে গেলে উপশমকারী ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে।

হাঁপানি কমাতে ফলমূল যাদের অ্যালার্জি, হাঁপানি বা একজিমা-জাতীয় রোগ আছে, তাদের প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে অনেকটাই সাহায্য করবে তাজা ফলমূল ও শাকসবজি। শীতের এই সময়ে আবহাওয়ার পরিবর্তন ও পরিবেশের ধুলাবালু হাঁপানি ও অ্যালার্জির প্রকোপ দেয় বাড়িয়ে। আবার এই সময়ে বাজারে ওঠে অনেক শাকসবজি। রোগের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গবেষকেরা এসব তাজা শাকসবজি বেশি করে খেতে উৎসাহ দিচ্ছেন। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ফলমূল ও শাকসবজির অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট গুণাগুণ হাঁপানি প্রতিরোধে কার্যকর। অ্যালার্জি ও হাঁপানির রোগীদের রক্তে কিছু অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যেমন: লাইকোপিন, জ্যানথিন, বিটা ও আলফা কেরোটিন ইত্যাদি কম। আর এগুলো প্রচুর পরিমাণে মিলবে এ সময়ের টমেটো, গাজর, কমলা, মালটা ইত্যাদিতে। আর যারা নিয়মিত এগুলো গ্রহণ করে, তাদের হাঁপানির তীব্রতা কমে—এটা পরীক্ষিত সত্য। আর এ সুফল পেতে দিনে অন্তত পাঁচ পদের ফলমূল ও সবজি খাওয়া চাই।

শ্বাসকষ্ট মানেই হাঁপানি নয় শ্বাসকষ্ট বা শ্বাস টানা রোগীমাত্রই হাঁপানিতে আক্রান্ত, তা নয়। শ্বাসকষ্টের একটি বড় কারণ ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সংক্ষেপে সিওপিডি। এটি ফুসফুসের একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ। এতে আক্রান্ত হলে শ্বাসনালির দেয়াল পুরু হয়ে যায় এবং ভেতরে প্রচুর শ্লেষ্মা জমে। ফলে শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসের ভেতর ঠিকমতো বাতাস ঢুকতে পারে না। ফুসফুসের ভেতরকার ক্ষুদ্র বায়ুথলিতে বাতাস আটকে থাকে। এতে শ্বাসকষ্ট ছাড়াও রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা ধীরে ধীরে কমতে থাকে, কার্বন ডাই-অক্সাইড বা বিষাক্ত গ্যাসের মাত্রা বেড়ে যায়। ধীরে ধীরে রোগী মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। অনেক সময় এই রোগকে ক্রনিক ব্রংকাইটিসও বলা হয়। কীভাবে বুঝবেন আপনার এই রোগ হয়েছে? দীর্ঘস্থায়ী কাশি, শ্বাসকষ্ট, কাশির সঙ্গে শ্লেষ্মা এই রোগের লক্ষণ। বছরে বেশ কয়েকবার এ রকম তীব্র কাশি ও শ্বাসকষ্টের আক্রমণ হতে পারে। বেশির ভাগ রোগীর বয়স ৪০ বছর বা তার কাছাকাছি। ধূমপায়ীদের এই রোগ হয় বেশি। তবে কারখানার নির্গত ধোঁয়া বা রান্নার চুলার ধোঁয়া থেকেও এ সমস্যা হতে পারে। ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ ফুসফুসের একটি মারাত্মক রোগ। এ থেকে রোগীর ওজন হ্রাস, হার্ট ফেইলিউর, রেসপিরেটরি ফেইলিউর, এমনকি মৃত্যু হতে পারে। কিন্তু এই রোগ প্রতিরোধযোগ্য। এ থেকে বাঁচতে:  ১ ধূমপান চিরতরে ত্যাগ করুন  ২ পুষ্টিকর সবুজ শাকসবজি ও ফলমূল খান  ৩ নিয়মিত ব্যায়াম করুন  ৪ শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম শিখে নিন

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>