চিনি খেলে কি কৃমি হয়? কৃমির সঠিক চিকিৎসা কি?

শিশুর পেটে কৃমি সংক্রমণ নিয়ে রয়েছে অনেক বিভ্রান্তি। যেমন বাচ্চার দাঁত কটমট করলে বা অতিরিক্ত লালা ঝরলে অনেকে মনে করেন কৃমি হয়েছে। পাঁচ থেকে সাত মাস বয়সে কিন্তু বাচ্চাদের একটু বেশিই লালা ঝরতে থাকে। এর সঙ্গে কৃমির সম্পর্ক নেই। অনেকের ধারণা, বেশি মিষ্টি খেলে কৃমি হয়। এ ধারণাও ভুল। মিষ্টি বা চিনি নয়, কৃমি সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্ক আছে যেকোনো দূষিত খাবারের। গরমে যে কৃমির ওষুধ খাওয়ানো যাবে না, এটাও ঠিক নয়। তবে বিভ্রান্তি যা-ই থাকুক, বাংলাদেশে শিশুদের একটা বড় অংশ কৃমি সংক্রমণের শিকার। কৃমি বাচ্চাদের তীব্র স্বাস্থ্যহানি ঘটায়। তাই শিশুদের কৃমিমুক্ত রাখতে মা-বাবার সব সময়ই সচেতন থাকা উচিত।

১. খাবার তৈরি ও পরিবেশনের আগে, খাবার আগে ও মলমূত্র ত্যাগের পর সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। খুব ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মধ্যে এই অভ্যাস গড়ে তুলুন। প্রতিবার খাবার ধরার আগে হাত ধুতে হবে, এটা শেখান।  ২. হাত ও পায়ের নখ ছোট রাখতে হবে।  ৩. শিশুদের মলমূত্র পরিষ্কারের পর সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে।  ৪. রান্নার পাতিল, থালাবাসন নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।  ৫. মাংস, বিশেষ করে গরুর মাংস পুরোপুরি সেদ্ধ করতে হবে  ৬. টয়লেটে যাওয়ার সময় এবং বাড়ির বাইরে পায়ে স্যান্ডেল পরার অভ্যাস করাতে হবে  ৭. রাস্তার অপরিচ্ছন্ন ও দূষিত খোলা খাবার খেতে শিশুকে সব সময়ই নিরুৎসাহিত করবেন।  ৮. গৃহপালিত কুকুর ও বিড়ালকে নিয়মিত কৃমিনাশক ওষুধ দিতে হবে।  বাড়ির সবার একসঙ্গে কৃমির ওষুধ খাওয়া উচিত। বেশির ভাগ কৃমির ওষুধ দুই বছরের বেশি বাচ্চাদের জন্য হয়। তবে আজকাল এক বছর বা তারও কম বয়সের শিশুদের খাওয়ানো যায়, এমন ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে। অবশ্য খুব ছোট শিশুকে কৃমির ওষুধ খাওয়ানোর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

শিশুর পেটে ব্যথা মানেই কৃমি?  শিশুদের রুচি নষ্ট হওয়া এবং দুর্বলতার জন্য কৃমি দায়ী হতে পারে। শিশুদের পুষ্টিহীনতারও অন্যতম কারণ এটি। কৃমির সংক্রমণ হলে আপনি সন্তানকে যা-ই খাওয়ান না কেন, তার একটা বড় অংশ কৃমির পেটে চলে যায়। তবে পেটে ব্যথা, পেট কামড়ানো, দাঁত কিড়মিড় করা, লালা পড়া ইত্যাদি যে সব সময় কৃমি সংক্রমণের লক্ষণ, তা কিন্তু নয়। লক্ষণগুলো জানা থাকলে সন্তানের জন্য মঙ্গল।

কৃমির সংক্রমণের লক্ষণ: বিভিন্ন জাতের কৃমি শিশুদের শরীরে বিভিন্ন ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। তবে মোটামুটিভাবে শিশুদের কৃমির লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
শিশুর অরুচি বা খাওয়া-দাওয়া কমিয়ে দেওয়া, আয়রনের ঘাটতি ও রক্তশূন্যতার জন্য দুর্বলতা, বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, অপুষ্টিতে ভোগা, পেট ফাঁপা ও ডায়রিয়া৷ কখনো কখনো কৃমির কারণে অ্যালার্জি, চুলকানি, শ্বাসকষ্ট, কফ-কাশিও হতে পারে।

