চোখ দিয়ে পানি পড়া সমস্যায় ভুগছেন? জেনে নিন সঠিক চিকিৎসা

চোখের পানি বা অশ্রু চোখের ভালো থাকার জন্য একটি অপরিহার্য উপাদান। এই চোখের পানি আমাদের কর্নিয়ার পুষ্টি, আর্দ্রতা ও বাহ্যিক আঘাত থেকে প্রাথমিক প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলে। দুই চোখের ওপরের ভুরুর নিচে আছে এক জোড়া ল্যাক্রিমাল গ্ল্যান্ড বা অশ্রুগ্রন্থি, তা থেকে চোখের পানি তৈরি হয়ে ল্যাক্রিমাল থলে হয়ে ন্যাসোল্যাক্রিমাল নালি দিয়ে নাকের ভেতর চলে যায়। এ থেকেই নাকের পানি চোখের পানি একাকার কথাটার উৎপত্তি। তবে কখনো কখনো কোনো কারণ ছাড়াই অতিরিক্ত চোখের পানি পড়তে থাকে, কখনো অবিরতভাবেই পড়তে থাকে। এই সমস্যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলে এপিফোরা।

চোখ দিয়ে পানি পড়ার কারণ: স্বাভাবিক চোখ সবসময় একটু ভেজা থাকে। অতিরিক্ত পানি চোখের ভেতরের কোনায় অবস্থিত নল (নেত্রনালী) দিয়ে নাকে চলে যায় এবং শোষিত হয়। কোন কারণে চোখে অতিরিক্ত পানি তৈরী হলে, অথবা নেত্রনালী বন্ধ হয়ে গেলে চোখের পানি উপচে পড়ে। শিশুর জন্মের পর পর যদি নেত্রনালী বন্ধ থাকে, সেক্ষেত্রে চোখ হতে পানি পড়তে পারে। এক্ষেত্রে সাধারণতঃ এক বছরের মধ্যে আপনি আপনিই নেত্রনালী খুলে গিয়ে পানি পড়া ভাল হয়ে যায়। এইক্ষেত্রে নেত্রনালীতে ইনফেকশন হয়ে পূঁজ জমতে পারে। চোখের ভেতরের কোনায় চাপ দিলে পানি ও পূঁজ বের হতে পারে। বয়স্ক লোকের নেত্রনালী বয়সজনিত পরিবর্তনের কারণে সরু হয়ে যেতে পারে। এছাড়াও বয়সের কারণে চোখের চারদিকের মাংশপেশী দূর্বল হবার কারণেও নেত্রনালী অকার্যকর হয়ে চোখ হতে পানি পড়তে পারে। এছাড়াও নেত্রনালীর সমস্যা ছাড়াও চোখের অ্যালার্জী, চোখ ওঠা রোগ, গ্লুকোমা, কর্ণিয়ার ঘা, চোখের আঘাত ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে যে কোন বয়স চোখ দিয়ে পানি পড়তে পারে। অতিরিক্ত সর্দি হলে নাকের প্রদাহের কারণে নেত্রনালীর ছিদ্র মুখ বন্ধ হয়ে চোখ হতে পানি পড়তে পারে।

করণীয়: শিশুদের ক্ষেত্রে নেত্রনালীর সমস্যার কারণে চোখ হতে পানি পড়লে ডাক্তারের পরামর্শে চোখের কোনায় মালিশ এবং অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ ব্যবহারে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে পানি পড়া বন্ধ হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রোবিং সার্জারীর মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করতে হয়। তরুণ বয়সে নেত্রনালীর সমস্যার কারণে চোখ হতে পানি পড়লে নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ, কোন কোন ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক/স্টেরইড এর মিশ্রন ব্যবহার করলে এ সমস্যা অনেকাংশে লাঘব হয়। চোখে জমে থাকা পূঁজ চোখের কোনায় চাপ দিয়ে নিয়মিত পরিস্কার করা প্রয়োজন। ওষুধে ভাল না হলে ‘ডিসিআর’ অপারেশনের মাধ্যমে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই এ সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান সম্ভব। বেশী বয়স্কদের নেত্রনালী সংকুচিত হওয়ার কারণে ডিসিআর অপারেশন করা সম্ভব হয়না। সেক্ষেত্রে ডিসিটি অপারেশন করা হয়। এক্ষেত্রে পূঁজ জমা বন্ধ হয়, কিন্তু পানি পড়া বন্ধ হয় না। যে সব বয়স্ক লোকের ছানিরোগ আছে, আবার তাদের যদি নেত্রনালীর সমস্যার কারণে চোখ হতে পানি ও পূঁজ পড়ে, সে ক্ষেত্রে অবশ্যই ছানি অপারেশনের পূর্বে ডাক্তারের পরামর্শে বয়সভেদে ডিসিআর অথবা ডিসিটি অপারেশন করতে হবে, না হলে চোখের কোনায় জমে থাকা জীবানু ছানি অপারেশনের সময় চোখের ভেতরে ঢুকে মারাত্মক ইনফেকশন করতে পারে। নেত্রনালী সমস্যা ব্যতিত অন্য কারণে পানি পড়লে সে কারণ চিহ্নিত করে ডাক্তারের পরামর্শে তার চিকিত্সা করাতে হবে। বর্তমানে লেজার রশ্নির সাহায্যে চামড়া না কেটে অল্পসময়ে ডিসিআর অপারেশন করা সম্ভব, ফলে অপারেশনের পরে চামড়ায় দাগ পড়ে না।

