ট্যারা চোখ নিয়ে দুঃশ্চিন্তা! জেনে নিন চিকিৎসা

ট্যারা তো নয়, লক্ষ্মীট্যারা—ট্যারা চোখ নিয়ে কেউ কেউ এমন মন্তব্য করেন। আসলে কোনো ট্যারাই লক্ষ্মী নয়। কেননা ট্যারা চোখের সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করা হলে পরবর্তী সময়ে আক্রান্ত চোখটি ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি হারাতে পারে। তাই ট্যারা চোখ নিয়ে অযথা কালক্ষেপণ করা ঠিক নয়। চোখ ট্যারা হলে যতটা না শারীরিক যন্ত্রণা, তার চেয়ে বেশি মানসিক বিড়ম্বনা। ট্যারা চোখের দৃষ্টিজনিত অসুবিধাও অনেক। অনেকেরই জানা নেই, ট্যারা চোখ ঠিক করার চিকিৎসাও আছে। পরামর্শ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিটি চক্ষু বিভাগের প্রধান ও অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ।

কাকে বলে ট্যারা চোখ: ট্যারা চোখকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলে স্কুইন্ট বা স্ট্রাবিসমাস। এতে একটি চোখ সামনে কোনো কিছুর দিকে ফোকাস করার সময় অন্য চোখটি সেদিকে না তাকিয়ে বরং ওপর-নিচে বা ডানে-বাঁয়ে যেকোনো দিকে ফোকাস করে। সাধারণত কোনো কিছুর দিকে তাকালে দুই চোখের মণি একই সঙ্গে একইভাবে নড়ে। এভাবে স্বাভাবিক চোখে মণি দুটো একই রেখায় থাকে। কিন্তু ট্যারা চোখে একসঙ্গে দুই চোখের মণি একইভাবে নড়াচড়া করে না। এ কারণে দৃষ্টি একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে মেলে না। অন্য কেউ দেখলে মনে হবে দুই চোখের মণি দুই দিকে তাকিয়ে আছে। সাধারণত ট্যারা হয় ডানে বা বাঁয়ে। তবে ওপরে-নিচের দিকেও হতে পারে। কিছু ট্যারা আছে, যা সব সময় বোঝা যায় না, বিশেষ কোনো দিকে তাকালে বোঝা যায়। সাধারণত ট্যারা চোখ শিশুবয়সেই দেখা যায়। পরিসংখ্যান বলে, প্রতি ৫০০ শিশুর মধ্যে একজন ট্যারা। স্কুলে যাওয়ার আগেই, বলতে গেলে তিন বছর বয়সের আগে মা-বাবার কাছে ধরা পড়ে যে তার শিশুর চোখ দুটো একই সময়ে একই দিকে তাকায় না। শিশুটি তখন ভালো দেখার সুবিধার্থে আক্রান্ত চোখ দিয়ে দেখা বন্ধ করে দেয়। চিকিৎসা না হলে ওই চোখটি ধীরে ধীরে দৃষ্টি হারাতে পারে।

