বয়স লুকাতে চান? জেনে নিন কি করবেন!

আয়নার সামনে নিজেকে দেখতে ভালো লাগে। হঠাৎ যদি দেখতে পান, কপালে কয়েকটি সরু ভাঁজ, চোখের কোণে বলিরেখা, মন খারাপ হয়ে যাবে? হতেই পারে। বয়সের ছাপ পড়তে শুরু করলে এমন হয়। আবার কারও কারও বয়স বোঝা যায় না। কীভাবে পারেন তাঁরা চেহারায় তারুণ্য ধরে রাখতে? বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মন ফুরফুরে, দুশ্চিন্তামুক্ত রাখা, পর্যাপ্ত ঘুম হলো নিজেকে তরুণ রাখার গোপন রহস্য। মন যত প্রফুল্ল থাকবে, বয়সের ছাপ তত দেরিতে পড়বে। রূপবিশেষজ্ঞ রাহিমা সুলতানা বলেন, একটা সময়ের পর কমবেশি সবারই ত্বকে বয়সের ছাপ পড়তে শুরু করে। মানসিক চাপ বা শারীরিক কোনো সমস্যা থাকলে অনেকের ২৫ বছর বয়সের পরপরই বলিরেখা দেখা যায়। নিয়মিত যত্নের মাধ্যমে এগুলো দূর করা সম্ভব। সাধারণত অতিরিক্ত মানসিক চাপ, সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকে সরাসরি লাগলে, অতিরিক্ত রাগ ও ঘুমের সমস্যা হলে মধ্যবয়সের আগেই বলিরেখা, ত্বকে ভাঁজ পড়ে। এ জন্য প্রতিদিনের অভ্যাস, এমনকি খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আনতে হবে। হাসিখুশি থাকতে হবে সব সময়। ত্বকেও এর প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি অ্যান্টি অক্সিডেন্টযুক্ত খাবার খেতে হবে। শাকসবজি, ফলমূল, বিশেষ করে গাজর, মিষ্টিকুমড়া, টমেটো ও ভিটামিন ‘সি’-যুক্ত সব খাবার থাকা চাই খাবারের তালিকায়। এতে করে ত্বক পাবে প্রয়োজনীয় পুষ্টি। নিয়মিত ব্যায়াম, প্রাণায়াম ও যোগাসন মানুষের মন ও শরীরকে তরুণ রাখে। ঘরে বসে সঠিক পদ্ধতিতে বজ্রাসন, ধনু আসন করতে পারেন। এর ফলে শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকবে। রক্ত সঞ্চালন সঠিকভাবে হবে।

ত্বককে বাঁচাতে হবে রোদ থেকে। বাইরে যাওয়ার আগে অবশ্যই ভালোভাবে সানস্ক্রিন লোশন বা ক্রিম ব্যবহার করুন। চোখে বলিরেখা ও ডার্ক সার্কেল বেশির ভাগ সময় রোদের কারণে হয়। অতিরিক্ত শুষ্ক ত্বকে দ্রুত বলিরেখা পড়ে। তৈলাক্ত, শুষ্ক বা মিশ্র—সব ধরনের ত্বকেই ভালোভাবে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা উচিত। অয়েল ফ্রি ময়েশ্চারাইজার তৈলাক্ত ত্বকের উপযোগী। তৈলাক্ত ত্বকে ব্রণ বেশি হলেও একটু দেরিতে বয়সের ছাপ পড়ে। আর যদি নিয়মিত যত্ন নেওয়া যায়, তাহলে তো কথাই নেই। বয়স আপনার কাছে হার মানতে বাধ্য। এ ছাড়া ভালো মানের অ্যান্টি রিঙ্কেল বা ত্বকে ইলাস্টিন, কোলাজেন ঠিক রাখে—এ ধরনের নাইট ক্রিম ব্যবহার করা যেতে পারে। চেহারায় আর চালচলনে তারুণ্য ধরে রাখতে কে না চায়? ৩০-৪০ বছরের পর থেকে তারুণ্যের ভাব যেন কিছুটা কমে যেতে শুরু করে। প্রতিদিনের ছোট ছোট কিছু বদঅভ্যাস এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করে। একটু সচেতনতা আর ভালো কিছু অভ্যাস বা চর্চা চেহারায় সতেজ ভাব ধরে রাখতে পারে। দেখা যাক, তারুণ্য কীভাবে ধরে রাখা যায়।

