ব্রণ নিয়ে এত দুঃশ্চিন্তা করার কী আছে? জেনে নিন সঠিক চিকিৎসা ও সমাধান

মুখভর্তি ব্রণ নিয়ে অনেকেরই মন খারাপ থাকে। একটা সেরে ওঠে, তো পাশে আরেকটা দেখা যায়। কোনোটা পেকে এমন হয় যেন এক্ষুনি ফেটে পুঁজ বেরোবে। আবার ব্রণ খোঁটাও মানা, এতে নাকি দাগ স্থায়ীভাবে বসে যাবে। কিন্তু আয়না দেখে খোঁটার জন্য যেন হাত নিশপিশ করে। এ জীবনে এ সমস্যা আর যাবে না, এমন ভেবে কেউ কেউ হয়তো হালই ছেড়ে দিয়েছেন।

ব্রণ: কেন, কীভাবে  বয়ঃসন্ধির সময়ই সাধারণত ব্রণের সমস্যাটি বেশি দেখা দেয়। ২০-২২ বছর বয়স পর্যন্ত এ সমস্যায় অনেকে ভোগে। মুখেই ব্রণ হয় বেশি। তবে পিঠ, বুক ও হাতের উপরিভাগে হওয়াও বিচিত্র নয়। ত্বকের তেলগ্রন্থি বা সেবাসিয়াস গ্রন্থির অতিকার্যকারিতার কারণে যদি অতিমাত্রায় তৈলাক্ত সেবাম তৈরি হতে থাকে, তবে তা একসময় গ্রন্থের মুখ বন্ধ করে দেয়। কখনো গ্রন্থি ফেটে গিয়ে প্রদাহ হয় ও গোটা হয়ে ফুলে ওঠে। হরমোনজনিত তারতম্যও ব্রণের জন্য দায়ী।

ব্ল্যাকহেড, হোয়াইট হেড  ব্রণ বিভিন্ন চেহারার হতে পারে। যেগুলোর মুখ কালো সেগুলো ব্ল্যাকহেড। আবার সাদা মুখ বা লাল (প্রদাহজনিত) মুখের ব্রণও হতে পারে। ব্রণে কখনো কখনো ব্যথা হতে পারে, পুঁজ হতে পারে এমনকি মাঝেমধ্যে গোটা থেকে সাদা ময়লার মতো বেরোতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পরে কালো দাগ ও ক্ষত হয়ে যায়।

ব্রণ নিয়ে নানা মিথ  খাবারের সঙ্গে ব্রণের কোনো সম্পর্ক নেই। তৈলাক্ত খাবার খেলেই যে ব্রণ হবে, এমন কোনো কথা নেই। তবে মোটা হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আছে। কেননা সেটা হরমোনজনিত হতে পারে। ব্রণ হলে বারবার মুখ ফেসওয়াশ বা স্ক্রাবার দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে, এ ধারণাও ভুল। বরং বেশি বেশি এভাবে ধুলে ত্বকের স্বাভাবিক তেল হারিয়ে প্রদাহ বেশি হতে পারে। মুখ মোছার তোয়ালে বা কাপড় সব সময় পরিচ্ছন্ন হতে হবে। এটা ঠিক যে ব্রণ খোঁটা উচিত নয়। এতে জীবাণু আরও ছড়াবে ও প্রদাহ বাড়বে।

ব্রণের চিকিৎসা আছে
ব্রণের চিকিৎসা প্রতিনিয়ত আধুনিকতর হচ্ছে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে ব্রণের প্রকার, আনুষঙ্গিক জটিলতা, রোগীর বয়স এবং সময়কাল বিবেচনা করা হয়। প্রথমত চিকিৎসায় বিভিন্ন ধরনের ক্রিম, যেমন: ইরাইথ্রোমাইসিন, ক্লিনডামাইসিন, এজিলিক অ্যাসিড, টেন্টনয়েন, বেনজাইল পারঅক্সাইড ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। কাজ না হলে বা রোগ তীব্র হলে এর পাশাপাশি মুখে খাবার ওষুধও, যেমন: এজিথ্রোমাইসিন, ডক্সিসাইক্লিন, ক্লিনডামাইসিন ইত্যাদি দেওয়া হয়। কখনো এরপরও ব্রণ হতে থাকে বা কখনো বড় গোটা বা ফোড়ার মতো দেখা যায়। সে ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর হলো আইসো টেট্রিনয়েন ক্যাপসুল। তবে এটি ব্যবহারে কিছু সতর্কতা জরুরি এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনোই ব্যবহারযোগ্য নয়। হরমোনজনিত সমস্যায় অ্যান্টিএন্ড্রোজেন দিয়েও চিকিৎসা করা হয়। এ ছাড়া ব্রণ চিকিৎসায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও বেড়েছে। বিশেষ করে ব্রণ-পরবর্তী দাগ বা ক্ষত সারাই করতে এগুলো কার্যকর। যেমন: মাইক্রোনিডলিং, মেসোথেরাপি, রেডিওফ্রিকোয়েন্সি, পিআরপি, মাইকোডার্মাব্রেশন, লেজার ইত্যাদি। মনে রাখবেন ব্রণের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি ও এতে ধৈর্য প্রয়োজন। আধাআধি চিকিৎসা করে ছেড়ে দেবেন না। [১]

