গেঁটে বাত হলে কী করবেন? জেনে নিন চিকিৎসা ও সতর্কতা!

Share This
Tags

গেঁটে বাত বা গাউট (Gout) প্রদাহজনিত একটি রোগ। সাধারনত না খাওয়া, অভাবী বা অপুষ্টির শিকার মানুষেরা এ রোগে আক্রান্ত হয় না। তাই এটাকে ধনীদের রোগও বলা হয়ে থাকে। এতে সাইনোভিয়াল অস্থিসন্ধি বা এর আশেপাশের টিস্যুতে মনোসোডিয়াম ইউরেট মনোহাইড্রেট ক্রিস্টাল জমা হয়ে প্রদাহের সৃষ্টি করে। সাধারণত এ রোগে মহিলাদের তুলনায় পুরুষেরা ৫ গুণ বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। এটি পুরুষ এবং বৃদ্ধা মহিলাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে লক্ষণীয় প্রদাহজনিত আর্থ্রাইটিস। এ রোগে পুরুষেরা সাধারণত ৩০ বছরের বেশি বয়সে এবং মহিলারা মেনোপজের পর বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। আবার এটি ষাট বা সত্তর বছর বয়সেও হতে পারে। সাধারণভাবে বয়স বৃদ্ধি ও রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে এ রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের স্বাভাবিক মাত্রা হলো পুরুষের ক্ষেত্রে ২.০-৭.০ mg/dL ও নারীদের ক্ষেত্রে ২.০-৬.০ mg/dL। মহিলাদের তুলনায় পুরুষদের ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বেশি থাকে তবে বয়স ও ওজনের সাথে সাথে রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রাও বাড়ে।

কেন হয়?  গেঁটে বাত একপ্রকার সিনড্রোম, যা ইউরেট নামের একধরনের লবণদানা জমে জোড়া বা সঞ্চিত সৃষ্ট প্রদাহ, যা শরীরের রক্তের প্লাজমায় অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিডের উপস্থিতির ফলে ঘটে থাকে। গেঁটে বাত স্বল্পকালীন তীব্র প্রদাহ বা দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ—এই দুই প্রকারের হতে পারে। আবার যে কারণে রক্তের ইউরেট লবণ বেড়ে যায়, তা বিভিন্ন কারণে হতে পারে, যেমন পারিপার্শ্বিক বা পরিবেশগত কারণ, ব্যক্তির খাদ্যাভ্যাসের কারণে বা ব্যক্তির জন্মগত ত্রুটির কারণে, যাকে জেনেটিক কারণও বলা যায়। অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিড দেহে দুইভাবে জমতে পারে। যেমন অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিড উৎপাদন ও ইউরিক অ্যাসিড দেহ থেকে নির্গত হতে বাধাপ্রাপ্ত হওয়া। ইউরিক অ্যাসিড দেহ থেকে সাধারণত কিডনির সাহায্যে বের হয়। কোনো কারণে, বিশেষ করে কিডনির রোগের কারণে কিডনির কর্মক্ষমতা হ্রাসে অসুবিধা হতে পারে। গেঁটে বাত প্রধানত দুই রকমের হতে পারে। যেমন- প্রাইমারি গাউট (এটি প্রধানত ছেলেদের ক্ষেত্রে বিশেষ করে ৪০ বছর বয়সের বেশি বয়সে এই রোগে আক্রান্তের ঝুঁকি বেড়ে যায় এবং প্রদাহজনিত কারণেই সাধারনত এই রোগের সৃষ্টি হয়) এবং সেকেন্ডারি গাউট (এটি মহিলাদের ক্ষেত্রে বেশি হয় বিশেষ করে ৬৫ বছরের বেশি বয়সে এর ঝুঁকি বাড়ে এবং এটি মূলত কিডনি বিকলতার কারণে কিংবা কোন ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ফলে হতে পারে)।

গেঁটে বাত রোগটির উপস্থিতি প্রাথমিক পর্যায়ে খুব বেশি অনুভব করা যায় না। গেঁটে বাত মূলত শরীরের জয়েন্টগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সাধারণত হঠাৎ করেই এর লক্ষণ প্রকাশ পায় এবং ২-৬ ঘণ্টার মাঝে এর তীব্রতা প্রকাশ পায়। শরীরের জোড়াস্থানগুলো ফুলে যায়, লাল হয়ে যায় এবং যন্ত্রণা করে। সচরাচর সকালে ঘুম থেকে উঠার পর হঠাৎ করে রোগী এ ব্যথা অনুভব করেন। এটি সাধারণত পায়ের বুড়ো আঙুলে অথবা হাঁটুতে বেশি হয়ে থাকে। এ ছাড়াও এটি গোড়ালির জয়েন্ট, মধ্য পায়ের জয়েন্ট, হাঁটুর জয়েন্ট, হাতের ছোট ছোট জয়েন্ট, কব্জির জয়েন্ট বা কনুইর জয়েন্টেও হতে পারে। আবার পরবর্তী ৫ থেকে ১০ দিনের মধ্যে এ রোগটি আপনা আপনি সেরেও যেতে পারে। কিন্তু কখনও কখনও এক ধরনের নকল গেঁটে বাত ধোকা দিতে পারে এবং ঝামেলা বাড়তে পারে। এতেও গিরা ফুলে যায়, লাল হয় বা ব্যথা হয়। যদিও সব লক্ষণগুলো একই রকমের, কিন্তু চিকিৎসক যদি পরীক্ষাগারে কোনো রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই এই নকল গেঁটে বাতের লক্ষণগুলো শুনে চিকিৎসাপত্র দিয়ে দেন তবে সেক্ষেত্রে সমস্যা বাড়তে পারে।