কীভাবে কাজ করে ট্যারা চোখ? : চিকিৎসাবিজ্ঞানে ট্যারা চোখকে বলা হয় স্কুইন্ট বা স্ট্রাবিসমাস। ট্যারা চোখের দুনিয়া দেখতে কেমন তা অনেকেরই কৌতূহলের বিষয়।আমরা প্রায় সবাই-ই চোখের কার্যপদ্ধতির সাথে পরিচিত। চোখ যেভাবে কাজ করে তার আদলেই ১৮৮৮ সালে তৈরি হয়েছিল ফিল্ম ক্যামেরা, যা আমরা কয়েক বছর আগেও (ডিজিটাল ক্যামেরা আসার পূর্বে) শখের ছবি তুলতে হরহামেশাই ব্যবহার করতাম। ফিল্ম ক্যামেরায় থাকে ফিল্ম রিল, যা ব্যটারির মতো আলাদা করে সংযুক্ত করতে হয়। এই ফিল্ম রিলের ছোট ছোট প্লেটে নেগেটিভ ছবি ধরা পড়ে যখন আমরা ক্লিক করি। এখানে কাজ করে একটি লেন্স আর একটি শাটার। মানুষের চোখে শাটারের কাজটি করে চোখের পাতা, যা চোখের লেন্সের মধ্য দিয়ে আলো প্রবেশ করতে সাহায্য করে এবং আমাদের মহা মূল্যবান রেটিনাই হলো ক্যামেরার ফিল্ম রিল। যখন বাইরের আলো আমাদের চোখের লেন্স এবং কর্নিয়া হয়ে রেটিনায় পড়ে, তখন আমাদের মস্তিষ্কে দর্শনানুভূতি তৈরি হয়। স্বাভাবিক চোখের ক্ষেত্রে আমরা যখন কোনোদিকে তাকাই, দুটি চোখ একইসাথে একইদিকে ফোকাস করে। কিন্তু স্কুইন্ট আক্রান্ত চোখের ক্ষেত্রে একটি চোখ সামনে কিছুর দিকে ফোকাস করলে অন্য চোখটি সেদিকে না তাকিয়ে বরং ডানে-বামে, উপরে-নিচে অন্য কোনো দিকে ফোকাস করে। যার ফলে আক্রান্ত চোখটির মধ্য দিয়ে আলোকরশ্মি রেটিনার সংবেদনশীল অংশে পৌঁছতে পারে না এবং সঠিক ব্যবহার না হওয়ায় তার কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। একসময় আক্রান্ত চোখটি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে। অনেক সময় দুটো চোখই কার্যক্ষম থাকে, তবে ফোকাস একইদিকে না হওয়ায় ব্যক্তি ঝাপসা দেখে। একে বলা হয় এমব্লায়োপিয়া, যার বাংলা অলস চোখ। ১০-১২ বছরের মধ্যে বাঁকা চোখের চিকিৎসা না করালে এমব্লায়োপিয়া হতে পারে। আর ট্যারা চোখ থাকা সত্ত্বেও যদি আক্রান্ত চোখ নষ্ট না হয়, সেক্ষেত্রে ব্যক্তি দুটো চোখ দিয়েই দেখার চেষ্টা করেন। ফলে তিনি ১টি জিনিসকে ২টি করে দেখতে পান। এর নাম ডিপ্লোপিয়া।

কেন চিকিৎসা দরকার: ট্যারা চোখের জন্য সৌন্দর্যহানি হয় কিন্তু তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হয় চোখের। তাই রোগটি নির্ণিত হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা করা জরুরি। প্রথমে নির্ণয় করা জরুরি কী কারণে ট্যারা হয়েছে। কারণের ওপর ভিত্তি করেই হয় চিকিৎসা। শিশুদের ক্ষেত্রে ট্যারা ধরা পড়ামাত্র চিকিৎসা করা দরকার। অন্যথায় চোখের গঠন ত্রুটিযুক্ত হতে পারে, দৃষ্টিশক্তির স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের যদি ট্যারা সমস্যা থাকে, তারা একই বস্তু দুটি দেখেন। শিশুদের ক্ষেত্রে দ্বি-দৃষ্টির এ সমস্যাটি হয় না। কারণ শিশুদের মস্তিষ্ক গঠন তখনো চলতে থাকে। মস্তিষ্ক দ্বি-দৃষ্টির সমস্যাটিকে নিজেই সমাধান করে। যদি তা না হয়, তাহলে মস্তিষ্ক ওই চোখের দেখার ক্ষমতাই বন্ধ করে দেয় বা কমিয়ে দেয়। এ কারণেই শিশুদের ট্যারা চোখের সমস্যা দ্রুত সমাধান করা উচিত। সাধারণত চোখের নড়াচড়ার জন্য অনেকগুলো মাংসপেশি কাজ করে, যা চোখের চারপাশে থাকে। এই মাংসপেশিগুলোর ক্ষমতা কমে গেলে ট্যারার সমস্যা হতে পারে। হঠাৎ করেও চোখ ট্যারা হয়ে যেতে পারে। এ ধরনের ক্ষেত্রে অবশ্যই দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিশু বয়সে যাদের ট্যারার সমস্যা চিকিৎসা করে ভালো করা হয়েছিল, পরিণত বয়সেও আবার সমস্যাটি দেখা দিতে পারে।