ব্রণ এড়াতে  ১১ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের ব্রণের সমস্যা বেশি হয়ে থাকে। ছেলেদের ব্রণের মাত্রা বা তীব্রতা বেশি। অনেকের কাছে ব্রণ হয়ে ওঠে আতঙ্কের নাম। সব সময় চিকিৎসার প্রয়োজন না-ও হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই ব্রণ ভালো হয়ে যায় এবং এর দাগ নিয়ে দুশ্চিন্তারও কিছু নেই। যেসব ব্রণ শুকিয়ে যাওয়ার পর ত্বকে গর্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, সেগুলোর চিকিৎসা প্রয়োজন। আর যাদের খুব বেশি ব্রণ হয়, তাঁদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাসুদা খাতুন বলেন, ব্রণ থেকে দুই ধরনের সমস্যা হতে পারে। একটি হচ্ছে দাগ, অপরটি হচ্ছে ক্ষত সৃষ্টি হওয়া। ব্রণের দাগ ব্রণ ভালো হয়ে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে এমনিতেই চলে যায়। দাগ না চলে গেলে দাগ দূর করার ক্রিম ব্যবহার করা যেতে পারে। অতিরিক্ত রোদ ও গরমে ব্রণ বেশি হতে পারে।

ব্রণ প্রতিরোধে প্রতিদিনের অভ্যাস  ত্বক পরিষ্কার রাখতে হবে। বাইরে থেকে ফিরে অবশ্যই সাবান বা ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। কিছু কিছু সাবান ব্রণ রোধে সহায়ক। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে এ ধরনের সাবান ব্যবহার করতে পারেন। কখনোই ব্রণে নখ দিয়ে খোঁচাখুঁচি করবেন না। এমন করলে দাগ পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি।
১. প্রচুর পরিমাণ শাকসবজি ও ফলমূল খান।  ২. পর্যাপ্ত পানি পান করুন।  ৩. নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম প্রয়োজন। অনিদ্রায় যেমন ব্রণের * প্রবণতা বাড়ে, তেমনি অতিরিক্ত ঘুমের কারণেও ব্রণ হতে পারে।  ৪. দুশ্চিন্তামুক্ত জীবন যাপন করতে চেষ্টা করুন।

ব্রণ কেন খোঁচাবেন না  আয়নার সামনে দাঁড়ালে হাত নিশপিশ করে। পুঁজভর্তি পাকা পাকা গোটাগুলো নখ দিয়ে খুঁটতে মন চায়। সাবধান! মনকে আজই প্রবোধ দিন, ভুলেও আর ব্রণ খোঁচানো নয়। এতে জীবাণুর বিস্তারের সঙ্গে প্রদাহও বেড়ে যায়। অনেকের আবার ধৈর্য কম। পাকার আগেই কাঁচা ব্রণের ওপর হামলে পড়েন। নখ দিয়ে সেই কাঁচা ব্রণ খোঁটালে বিপদ আরও বাড়বে। ত্বকের অন্যখানে ব্রণের রস লেগে নতুন ব্রণের জন্ম হয়। এ ছাড়া খোঁচানোর কারণে ব্রণের ব্যাকটেরিয়া আশপাশে অন্য ব্রণগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। তাতে প্রতিনিয়তই নতুন নতুন ক্ষতের সৃষ্টি হয় এবং বাতাসে ভাসমান জীবাণু দ্বারা তা দ্রুতই সংক্রমিত হতে পারে। এই বদভ্যাসের জন্য আপনি আরও খারাপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারেন।
শুধু নখ দিয়ে খোঁটা নয়, ব্রণ আঙুলের চাপে ফাটানোর বদভ্যাসও আছে অনেকের। ফাটা ব্রণ থেকে নির্গত রক্ত ও রক্তরস মুখে ক্ষত ও দাগের সৃষ্টি করে। ব্যাকটেরিয়া ত্বকের গভীরে প্রবেশ করা মাত্র রক্তের শ্বেতকণিকা দ্রুত সেই ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করতে চায়। এতে ত্বকের স্বাভাবিক গঠনতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ত্বক তার নিজস্ব শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় ব্যাকটেরিয়াকে ক্রমাগত ঠেলে বের করে দিতে চায়। এ পরিস্থিতিতে আপনার পূর্বের ব্রণটি আরও ফুলে ফেঁপে একটি ব্যথাযুক্ত বড় ব্রণে পরিণত হয়ে ওঠে। এরপর খোঁটানো না থামালে সেই ব্যথাযুক্ত ব্রণ শক্ত দানাদার গোটা মানে ‘সিস্ট’-এ পরিণত হয়। এ পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>