রক্তস্বল্পতা হয় কেন এবং এর চিকিৎসা কী?

রক্তস্বল্পতা শরীরকে দুর্বল, ক্লান্ত করে দেয়। এ ছাড়া শরীরের আরো অনেক জটিলতা হয়। তাই রক্তস্বল্পতা হলে দ্রুত চিকিৎসা করা প্রয়োজন। রক্তস্বল্পতা বিভিন্ন কারণে হয়ে থাকে। রক্তস্বল্পতার চিকিৎসা সময়মতো না হলে এটি জীবনঘাতীও হতে পারে। রক্তস্বল্পতা কেন হয়,রক্তস্বল্পতার কারণে কী ক্ষতি এবং এর চিকিৎসা বিষয়ে কথা বলেছেন ডা. মুনিম আহমেদ। বর্তমানে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেমাটোলজি বিভাগের রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত।

সাধারণত আমাদের শরীরে হিমোগ্লোবিনের মাত্রাটা পুরুষের ক্ষেত্রে ১৪ থেকে ১৬। নারীদের ক্ষেত্রে ১২ থেকে ১৬। এই পরিমাণে থাকে। এই পরিমাণ থেকে কম হলে একে আমরা এনিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা বলি। রক্তস্বল্পতা আসলে অনেকগুলো কারণের ওপর নির্ভর করে। এক, রক্ত তৈরির যে উপাদানগুলো প্রয়োজন, সেগুলোর যদি কোনো কারণে ঘাটতি ঘটে, সে ক্ষেত্রে তার রক্তস্বল্পতা হবে। দুই, উপাদান ঠিক রয়েছে, ঘাটতি নেই। তবে তার হয়তো কোনো একটা গুরুতর দুর্ঘটনায় রক্তপাত হয়ে গেল। শরীর থেকে রক্ত বের হয়ে গেল অনেক পরিমাণে, যেটা উৎপাদন করে পূরণ করতে সময়ের প্রয়োজন। তখন তার রক্তস্বল্পতা হবে। আর তিন, খাবারের রক্ত উপাদানের ঘাটতি নেই, প্রক্রিয়াও ঠিক রয়েছে, কিন্তু তার অস্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ জেনেটিক কোনো বিষয়ের কারণে তার হিমোগ্লোবিনটা ত্রুটি পূর্ণ। সে ক্ষেত্রে তার হিমোগ্লোবিন শরীরের মধ্যে দ্রুত ভেঙে যায়। আমরা জানি, আমাদের লাল লোহিত রক্ত কণিকা ১২০ দিন বাঁচে। কোনো কারণে ১২০ দিনের পরিবর্তে যদি এটা ৩০ দিন/ ৪০ দিন নেমে আসে, সে ক্ষেত্রে টার্নওভার অনেক দ্রুত হয়। এই দ্রুত বদলানোটা একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর শরীর আর নিতে পারে না। এতে রক্ত শূন্যতা দেখা দেয়। শিশুদের ক্ষেত্রে যেটি বেশি হয়, সেটি হলো উপাদান ঘাটতিজনিত সমস্যা। শিশুদের খাবারের মধ্যে আয়রনের প্রয়োজন। এটি প্রয়োজন রক্ত তৈরিতে। ভিটামিন বি১২-এর খুব প্রয়োজন। ফলিক এসিডের খুব প্রয়োজন। এগুলো যদি ঘাটতিগত ত্রুটি দেখা দেয়, তাহলে ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা খুব বেশি দেখা দেয়।

আমাদের বাংলাদেশে সবারই একটি বদ অভ্যাস, আমরা বেশি গ্যাসট্রিকের ওষুধ খাই। গ্যাসট্রিকের সমস্যা হলেও খাই, না হলেও খাই। আয়রন শোষণ করতে গেলে এসিড লাগবেই। আমি যখন এই গ্যাসট্রিকের ওষুধগুলো খাচ্ছি, তখন এই এসিড কমে যাচ্ছে। এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছে। আয়রন কিন্তু আমার শোষণ হচ্ছে না। আমার কিন্তু রক্তশূন্যতা দেখা দিচ্ছে। তাহলে যে রোগীরা নিয়মিত গ্যাসট্রিকের ওষুধ খাচ্ছে, তাদের এগুলো দেখা দেবে। পাশাপাশি আমরা কথা কথায় মুড়ি-মুড়কির মতো অ্যান্টাসিড খেয়ে ফেলি। এটিও আয়রন শোষণে বাধা দেয়। আমরা একটু কোমরে ব্যথা, পিঠে ব্যথা, কথায় কথায় ব্যথার ওষুধ খেতে থাকি। ব্যথার ওষুধ খেলে পাকস্থলীর ভেতর ঘা তৈরি হয়। সেখান থেকে রক্ত যায়। এটি ক্ষুদ্রান্ত্রেও কিছুটা সমস্যা করে। ডিওডেনামের প্রথম ভাগে গিয়ে আয়রন শোষণ হয়। আরেকটি পুষ্টির মধ্যে বলি ভিটামিন বি১২। ভিটামিন বি১২ থাকে সাধারণত লাল মাংস, মাছ, দুধ অথবা ডিমের কুসুমের মধ্যে। সাধারণত আমরা কমবেশি সবাই খাই। তাহলে আমি ইতিহাস থেকে এটি পেয়ে যাচ্ছি। আমাকে খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাসটা নিতে হবে।

