সুস্বাস্থ্যের জন্য আমাদের দেহে শর্করা জাতীয় খাবারের গুরুত্ব

সুষম খাদ্যের ছয় প্রকার উপাদানের মধ্যে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা জাতীয় খাদ্যের গুরুত্ব অত্যধিক। আমাদের বেঁচে থাকার জন্য কার্বোহাইড্রেট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি জীবদেহের শক্তির আধার হিসেবে কাজ করে। মূলত খাদ্য উপাদানে পানির পরেই এর স্থান। স্বাদের ভিত্তিতে কার্বোহাইড্রেট দুই প্রকার হয়ে থাকে। সুগার এবং ননসুগার। মিষ্টি দানাদার যুক্ত খাবার—গ্লুকোজ, ফ্রুকটোজ, সুক্রোজ ইত্যাদি সুগার জাতীয় খাদ্য। আবার স্টার্চ সেলুলোজ এগুলো ননসুগারযুক্ত খাবার। কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার খেলে রক্তে শর্করা কী পরিমাণ বৃদ্ধি পায় তার পরিমাপক হলো গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বা জিআই। জিআই ফ্যাক্টর কম পরিমাণে থাকে বিট, আলু, দুধ, পাকা ফল, মধু, অট এবং বিভিন্ন অ্যালকোহল জাতীয় খাবারে। আবার ভাত, রুটি, সয়াবিন, মাশরুম, রাজমা, মসুর, ডাল, সি ফুড, কচু, আলু, মাংস, পেঁয়াজ, রসুন, ঢেঁড়স ইত্যাদি খাদ্যে জিআই ফ্যাক্টর বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়। একজন পূর্ণ বয়স্ক সুস্থ মানুষের খাদ্য তালিকায় প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম শস্য জাতীয় খাদ্য, ৫০ গ্রাম চিনি এবং ১৫০ গ্রাম শাক সবজি থাকা উচিত। কার্বোহাইড্রেটের অভাবে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে কর্মক্ষমতা হারাতে থাকে। সিম্পল কার্বোহাইড্রেট যুক্ত খাবার রক্তে গ্লুকোজ সঞ্চালন করে। ফলে শরীরে এনার্জি অনেক সময় ধরে থাকে এবং রক্তে শর্করা বৃদ্ধি কম হয়। কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট যুক্ত খাবার রক্তে শর্করা বেশি বৃদ্ধি করে।[১]

ওজন কমাতে শর্করা একেবারেই বাদ?
বাড়তি ওজনের জন্য অনেকেই শর্করাজাতীয় খাবারকে দায়ী করেন। ভাবেন, ‘নো কার্ব’ বা শর্করা বর্জন ওজন কমানোর চাবিকাঠি। আসলে তা নয় এবং সেটা সম্ভবও নয়। কারণ, শকর্রাবর্জিত খাবার দিনের পর দিন খেতে থাকলে শরীরে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। হয়তো দু-চার দিন এ ধরনের খাবার গ্রহণ করা যায়, দিনের পর দিন নয়। যেমন—মাছ, মাংস, ডিম, তেল, ঘি, মাখন এগুলো একেবারেই শর্করাবর্জিত খাবার। ভাবুন তো, এসব খাবার খেয়ে কি জীবন কাটাতে পারবেন? আসলে সবই খেতে হবে, তবে তা হওয়া উচিত পরিমিত। শর্করাজাতীয় খাবার কতটুকু খাওয়া যাবে বা যাবে না সে ব্যাপারে পুষ্টিবিদ আখতারুন নাহার বলেন, শর্করা শক্তির অন্যতম উৎস। পুষ্টিবিজ্ঞানের মতে, মানুষের প্রতিদিনের খাবারে মোট ক্যালরির ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ শর্করা থাকা উচিত। তবে যাঁরা ওজন কমাতে চান, তাঁদের ক্ষেত্রে শর্করার অংশটি ভাত-রুটি ইত্যাদি মিলে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ হলেই ভালো হয়। আখতারুন নাহারের মতে, শিশুদের ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য। তবে তাদের খাবারে অবশ্যই শরীর গঠনকারী উপাদান বা দুধ থাকতেই হবে। যদিও দুধে আছে পর্যাপ্ত শর্করা। খাবারের মধ্যে শর্করা থাকে বিভিন্ন