নেতিবাচক অভ্যাস  নিয়মিত মদ পানে চেহারায় এর বিরূপ প্রভাব পড়ে। এতে রক্তনালি দৃঢ়তা হারায়। চেহারায় স্থায়ী রেখা পড়তে পারে। ত্বক শুষ্ক ও ফ্যাকাশে হয়ে যায়, গভীরভাবে বলিরেখা দেখা দেয়। একই কথা ধূমপানের বেলায়ও খাটে। অতিরিক্ত ধূমপানের কারণে চেহারায় তাড়াতাড়ি বুড়োটে ভাব চলে আসে।  অপর্যাপ্ত ঘুম  ২৪ ঘণ্টায় ৮ ঘণ্টা ঘুম খুব প্রয়োজন। শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থতা অনেকটাই নির্ভর করে এই ৮ ঘণ্টার ঘুমের ওপর। ভালো ঘুমে ত্বকও ভালো থাকে। চেহারায় ক্লান্তির ছাপ কমে যায়। চোখের নিচে কালো ছোপ না থাকলে চেহারা অনেকটাই উজ্জ্বল দেখায়। দিনের সময়টায় আমাদের ত্বক যুদ্ধ করতে থাকে রোদ, দূষণ আর ময়লা থেকে। ঘুম খুব দরকার এই কারণ যে স্ট্রেস হরমোন সাধারণ লেভেলে নেমে আসে। ঘুম ত্বকের কোষগুলোকে দিনের ক্ষতি রাতে পূরণ করে নেওয়ার সুযোগ দেয়।  সূর্যের তাপ  গরমের সময়ে রোদের কড়া তাপ ত্বকের বেশ ক্ষতি করে। এই ঘটনা কিন্তু বৃষ্টি ও শীতের দিনগুলোতেও ঘটতে থাকে। সূর্যের ক্ষতিকারক রশ্মি কাচের জানালা গলেও আপনার ত্বকের ক্ষতি করতে পারে। এ কারণেই ঘর থেকে বের হওয়ার সময় অবশ্যই সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন।  খাদ্যাভ্যাস  ৩০ বছরের পর ক্রাশ ডায়েট খারাপ প্রভাব ফেলে ত্বকের ওপর। চেহারা হঠাৎ করে শুকিয়ে গেলে কিছুটা রোগাটে ভাব চলে আসে ঠিকই, কিন্তু চোখের চারপাশটাও কুঁচকে যায়।  চিনির তিতা প্রভাব  খাবারে চিনির পরিমাণ বেশি থাকলে ত্বকেরও ক্ষতি হয়। রুটি, চাল, আলু গ্লাইকেশন বিক্রিয়া ঘটায় ত্বকে। এতে ত্বকের দৃঢ়তা ও নমনীয়তা কমে যায়।  ব্যায়াম না করা  ব্যায়াম সব বয়সের জন্যই প্রয়োজন। ব্যায়াম রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে উন্নত করে। ফলাফল ত্বকে তারুণ্যের প্রকাশ পায়।  ব্রণ খোঁটা  ব্রণ খোঁটার বদঅভ্যাস অনেকেরই আছে। অজান্তেই মুখের এখানে-সেখানে ব্রণের ওপর হাত চলে যায়। এতে ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়। অস্বস্তিও বোধ হয়। মুখমণ্ডলের ত্বক স্পর্শকাতর বলে ব্রণ খুঁটলে সংক্রমণ ঘটতে পারে। আর দাগ পড়ে যাওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। মেকআপ নিয়ে ঘুমানো  সারা দিনের ধুলোবালি ও দূষণের ভার নিতে হয় ত্বককে। রাতের বেলায় বেচারা ত্বক কিছুটা বিশ্রাম নেয়। এ কারণেই রাতে ঘুমানোর আগে ভালো করে চেহারা পরিষ্কার করতে হবে। এ নিয়মটা কিছুটা বাধ্যতামূলকই।  অনেক উপাদান ব্যবহার  ত্বকে সবসময় মানানসই উপাদান ব্যবহার করা উচিত। সেটা হতে হবে ভালো মানের। কিন্তু একই সময় অনেক উপাদান ব্যবহারে ত্বকের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। এখানে শুধু মেকআপের কথাই বলা হচ্ছে না। অনেকে ক্রিমের সঙ্গেও হয়তো বাড়তি আরও দু-তিনটা উপাদান ব্যবহার করেন। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ত্বক কিন্তু কিছুটা বিরক্তও হয়। অতিরিক্ত উপাদান ব্যবহারে ত্বক বুড়িয়ে যায় তাড়াতাড়ি।

