আক্কেল দাঁত হতে পারে মৃত্যুর কারণ !

বলা ​নেই কওয়া নেই, সে কী দাঁতের ব্যথা। টানা তিন দিন হতে চলল, ব্যথা কমবে কী, উল্টো গাল ফুলতে শুরু করল। অবস্থা বেগতিক দেখে শেষে ধরনা দিলেন দন্ত চিকিৎসকের কাছে। চিকিৎ​সক বড় বিচক্ষণ লোক, গালে হাত বোলাতে হলো না, হাতে টর্চ নিয়ে মুখ হাঁ করতে বললেন না, শুধু বর্ণনা শুনেই বুঝে গেলেন সব। বেশ ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘আপনার আক্কেল দাঁত উঠছে। ভয়ের কিছু নেই। ইটস ন্যাচারাল।’ মানুষের চোয়ালে স্থায়ী দাঁতের সংখ্যা মোট ৩২টি (আক্কেল দাঁতসহ)। তবে মোট ২৮টি দাঁত (আক্কেল দাঁত ছাড়া) কর্মক্ষম। প্রত্যেকের নির্দিষ্ট কাজ রয়েছে। আক্কেল দাঁতের কোনো কাজ নেই। এগুলো নিষ্ক্রিয় অঙ্গ। অথচ ওঠার সময় প্রচণ্ড ব্যথা হয়। সময়মতো এই দাঁতের চিকিৎসা না নিলে এই সমস্যা জটিল হয়ে মৃত্যুর কারণ পর্যন্ত হতে পারে। এ বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মাহমুদা আক্তার।

প্রশ্ন : আক্কেল দাঁত একটু বেশি বয়সে ওঠে, আমরা জানি। এবং এর সঙ্গে বুদ্ধির পরিপক্বতার একটি সম্পর্কের কথা বলা হয়। একে আমরা মেডিকেলের ভাষায় উইজডম টিথ বা থার্ড মোলার বলি। এই দাঁত অনেকেরই সমস্যা তৈরি করে বলে আমরা শুনতে পাই। কী ধরনের সমস্যা হয়?  উত্তর : আক্কেল দাঁত ওঠার সঙ্গে সঙ্গে প্রথমত প্রচণ্ড ব্যথা হয়। মাড়িটা ফুলে যায়। এই ফোলাটা এত মারাত্মক হয় যে শুধু মুখের ভেতরে ফোলাটা থাকে না, গালের দিকে ফুলে ওঠে, গলার দিকে ফুলে ওঠে। রোগী হয়তো অনেক সময় দ্বিধায় পড়ে যায়। ভাবে, টনসিলের ব্যথা বা মামস হয়েছে। কারণ, আক্কেল দাঁতের জন্য যে গলা, মুখ ফুলে যেতে পারে, এ বিষয়ে আমাদের ধারণা কম। তাই রোগী দ্বিধায় পড়ে যায়। তবে আক্কেল দাঁতের জন্য এই সমস্যাগুলো প্রায়ই হয়ে থাকে।