রূপে। যেমন—গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ, গ্যালাক্টোজ, সুক্রোজ, মল্টোজ। আমাদের দেহের কার্যপ্রক্রিয়ায় গ্লুকোজ প্রয়োজনীয় উপাদান। ফ্রুক্টোজ হলো ফলের চিনি। সুক্রোজ প্রায় সব উদ্ভিদেই কমবেশি থাকে। তবে আখ ও বিটে থাকে উচ্চমাত্রায়। এ জন্য এই দুটো দিয়ে সহজেই চিনি তৈরি করা যায়। ল্যাক্টোজ হলো দুধের চিনি। অঙ্কুরিত শস্যের মধ্যে মল্টোজ থাকে। গ্লুকোজ একাই স্নায়ুতন্ত্রের শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। এ কারণে শর্করাজাতীয় খাবারের অভাবে শরীরে দহন ক্রিয়া থেমে যায়। এর ফলে কিটোন বডি নামে শরীরে ক্ষতিকর পদার্থ উৎপন্ন হয়। শর্করা বাদ দেওয়া যেমন খারাপ, তেমনি অতিরিক্ত শর্করা খাওয়াও ক্ষতিকর। কেননা অতিরিক্ত শর্করা শরীরে চর্বি তৈরি করে। ফলে ওজন বেড়ে যায় ও অন্ত্রকে উত্তেজিত করে। এ জন্য শর্করা খেতে হবে সীমিত পরিমাণে, তবে একেবারে বর্জন নয়। শিশু, কিশোর ও বয়স্কদের বেলায় একইভাবে জাঙ্ক ফুড অর্থাৎ পিৎজা, বার্গার, স্যান্ডউইচ, কোমলপানীয় বন্ধ করে সুষম খাবার গ্রহণ করা উচিত। কারণ, জাঙ্ক ফুডে ক্যালরি ও চর্বির পরিমাণ থাকে অনেক বেশি। সুষম খাবার গ্রহণ করতে গেলে খাবারের সব কয়টি উপাদান যেমন—আমিষ, শর্করা, চর্বি যার যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু খেতে হবে। মোদ্দা কথা হলো, কোনোটাই বাদ দেওয়া যাবে না আবার কোনোটাই অতিরিক্ত খাওয়া যাবে না।[২]

শর্করা খেয়েও ওজন বাড়বে না!
ডায়েট করছি তো শর্করা একদম বাদ—এই ধারণা একদম ঠিক না। বরং ডায়েটের সময় খাদ্যতালিকা থেকে শর্করা সম্পূর্ণ বাদ দিলে অসুস্থ হয়ে পড়ার সুযোগ থাকছে। ডায়েট করে সুস্থ থাকার জন্য তাই অল্প পরিমাণে হলেও শর্করা খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিলেন পুষ্টিবিদেরা। অনেকে শর্করা বলতে শুধু ভাত, রুটি বা আলুকেই চিহ্নিত করেন। তবে চিনি, গুড় বা মধুতেও শর্করা থাকে। যেটি ‘সিম্পল সুগার’ হিসেবে পরিচিত। পুষ্টিবিদ আখতারুন নাহার বলেন, ‘সম্পূর্ণ শর্করা বাদ দিয়ে কোনো মানুষই সুস্থ থাকতে পারে না। আর তাই যাঁরা ডায়েট করতে গিয়ে পুরোপুরি শর্করা বাদ দিয়ে ফেলেন তাঁরা দ্রুত অসুস্থ হয়ে যাবেন। সুস্থ থাকতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় কমপক্ষে তাই ৩০ শতাংশ শর্করা নিতে হবেই। এর চেয়ে কম নিলে এবং সেটা বেশি দিন স্থায়ী হলে শরীরে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেবে।’  খাবারের তালিকায় শুধু প্রোটিন বা ফ্যাট রেখে ওজন কমাতে চাইলে সেটা হবে বোকামি। তার চেয়ে বরং ক্যালরি কমানোর মাধ্যমে ওজন নিয়ন্ত্রণে আনার পক্ষে মত দিলেন পুষ্টিবিদেরা। ভাত, রুটি, আলু, খই, মুড়ির মতো খাবারে জটিল শর্করা আছে। যা ‘কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট’ হিসেবে পরিচিত। এ ধরনের খাবার একেবারে বাদ না দিয়ে পরিমাণটা কমিয়ে দিতে পারেন। তাহলেই সুস্থ থেকে মাসে তিন থেকে চার কেজি ওজন ঝেড়ে ফেলতে পারেন। খাদ্য তালিকা বা ডায়েট চার্ট মেনে খাবার গ্রহণের আগে অবশ্যই পুষ্টিবিদদের কাছে ওজন মেপে পরামর্শ নিতে হবে। তাহলেই পাওয়া যাবে সঠিক খাবার তালিকা। কেমন হবে অল্প কার্বোহাইড্রেট নিয়ে ডায়েটের দিনগুলোর খাবার, তাঁর একটা নমুনা অধুনার পাঠকদের জানিয়ে দিলেন আখতারুন নাহার। উচ্চতা অনুযায়ী স্বাভাবিক যে ওজন থাকার কথা তার চেয়ে যাঁদের ওজন ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেশি তাঁদের জন্য খাবার তালিকাটা হবে এমন—  সকাল: একটা রুটি, সেদ্ধ ডিম, কম তেলের সবজি দিয়েই সকালের নাশতাটা সেরে নিতে পারেন। পানিযুক্ত সবজি বেশি করে খেতে পারেন।  