চিকিৎসায় ট্যারা চোখ ঠিক করা যায়? সাত বছর পর্যন্ত একটি শিশুর ভিশন বা দেখার প্রক্রিয়া গড়ে উঠতে থাকে। এই সময়ের মধ্যে ট্যারা চোখের চিকিৎসা না করা হলে এই গঠনপ্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। শিশু আক্রান্ত চোখ দিয়ে দেখা বন্ধ করে দেয় অভ্যাসবশত, ওই চোখটি ‘দেখা’ শিখে উঠতে পারে না এবং ধীরে ধীরে দৃষ্টি হারাতে থাকে। এই সমস্যাকে বলে অ্যামব্লিওপিয়া। এ ছাড়া ট্যারা চোখের কারণে শিশুরা ঝাপসা দেখে, কখনো দুটো দেখে। আশ্চর্য হলেও সত্যি, অ্যামব্লিওপিয়া রোধ করতে ভালো চোখটিকে ঢেকে রাখতে হয় এবং ট্যারা চোখটিকে দিয়ে ‘দেখা’ দেখাতে হয়। এটা করা হয় আই প্যাচিং-এর মাধ্যমে। এ ছাড়া দরকার হতে পারে ভিশন থেরাপি, চোখের ব্যায়াম বা বিশেষ চশমা। কারও কারও জন্য চোখের পেশির শল্যচিকিৎসাও লাগতে পারে। যত অল্প বয়সে চিকিৎসা শুরু করা যায় তত বেশি দৃষ্টিশক্তি রক্ষা করা যায়। তাই শিশুর চোখ ট্যারা মনে হলে বিলম্ব না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই উচিত। ট্যারার কয়েকটি প্রকার আছে। প্রকারভেদে এর কারণ ও চিকিৎসাও আলাদা হতে পারে। তাই ট্যারার আসল কারণ নির্ণয় করে চিকিৎসা জরুরি। এ ক্ষেত্রে বলা হয়, যত কম বয়স থেকে চিকিৎসা শুরু করা হবে সাফল্যের সম্ভাবনা তত বেশি। চিকিৎসার মধ্যে আছে-

চশমা: ট্যারা চোখের চিকিৎসায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় চশমা। দৃষ্টিজনিত যে সমস্যার জন্য চোখ ট্যারা হচ্ছে তা সংশোধনই এ চশমার কাজ। এ ধরনের চশমা চিকিৎসক দেখিয়ে নিতে হবে। সাধারণত যত বেশি সময় সম্ভব চশমা ব্যবহার করতে হয়।  চোখের ব্যয়াম: ট্যারা চোখ ভালো করার কিছু কার্যকর ব্যায়াম রয়েছে। এতেও ট্যারা চোখের সমস্যা কমে। এগুলো চারপাশে থাকা মাংসপেশির কার্যক্ষমতা ঠিক করতে সাহায্য করে। এমব্লায়োপিয়া রোধ করতে ভালো চোখটিকে ঢেকে রেখে আক্রান্ত চোখ দিয়ে দেখার অভ্যাস করালে অনেক সময় দুই চোখের ফোকাস একদিকে চলে আসে। চোখকে ডানে-বামে, উপরে-নিচে ঘোরানোর মাধ্যমে চোখের স্নায়ু সবল হয়। এতে ট্যারা চোখের ঝুঁকি কমে যায়। ব্যায়ামের ফলে চোখ নিয়ন্ত্রণকারী মাংসপেশী অধিক কার্যক্ষম হয়, যা চোখকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।  বটুলিনাম ইনজেকশন: কিছু ক্ষেত্রে এ ইনজেকশন দেওয়া হয়। যে মাংসপেশির কারণে ট্যারা সমস্যা হচ্ছে তাতে ইনজেকশনটি দেওয়া হয়। এতে সাময়িক সময়ের জন্য ট্যারা সমস্যা কমে। সাধারণত ইনজেকশনটি কার্যকর থাকে তিন মাসের মতো। এ সময়ের পরও যদি চোখের ট্যারা না সারে, অন্য চিকিৎসায় যেতে হয়। তবে এ ইনজেকশনের বেশ কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে।  অস্ত্রোপচার: চোখের নড়াচড়ার জন্য ছয়টি মাংসপেশি কাজ করে। এগুলো চোখের সঙ্গে সংযুক্ত। সাধারণত ট্যারা চোখের সমস্যা সমাধানে এর দুটি মাংসপেশিতে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয়। এক বা উভয় চোখেই অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে। এ ধরনের অস্ত্রোপচারে হাসপাতালে থাকার তেমন প্রয়োজন পড়ে না। তবে সপ্তাহখানেক বিশ্রামের দরকার। অস্ত্রোপচারের কিছু ঝুঁকি থাকলেও সাধারণত দৃষ্টিজনিত অসুবিধা হয় না। বর্তমানে বাংলাদেশে স্বল্প খরচেই ট্যারা চোখের চিকিৎসা সম্ভব। যেকোনো পদ্ধতিতেই হোক না কেন ট্যারা চোখ এখন প্রায় শতভাগ নিরাময়যোগ্য। শুধুমাত্র দরকার শিশুর প্রতি বাবা-মায়ের পূর্ণ সচেতনতা। শিশুর ট্যারা চোখ ধরা পড়বার সঙ্গে সঙ্গেই খুব দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। যত দ্রুত ট্যারা চোখের চিকিৎসা করা যাবে, শিশুর দৃষ্টিশক্তি বাঁচার সম্ভাবনা তত বেশী। তাই শিশুর চোখে অস্বাভাবিক কিছু দেখলে অতি দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করুন।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>