প্রশ্ন : অন্যান্য দাঁতের বেলায় তো এ ধরনের সমস্যা হয় না। তাহলে আক্কেল দাঁতের বেলায় এমন হয় কেন?  উত্তর : দুধের দাঁত পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিচ থেকে আরেকটি দাঁত আসতে থাকে। ফলে ওইটির একটি জায়গা থাকে। তবে আক্কেল দাঁতগুলো ১৮ বছরের পরে ওঠে। তখন আমাদের মাড়ির টিস্যু একটু পুরু ও শক্ত হয়ে যায়। দাঁতটি আসতে হলে তো মাড়িকে একটু চিরে উঠতে হবে। ফলে ওঠার সময় চাপ হয় এবং মাড়িকে একটু কেটে কেটে সে বের হয়। সে জন্য এই ব্যথা থাকে। কখনো কখনো চোয়ালে জায়গার অভাব হলে বা আক্কেল দাঁতের অস্বাভাবিক অবস্থানের জন্য স্বাভাবিকভাবে মাড়ি থেকে বের হতে পারে না। কিছুটা উঠে আটকে যায়। এ অবস্থায় কখনো খাদ্যদ্রব্য আটকে গিয়ে মাড়িতে প্রদাহ হয়, এতে মাড়িতে তীব্র ব্যথা হয়, হাঁ করতে অসুবিধা হয় এবং সময়মতো চিকিৎসা না হলে সংক্রমণ মুখে ও গলায় ছড়িয়ে পড়ে। এ জন্য দ্রুত দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। আক্কেল দাঁত একটু বেশি বয়সে ওঠে এবং এর সঙ্গে বুদ্ধির পরিপক্বতার একটি সম্পর্কের কথা বলা হয়। মেডিকেলের ভাষায় যাকে উইজডম টিথ বা থার্ড মোলার বলা হয়ে থাকে। আক্কেল দাঁত ওঠার সময় প্রচণ্ড ব্যথা হয়। মাড়ি ফুলে যায়। এই ফোলাটা এত মারাত্মক হয় যে তা শুধু মুখের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না। গাল, এমনি গলার দিকেও ফুলে ওঠে। তাই রোগীর টনসিলের ব্যথা বা মামস হয়েছে ভেবে অনেক সময় দ্বিধায় পড়ে যায়। কারণ, আক্কেল দাঁতের জন্য যে গলা ও মুখ ফুলে যেতে পারে, এ বিষয়ে সাধারণ মানুষের ধারণা কম। কিন্তু প্রশ্ন হলো অন্যান্য দাঁতের বেলায় তো এ ধরনের সমস্যা হয় না। তাহলে আক্কেল দাঁতের বেলায় এমন হয় কেন? প্রথম কারণ হলো অন্যান্য দাঁত ওঠে অল্প বয়সে। দুধের দাঁত পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিচ থেকে আরেকটি দাঁত উঠে আসে। এবং মাড়ির ওই জায়গাটিতে মাড়ির টিস্যু নরম এবং কোমল থাকে। কিন্তু আক্কেল দাঁতগুলো সাধারণত ১৮ বছর বয়সের পরে ওঠে। তখন আমাদের মাড়ির টিস্যু অনেক পুরু ও শক্ত হয়ে যায়। কিন্তু দাঁতটি আসতে হলে তো মাড়িকে একটু চিরে উঠতে হবে। ফলে ওঠার সময় চাপ হয় এবং মাড়িকে একটু কেটে কেটে সে বের হয়। সে জন্য এই ব্যথা থাকে। আবার অনেক সময় আক্কেল দাঁত একটু বাঁকা হয়ে ওঠে, অন্যান্য দাঁত সাধারণত সোজা হয়ে ওঠে। কিংবা হয়তো আক্কেল দাঁত উঠতেই পারছে না, বাঁকা হয়ে আছে অথবা শুয়ে আছে অথবা পেছনের দিকে একটু কাত হয়ে আছে—এই সমস্যাগুলো হয়। তার ওঠার প্রবণতা আছে; তবে এ ধরনের অবস্থার জন্য, ব্যথা এবং ফোলার জন্য দাঁতটি উঠতে পারছে না। ফলে একবার হয়তো ব্যথা হচ্ছে, আবার হচ্ছে—রোগী সাধারণত এ ধরনের অভিযোগ নিয়ে আমাদের কাছে আসে।