দুপুর: দুপুরে আধা কাপ ভাত (৫০ গ্রামের মতো), বেশি পরিমাণে ডাল, সবজি ও সালাদ খাবেন। তবে মাছ বা মাংসের একটা পদ থাকতে হবে। সেটা ৩০ গ্রাম পরিমাণে।  রাত: রাতে রুটি খাওয়াটাই ভালো। রুটি হলে দুইটা খাবেন। চাইলে এক কাপ ভাতও খেতে পারেন। এর সঙ্গে সবজি, ডাল আর মাছ বা মাংসের এক পদ। তবে স্বাদবদলের জন্য দুপুরে মাছ খেলে রাতে মাংস বেছে নিতে পারেন। আর রাতের খাবার অবশ্যই নয়টার মধ্যে শেষ করে ফেলতে হবে। সে ক্ষেত্রে যতটা আগে সম্ভব খেতে পারেন। যেসব খাবারে ক্যালরি বেশি সেসব এড়িয়ে চলতে হবে। দাওয়াতে যাওয়ার আগেও ভাবতে হবে যাবেন কি না। দিনে ২০ মিলিলিটারের বেশি তেল খাওয়া যাবে না। তাহলেই আপনার ওজন কমবে শরীর ফিট রেখেই।

সবজিতে কি শর্করা আছে?
প্রায় সব ধরনের সবজিতেই কিছু না কিছু শর্করা আছে। তবে ডায়াবেটিসের রোগীর জন্য কোনটা খাওয়া ভালো আর কোনটা খারাপ, তা নির্ভর করে তার গ্লাইসেমিক সূচক বা ইনডেক্সের ওপর। কোনো একটা খাবার কত দ্রুত রক্তে শর্করা কতটা বাড়াতে পারে—তারই সূচক এটি। যেসব খাবারের গ্লাইসেমিক সূচক ৭০-এর ওপর, সেগুলোকে বলা হয় উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বা হাই জিআই ফুড। আর যেসব খাবারের জিআই ইনডেক্স ৫৬ থেকে ৬৯, সেগুলো মধ্যম জিআই খাবার। আর এই সূচক ৫৫-এর নিচে হলে বলা হয় নিম্ন বা লো জিআই ফুড। যে খাবারের জিআই যত বেশি, তা ডায়াবেটিক রোগীর জন্য তত খারাপ। বেশির ভাগ শাকসবজিতে আঁশের পরিমাণ বেশি বলে সেগুলো অন্ত্রে শোষিত হতে বেশি সময় লাগে, আর সেসবের পুষ্টি উপাদানগুলো ধীরে ধীরে রক্তে মেশে। ফলে অতি দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়ায় না। তাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শাকসবজি খেলে আপনার রক্তের শর্করা বাড়ার কথা নয়। তবে এর কিছু ব্যতিক্রম আছে। আসুন জেনে নিই সেগুলো সম্পর্কে।
আলু: আলু একটি উচ্চমানের জিআইসম্পন্ন খাবার। অর্থাৎ এর জিআই ৭০-এর বেশি। শুধু তা-ই নয়, এর ক্যালরি মানও অনেক। আলুতে কেবল শর্করাই বাড়ে না, ওজনও বাড়তে পারে। মিষ্টি আলুতে প্রচুর আঁশ থাকা সত্ত্বেও এর জিআই ৭০-এর কাছাকাছি। তাই আলু খেতে হবে হিসাব করে।  মিষ্টিকুমড়া: মিষ্টিকুমড়া খেতে মিষ্টি; কেননা, এতে বেশ শর্করা আছে। এর জিআই ৬৫। তবে মিষ্টিকুমড়ায় আছে একই সঙ্গে প্রচুর ভিটামিন ‘এ’ এবং ভিটামিন ‘সি’। তাই একেবারে বাদ না দিয়ে বরং অন্যান্য সবজির সঙ্গে রান্না করে খাওয়া ভালো।  গাজর: অনেকের ধারণা গাজর মিষ্টি বলে বেশি খাওয়া চলবে না। তবে গাজরের জিআই মধ্যম মাত্রার—৪০ থেকে ৪৫। একটি গাজরে ৫ গ্রাম শর্করা আর ৩১ ক্যালরি শক্তি থাকে। প্রচুর বিটা ক্যারোটিন বা ভিটামিন ‘এ’ আছে গাজরে। তাই শর্করার ভয়ে গাজর একেবারে বাদ দেওয়া ঠিক নয়।  বিট: লাল বিটেও বেশ ভালো পরিমাণ শর্করা আছে। যদিও এটিও মধ্যম মাত্রার জিআইসম্পন্ন সবজি। আধা কাপ বিটে ৭ গ্রাম শর্করা আছে।

ভাতের পরিবর্তে কী খাওয়া যায়?