কৃমির ওষুধ কখন খাব?
কৃমি আকারে খুবই ছোট। প্রায় দেখাই যায় না। কিন্তু জেনে অবাক হবেন, এ রকম একটি কৃমি মানুষের অন্ত্র থেকে দিনে শূন্য দশমিক ২ মিলিলিটার রক্ত শুষে নেয়। অনেক কৃমি শরীরে থাকলে প্রতিদিনই বেশ কিছু পরিমাণ রক্ত হারিয়ে যায়। ফলে শিশুরা অপুষ্টি ও রক্তশূন্যতায় ভোগে। বড়রাও কম ভোগেন না। এ ছাড়া কৃমির কারণে অ্যালার্জি, ত্বকে চুলকানি, শুকনো কাশি, শ্বাসকষ্ট হতে পারে। কখনো অন্ত্রের বা পিত্তথলির নালিতে কৃমি আটকে গিয়ে বড় ধরনের জটিলতা হয়। কৃমি সংক্রমণ তাই বড় ধরনের স্বাস্থ্যসমস্যা। কৃমি দূর করতে হলে প্রথমেই জানা দরকার এটি কেন হয়? নোংরা পরিবেশ, অনিরাপদ পানি পান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, খালি পায়ে হাঁটা কৃমি সংক্রমণের জন্য দায়ী। কৃমি হলেও ওষুধের মাধ্যমে দূর করার উপায় আছে। কিন্তু অনেকে নানা ভুল ধারণার জন্য ভয়ে কৃমির ওষুধ খান না। শিশুদেরও খাওয়াতে চান না। কিন্তু ওষুধ নিয়ম মেনে খেলে আর সহজ কিছু উপায় মেনে চললে সহজেই কৃমি দূর করা যায়। জেনে নেওয়া যাক সহজ কিছু উপায়:

১. প্রতি তিন মাস পরপর পরিবারের সবাই একটি করে অ্যালবেনডাজল বড়ি সেবন করতে পারেন। মেবেনডাজল হলে খেতে হবে পরপর তিন দিন। সাত দিন পর আরেকটা ডোজ খাওয়া যায়। শিশুদেরও একইভাবে সিরাপ খাওয়াতে হবে। দুই বছরের নিচে কোনো শিশুকে খাওয়াতে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ২. চিনি খেলে বা মিষ্টি খেলে কৃমি হবে বলে যে ধারণা প্রচলিত, তা ঠিক নয়। মিষ্টি বা চিনি খাওয়ার সঙ্গে কৃমির কোনো সম্পর্ক নেই। বরং নোংরা হাতে বা অস্বাস্থ্যকর খাবার খেলে কৃমি হবে। ৩. কৃমি হলে পায়ুপথ চুলকায় বলে শিশুরা সেখানে হাত দেয়। পরে আবার সেই হাত মুখে দেয়। এভাবেই সংক্রমণ ছড়াতে থাকে। তবে পায়ুপথ চুলকানো মানেই কৃমি সংক্রমণ নাও হতে পারে। কৃমি সংক্রমণের আরও উপসর্গ আছে। যেমন: ওজন না বাড়া, পেট ফাঁপা, পেট কামড়ানো, আমাশয়, অপুষ্টি, রক্তশূন্যতা ইত্যাদি। ৪. গরমকালে কৃমিনাশক খাওয়া যাবে না—এমন ধারণারও কোনো ভিত্তি নেই। গরম, শীত, বর্ষা যেকোনো সময়ই কৃমিনাশক খাওয়া যাবে। তবে খাওয়ার পর বা ভরা পেটে খাওয়া ভালো। ৫. কৃমিনাশক নিরাপদ ওষুধ। এর তেমন কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। তবে কারও কারও পেট ফাঁপা বা বমি ভাব হতে পারে। অনেক সময় কৃমিনাশক খেয়ে শিশুদের অসুস্থ হওয়ার যে খবর পাওয়া যায়, তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অজ্ঞতা ও কুসংস্কারজনিত। ৬. পানি অবশ্যই ফুটিয়ে বা বিশুদ্ধ করে পান করবেন। শাকসবজি ও মাংস খাওয়ার আগে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশনের আগে ভালো করে হাত ধুতে হবে। শিশুদের খাওয়ার আগে ও শৌচাগার ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে কীভাবে ভালো করে হাত কচলে ধুতে হয়, তা শেখানো জরুরি। ৭. বাইরের খোলা অপরিচ্ছন্ন খাবার না খাওয়াই ভালো। মাঠঘাটে শিশুদের খালি পায়ে খেলতে দেবেন না। ৮. কেবল গ্রামে বা রাস্তায় থাকা শিশুদের কৃমি হয়—এই ধারণাও ভুল। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যে-কারও কৃমি সংক্রমণ হতে পারে। তাই অপুষ্টি এড়াতে নিয়মিত কৃমিনাশক খাওয়াই ভালো।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>