প্রশ্ন : শিশুদের চোখ থেকে পানি পড়ার কারণগুলো কী?
উত্তর : আমাদের দেশের শতকরা ছয়জন বাচ্চার চোখ থেকে পানি পড়ে। এটা আমরা স্বাভাবিকভাবে পেয়ে থাকি। তবে ইদানীং এই রোগটি খুব বেশি দেখছি। এটাকে রোগ হিসেবে বলছি এই কারণে যে, সঠিক সময়ে এর যদি সঠিক চিকিৎসা করা না হয়, তবে নানা ধরনের জটিলতায় শিশুর দৃষ্টির ক্ষতি হতে পারে। চোখ দিয়ে পানি পড়ার কারণ বলতে গেলে আমরা প্রথম যেটা বুঝি, আমাদের চোখের ঠিক কোণায় একটি গ্রন্থি আছে। এই ল্যাকরিমাল গ্রন্থি থেকে পানি বের হয়। সেটা মণিকে সিক্ত রাখে, চোখ সিক্ত রাখে। এরপর চোখের কোণায় দুটো ছিদ্র রয়েছে, যাকে বলা হয় পাংটা, এরপর একটি পথ রয়েছে এর মধ্য দিয়ে পানি নাকের ভেতর দিয়ে চলে যায়। এটি স্বাভাবিক পদ্ধতি। যদি কোনো কারণে এই পথ বন্ধ থাকে, শিশুদের ক্ষেত্রে দেখা যায় জন্মগত কারণে ছিদ্রটি তৈরি হয়নি। সেই কারণে ছিদ্রের ভেতর দিয়ে না বেরিয়ে পানিটা গড়িয়ে আসে। আবার দেখা যায়, এই রাস্তা দিয়ে ঢুকল ঠিকই, তবে স্যাক নামক একটি জায়গা আছে, যাকে বলা হয় ল্যাকরিমাল স্যাক। এটি থলের মতো, পানিটা এসে এই থলির ভেতর জমা থাকে। যদি থলিতে কোনো সমস্যা থাকে। তাহলে পানি আর পেছনের দিক থেকে নাকে যেতে পারবে না। সাধারণত পূর্ণ বয়স্ক বাচ্চা বা ফুল টার্ম বেবি যারা জন্মগ্রহণ করে, সে সমস্ত শিশুদের রাস্তাটি খুলে যায় জন্মের পরেই। তবে যদি অপরিপক্ব শিশু যদি হয়, তখন পথটি তার পরিষ্কার হয় না। পরিষ্কার না হলে, পানি তার পথ দিয়ে যেতে পারবে না। এখানে জমা হয়ে একটি সংক্রমণের তৈরি করবে। আবার দেখা যায়, ছোট ছোট বাচ্চা তাদের নখ সাধারণত বড় থাকে। হয়তো বা কোনোভাবে হাতের আঙুল লেগে, কালো মণিতে ক্ষত হলো। এই ক্ষত যদি সঠিক সময়ে চিকিৎসা না নেওয়া হয়, পরবর্তীকালে কালো মণির জন্য তার দৃষ্টিহানি হবে। আবার চোখের যদি চাপ বেড়ে থাকে, তবে তার প্রাথমিক পর্যায়ে চোখ দিয়ে পানি আসে। সুতরাং শিশুর চোখের পানি পড়লে অনেক গুরুত্ব দিতে হবে।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>