ভাত আমাদের প্রধান খাবার। কিন্তু এতে শর্করার মাত্রা অনেক বেশি। তাই এই খাবার আমাদের রক্তে শর্করার মাত্রা ও শরীরের ওজন—দুটোই বাড়ায়। তাই যাঁরা ওজন কমাতে চান, তাঁদের ভাত কম খেতে হয়। ডায়াবেটিসের রোগীদেরও পরিমিত ভাত খাওয়ার নিয়ম মেনে চলা দরকার। কিন্তু মনে রাখবেন, সুষম খাদ্যতালিকায় প্রতিদিনের ক্যালরি চাহিদার ৫ থেকে ৬০ শতাংশ শর্করা থাকতে পারে। তবে ভাতের পরিবর্তে কম ক্যালরিযুক্ত অন্যান্য শর্করা খাওয়া ভালো। আমরা তো মেইন মিল বা দিনের প্রধান খাবার হিসেবে ভাত খেতে অভ্যস্ত। প্রশ্ন হলো, এই খাবারের বিকল্প হিসেবে কী খেতে পারি? সাদা ভাতের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (জিআই) বেশি বলে এটি শর্করা বাড়ায়। লাল চালের ভাতে কিন্তু জিআই কম। এ ছাড়া শকর্রা হিসেবে লাল আটার রুটি, চিড়া, মুড়ি, খই, ভুট্টা, ওটস, কর্নফ্লেক্স ইত্যাদি বেশ স্বাস্থ্যকর। পাস্তা ও নুডলসেও শর্করা বেশি থাকে। তবে আজকাল উচ্চ আঁশযুক্ত লালচে ‘লো জিআই পাস্তা’ বাজারে পাওয়া যায়। গ্রামে অনেকে ভাতের বদলে মিষ্টি আলু সেদ্ধ খান। এ আলু শর্করা হলেও এতে প্রচুর আঁশ থাকায় জিআই কম। শর্করা হিসেবে ক্যালরির মান কিন্তু ভাত, রুটি, নুডলস ইত্যাদিতে প্রায় সমান। যেমন ১২০ গ্রাম ভাতে আছে ১৪০ ক্যালরি, দুটো রুটিতে ১৫০ ক্যালরি। এক কাপ মুড়িতে ১১০ ক্যালরি, আধা কাপ নুডলসে ১০০ ক্যালরি। দুই টুকরো পাউরুটিতে একটু বেশি: ১৫৬ ক্যালরি। এক কাপ সেদ্ধ আলুতে ৮৫ ক্যালরি, ৩৫ গ্রাম ওটমিলে ১৩৬ ক্যালরি থাকে। তাই ভাতের পরিবর্তে সমপরিমাণ ক্যালরি হিসাব করে যেকোনো বিকল্প শর্করা খাওয়া যাবে। তবে যে শর্করা যত দ্রুত রক্তে মেশে, তত খারাপ। সে হিসেবে সাদা ভাত, সাদা ময়দার তৈরি খাবার, আলু, পাউরুটি ইত্যাদি তুলনামূলক দ্রুত শোষিত হয়ে রক্তে মেশে। আর এসব খাবারে আঁশের পরিমাণও কম।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>