প্রধান প্রধান লক্ষণ বা উপসর্গসমুহ নিম্নে বর্ণনা করা হল:  ১. হঠাৎ ব্যথা শুরু হয়ে ২ থেকে ৬ ঘন্টার মধ্যে তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।  ২. প্রায়শই ভোরবেলায় তীব্র ব্যথায় রোগীর ঘুম ভেঙ্গে যেতে পারে।  ৩. এর সাথে জ্বর ও অবসাদগ্রস্ততা থাকতে পারে।  ৪. ব্যথা কমে গেলে আক্রান্ত স্থান চুলকায় ও চামড়া উঠে যেতে পারে।  ৫. ব্যথা এতই তীব্র হয় যে রোগী পায়ে মোজা পরতে পারেনা, আক্রান্ত জয়েন্ট বেশ ফুলে যায় এবং চামড়া চকচকে লাল হয়ে যায়।  ৬. ৫ থেকে ৬ দিন পর এমনিতেই ভালো হয়ে যায়।  ৭. কেউ কেউ একবার আক্রান্ত হবার পর দ্বিতীয়বার আর আক্রান্ত হয় না আবার অনেকেই কয়েক বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হতে পারে।  ৮. এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হলে সেক্ষেত্রে ক্রনিক গাউটে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং এতে জয়েন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হবার আশঙ্কা থাকে।  ৯. দীর্ঘদিন রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বেশি থাকলে কিডনিতে পাথর হতে পারে।  ১০. জয়েন্ট ও এর আশেপাশের টিস্যুতে ক্রিস্টাল জমা হয়ে নডিউল বা দলা বা টোফাস তৈরি করতে পারে। আবার টোফাসে ঘা হতে পারে, সংক্রমণ হতে পারে কিংবা প্রদাহের ফলে পুঁজ বের হতে পারে।

কিভাবে হয়: রক্তে যখন ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে যায়, তখন ধীরে ধীরে এই বেড়ে যাওয়া অ্যাসিড অল্প অল্প করে শরীরের বিভিন্ন খাঁজে বা পকেটগুলোয় জমা হতে থাকে এবং ক্রিস্টালের আকার ধারণ করে। পরবর্তীতে একদিন হঠাৎ করে জয়েন্ট ফুলে উঠে, লাল হয়ে যায় এবং তীব্র ব্যথা হয়। ইউরিক অ্যাসিডের ক্রিস্টালগুলো দেখতে সুঁচের মতো হওয়ায় তীব্র যন্ত্রণা হয়ে থাকে। আবার শরীরের রক্তে এই ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে গেলেই যে সবসময় গেঁটে বাত হবে এমনটি নয়। কারণ- এই ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ স্বাভাবিকের চাইতে বেড়ে গিয়ে যদি দেহের কিডনিতে জমা হলে তা থেকে হতে পারে কিডনিতে পাথর হতে পারে, আবার ত্বকের নিচে জমা হলে তা থেকেও এ রকম বাত হতে পারে।

গিঁটের ব্যথা ও অন্যান্য বাতের ব্যথা আলাদা করার উপায় কী?  সহজেই আলাদা করা যায়। এটি মধ্যবয়স্ক পুরুষদের বেশি হয়। আরও কিছু বৈশিষ্ট্য, যেমন পায়ের গোড়ালির জয়েন্ট ফুলে যাওয়া, তীব্র ব্যথা হওয়া ইত্যাদি। মজার বিষয় হলো, যদি গিঁটের বাতের রোগীকে চিকিৎসা না দেওয়া হয়, তাহলে দেখা যাবে প্রথম প্রথম তিন থেকে সাত দিন বা দশ দিনের মধ্যে ব্যথাটি চলে যাবে। ফোলাটাও কমে আসবে। এত তীব্র ব্যথা হয় যে ব্যথানাশক ওষুধ দিতেই হবে। আর বাতজ্বর যেমন ছোট বয়সে হয়, ৫ থেকে ১৫ বছরে হয়, ক্ষেত্রবিশেষে একটু বড়দেরও হতে পারে। কিন্তু সেটার আশঙ্কা কম। বাচ্চাদের জন্য সেটা প্রযোজ্য। সেই বাতজ্বরের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অল্প দিনের মধ্যে জয়েন্টের ব্যথাগুলো চলে যাবে, থাকবে না। আর অন্য যে বাতগুলো যে জয়েন্টগুলোকে আক্রমণ করবে এবং সেখানেই থাকতে চাইবে।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>