আরেকটি জিনিস আমরা বলি যে ফলিকের অভাব। এটি একটি প্রচলিত সমস্যা। অনেক বাচ্চার মধ্যে দেখা যায়, তারা ফাস্টফুড খাচ্ছে, পোলাও খাচ্ছে, মাংস খাচ্ছে। তারা কিন্তু শাকসবজি খেতে চায় না। সবুজ শাকসবজি না খেলে কিন্তু আপনি ফলিক এসিড পাচ্ছেন না। ভিটামিন বি১২ লিভারের তিন বছর পর্যন্ত সংগৃহীত থাকতে পারে। তবে ফলিক এসিড থাকে না। তাই ফলিক এসিড না খেলে সমস্যা দেখা দেবে। তাহলে এ ক্ষেত্রে আমার ইতিহাস দরকার। এখন আমরা করব কি, পরীক্ষা করে দেখব। ভিটামিন বি১২-এর অভাব হলে দেখা যায় নার্ভের ওপর তার কিছুটা প্রভাব পড়ে। হাঁটাতে একটু দুর্বলতা দেখা দেয়। চোখে কিছু সমস্যা হয়, স্মৃতিতে সমস্যা হয়, যাকে বলি ডিমেনশিয়া। কিছু নিউরোলজিক্যাল ক্ষতি হয়ে যায়। এগুলো অনেক সময় স্থায়ী হয়ে যায়। তার মানে এই জিনিসগুলো আমার খেয়াল করতে হবে।

রক্তস্বল্পতা রোগ আকারে দেখা দিতে পারে অথবা অনেকগুলো রোগের প্রাথমিক উপসর্গ হিসেবে দেখা দিতে পারে। রক্তস্বল্পতায় কারণটা বের করা খুবই প্রয়োজন। কারণ সঠিক বের করতে না পারলে চিকিৎসাটা সঠিকভাবে বের করতে পারবে না। কোন কারণে হচ্ছে, সেই জিনিসটা নির্ধারণ করা সবচেয়ে জরুরি। কারণ বের করে যথাযথ চিকিৎসা করতে হবে। একই সঙ্গে আয়রন সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে।

নারীদের রক্তস্বল্পতায় প্রতিকার ও করণীয়:  কোনো মেয়েকে ১৮ বছরের আগে বিয়ে দেয়া যাবে না। – দুটির বেশি সন্তান না নেয়া এবং এই দুটি গর্ভধারণের মাঝে অন্তত দুই বছরের বেশি সময় থাকতে হবে। – গর্ভধারণের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো এবং রক্তে হিমোগ্লোবিন শতকরা ১০ গ্রামের কম থাকলে চিকিত্‍সকের পরামর্শ নিতে হবে। – গর্ভকালীন সময়ে আমিষ, ভিটামিন ও আয়রনসমৃদ্ধ খাবার যেমন কলিজা, মাংস, ডিম, সবুজ শাকসবজি, মটরশুঁটি, শিম বা যেকোনো বিচি, কলা, পেয়ারা ইত্যাদি বেশি করে খেতে হবে। পাশাপাশি ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী অবশ্যই আয়রন ট্যাবলেট খেতে হবে। -কোনো ইনফেকশন বা রোগ থাকলে দ্রুত চিকিত্‍সা করাতে হবে। – গর্ভকালীন সময়ে নিয়মিত চেক-আপ এবং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতি তিন মাসে অন্তত একবার করে হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা করাতে হবে। – রক্তস্বল্পতা থাকলে চিকিত্‍সকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিত্‍সা করাতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। – একটি সুস্থ শিশুর জন্মের জন্য প্রধান শর্ত হলো মায়ের পূর্ণ সুস্থতা। তাই গর্ভবতী মায়ের সুস্থতা নিশ্চিত করতে হবে।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>