তারুণ্য ধরে রাখার কিছু টিপস
১. বয়স ত্রিশের কোঠা পেরোলে প্রতিদিনের খাবার তালিকা থেকে কমিয়ে দিন কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ৷ এর পরিবর্তে খাবারের প্লেটে যোগ করুন প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার৷ বিশেষ করে নারীদের জন্য এটা খুব প্রয়োজন। কারণ, নারীদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে হাড়ের ক্ষয়। প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার হাড়ের এই ক্ষয় পূরণে বিশেষ সহায়তা করে। ২. বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই খাবার তালিকা থেকে মাংস, ডিম বাদ দিয়ে দেন। এ ধরনের খাবার প্রোটিনের ভালো উৎস। তাই মাংস, ডিম বাদ না দিয়ে পরিমিত পরিমাণে খেতে হবে। ৩. ভারী খাবার খেতে হবে তিন ঘণ্টা পরপর। ৪. প্রতিদিনের খাবার খাওয়ার সময়টা পাঁচ ভাগে ভাগ করে নিন। এ ক্ষেত্রে সকাল ও দুপুরের খাবার ভারী হতে হবে। ৫. বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমে আসে হজমপ্রক্রিয়ার গতি। এ জন্য রাতের খাবার একটু আগেভাগে শেষ করতে হবে। এরপর হালকা কিছু ঘরের কাজ করা যেতে পারে, যা খাবার দ্রুত হজম করতে সহায়তা করবে। ৬. চেহারায় তারুণ্য ধরে রাখতে ফাস্ট ফুড থেকে দূরে থাকুন৷ বরং কাজের ফাঁকে খেতে পারেন একমুঠো বাদাম, কিশমিশ বা খেজুর। ৭. স্নায়বিক দুর্বলতা কাটানোর পাশাপাশি ত্বকের উজ্জ্বলতা, স্মৃতিশক্তি ও মানসিক প্রশান্তি বাড়াতে ব্রিদিং এক্সারসাইজ বেশ উপকারী। এ জন্য খোলামেলা স্থানে হাত দুটো প্রসারিত করে চোখ বন্ধ করে ১ থেকে ৫ গুনতে গুনতে নাক দিয়ে বুকভরে শ্বাস নিন। তারপর ধীরে ধীরে ১ থেকে ১০ গুনতে গুনতে শ্বাস ছাড়ুন। সপ্তাহে পাঁচ দিন ৮ থেকে ১০ বার এই অনুশীলন করতে পারেন। ৮. শরীরের রক্ত সঞ্চালনের জন্য নিয়মিত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট হাঁটা বেশ জরুরি। ৯. বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে নানা ধরনের ব্যথার সৃষ্টি হয়৷ এসব ব্যথা দূর করতে এবং ফিট থাকতে নিয়মিত সাঁতার কাটাও দারুণ কাজের।

রূপ সচেতনতা: বাইরের লেবাসে তারুণ্য আনার আগে মনটাকেও তো প্রফুল্ল রাখতে হবে। রোজ এক ঘণ্টা হাঁটা, নিয়ম মেনে শরীরচর্চা, যোগব্যায়াম ও মেডিটেশন করলে মন হালকা লাগবে। মন ভালো থাকলে চেহারায় ক্লান্তির ছাপ দূর হয়ে ভেতরের সৌন্দর্য ফুটে উঠবে। ত্বকের যত্নে কয়েকটি ফেস প্যাকের প্রণালি দিয়েছেন রাহিমা সুলতানা— ১. একটি কলা, একটি ফেটানো ডিম, ১ চা-চামচ মধু, ১ চা-চামচ লেবুর রস ও ১ চা-চামচ গ্রিন টি পাউডার মিশিয়ে ১৫ মিনিট মুখে লাগিয়ে রেখে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। ২. ১ চামচ আমলকী বাটা, আধা চামচ ধনে গুঁড়া, ১ চামচ নিম পাতা বাটা, আধা চামচ চন্দন গুঁড়া ও ২ চামচ গোলাপজলের মিশ্রণ প্রস্তুত করে তা মুখে লাগিয়ে রেখে ধুয়ে ফেলুন। এটিও ১৫ মিনিট রাখতে হবে। ৩. কাঁচা হলুদ বাটা ও আঙুরের রস ১ চামচ ও টমেটোর রস ২ চামচ মুখে লাগিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। ৪. পাকা পেঁপের রস, গুঁড়া দুধ ও গোলাপজল এক চা-চামচ। চন্দন গুঁড়া আধা চা-চামচ ও আলুর রস দুই চামচ একসঙ্গে মিশিয়ে মুখে ২০ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>