প্রশ্ন : একসময় দাঁতের কোনো সমস্যা হলেই মানুষ ফেলে দিত। তবে এখন দন্ত চিকিৎসকরা বলছেন, দাঁত ফেলে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। উচিত হলো চিকিৎসা করে রক্ষা করা। ফলে মানুষ এই দিকে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তবে আক্কেল দাঁতের বেলায় কোনো সমস্যা হলে আপনারা ফেলে দিতে বলেন—এর কারণ কী?  উত্তর : আসলে আমাদের প্রধান যে খাবারের দাঁত, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় মোলার টিথ বলি, আক্কেল দাঁত সেই মোলার তিনটি দাঁতের মধ্যে একটি। তবে এগুলো আসলে আমাদের খাবার চিবানোর কাজে লাগছে না। সামনের যে মোলার টিথগুলো আছে, সেগুলোই আমাদের খাওয়ার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে শেষ যে দাঁত, আক্কেল দাঁত—সেটি খাওয়ার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে না। এই দাঁত মাঝেমধ্যে যেহেতু সমস্যা তৈরি করে এবং রোগীর জন্য, আমাদের জন্য উপকারী কিছু নয়, কোনো কাজে আসছে না—এ জন্যই আমরা বলি এটি ফেলে দেওয়ার জন্য। অনেক ভেতরে হওয়ার কারণে এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে চিকিৎসা, সেটিও জটিল। এই দাঁত সহজে পরিষ্কার হয় না বলে বারবার সমস্যা হয়। তবে দাঁতটা আমরা রক্ষা করতে চাই না, তা নয়। অনেক সময় রোগীর যদি মুখের আকৃতি ভালো থাকে, রক্ষণাবেক্ষণ পদ্ধতিতে রেখে দেওয়ার চেষ্টা করি। অনেক রোগী আছে, বলে আমি ফেলব না, তখন রুট ক্যানেল বা আরো অনেক পদ্ধতি আছে—সেগুলো দিয়ে রেখে দেওয়ার চেষ্টা করি। তবে মূলত যেহেতু এটা আমাদের খাওয়ার কাজে কোনো সাহায্য করছে না, তাই একে ফেলে দিতে বলি।

প্রশ্ন : আক্কেল দাঁতের সমস্যা হলে কেউ যদি সময়মতো চিকিৎসা না নেন, তবে এই সংক্রমণ কতখানি ক্ষতির কারণ হতে পারে?  উত্তর : আক্কেল দাঁতে বারবার ব্যথা হচ্ছে, কমে যাচ্ছে—এতে অনেকেই একে এড়িয়ে যান। ভাবেন, এটি কোনো বিষয় নয়। তবে দাঁতটি যেহেতু একটি হাড়ের মধ্যে রয়েছে, সেই সংক্রমণ বাড়তে বাড়তে হাড়টি ক্ষয় হয়ে গলার দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এটি অনেক সময় কেবল ওই জায়গা নয়, সামনে-পেছনে এমনভাবে হয়ে আসে, যাকে আমরা জীবনঝুঁকির কারণ হিসেবে বলি। পুরো গলা ফুলে শক্ত হয়ে যায়। এ ধরনের রোগী এতটাই অস্থিতিশীল হয় যে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে সার্জারি করাতে হয়। তখন তার জীবন বাঁচানো একটু ঝুঁকির হয়ে যায়।

প্রশ্ন : একজন মানুষের আক্কেল দাঁতের সমস্যা হলে মৃত্যুর ঝুঁকিও হয়ে যায়, আপনি বলছিলেন। এর কারণ কী, কেন হয়?  উত্তর : আসলে সংক্রমণ হলে সেখানে কিছুটা ফ্লুইড জমে। গলার দিকের টিস্যুগুলো নরম হয়, সেই পথ দিয়ে ফ্লুইডটি গলা দিয়ে নিচের দিকে নামতে থাকে। ফলে সেই সংক্রমণও ছড়াতে থাকে। এর ফলে গলা ফুলে যাচ্ছে। তখন সেটি আমাদের শ্বাসনালিকে চেপে ধরে। সে জন্য এর সময়মতো চিকিৎসা অবশ্যই করতে হবে।

প্রশ্ন : সার্জারির পরে একজন মানুষের কতদিন বিশ্রামের দরকার পড়ে?  উত্তর : সার্জারি দেয়ার পর সেলাই দেওয়া হয়। আমরা রোগীদের পরামর্শ দেই যে শক্ত কিছু খাবেন না। ব্যথা কমানোর জন্য আমরা ব্যথানাশক ওষুধ দেই। বিছানায় শুয়ে থাকার ওভাবে দরকার হয় না। তবে স্বাভাবিক কাজ করতে একটু তার অসুবিধা হয়। সে ক্ষেত্রে তাদের পরামর্শ মতো আমরা তাদের চলতে বলি, তখন সাধারণত সমস্যা হয় না। সমস্যা হয়ে গেলে আক্কেল দাঁত ফেলে দেওয়াই সমাধান। না ফেললে উপকার তো হয়ই না, এতে জটিলতা বাড়ে।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>