ফরমালিন যুক্ত খাবার খেয়ে পাকস্থলী ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার আগেই সচেতন হোন

ফরমালিন নিয়ে কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশে বেশ হইচই চলছে। এটি মেশানো হচ্ছে নানা খাদ্যদ্রব্যে আর এতে করে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। আজকের আয়োজনে আসুন জেনে নিই ফরমালিনের স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলো।

ফরমালিন কী: ফরমালিন (-CHO-) হলো ফরমালডিহাইডের (CH2O) পলিমার। ফরমালডিহাইড দেখতে সাদা পাউডারের মতো। এটি পানিতে সহজেই মিশে যায়। শতকরা ৩০ থেকে ৪০ ভাগ ফরমালিনের জলীয় দ্রবণকে ফরমালিন হিসেবে ধরা হয়। এ রাসায়নিক পদার্থটি সাধারণত টেক্সটাইল, প্লাস্টিক, রঙ, কনস্ট্রাকশন, পেপার তৈরি ও মৃতদেহ সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়। ফরমালিনে ফরমালডিহাইড ছাড়াও মিথানল থাকে, যা শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এটি লিভার বা যকৃতে মিথানল এনজাইমের উপস্থিতিতে প্রথমে ফরমালডিহাইড এবং পরে ফরমিক এসিডে পরিবর্তিত হয়। এ দুই পদার্থই শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

ফরমালিনের কারণে স্বাস্থ্যের ক্ষতিকর দিক: ১.ফরমালিনে অবস্থিত ফরমালডিহাইড চোখের রেটিনাকে আক্রান্ত করে এবং রেটিনার কোষ ধ্বংস করে। এর ফলে মানুষকে অন্ধত্ববরণ করতে হতে পারে। ২. ফরমালিন, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, কারবাইডসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহারের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে পেটের ব্যথা, হাঁচি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, বদহজম, ডায়রিয়া, আলসার, চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগ হতে পারে। ৩. ফরমালিন ধীরে ধীরে দেহের লিভার, কিডনি, হৃৎপিন্ড ও মস্তিষ্কসহ সব কিছুুকেই আক্রান্ত করতে পারে। এটির কারণে লিভার ও কিডনি নষ্ট হয়। ৪. ফরমালিন মস্তিষ্কের কোষগুলোকে অকেজো করে দেয় এবং এটির কারণে স্মৃতিশক্তি কমে যায়। ৫. ফরমালিন মানুষের চামড়ায় নানা রোগের সংক্রমণ ঘটায় এবং চামড়ার ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। ৬. ফরমালিনযুক্ত খাবার খাওয়ার ফলে পাকস্থলী, ফুসফুস ও শ্বাসনালিতে ক্যান্সার হতে পারে। ৭. ফরমালিন হাড়ের অস্থিমজ্জাকে আক্রান্ত করে, ফলে দেহে রক্ত উৎপাদন কমে গিয়ে রক্তশূন্যতাসহ রক্তের অন্যান্য রোগ দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত ব্লাড ক্যান্সারও হতে পারে। ৮. মানবদেহে ফরমালিন ফরমালডিহাইড ফরমিক এসিডে রূপান্তরিত হয়ে রক্তের এসিডিটি বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে শ্বাস-প্রশ্বাস অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করে। ৯. ফরমালিনযুক্ত খাবার গর্ভবতী মায়েদের গর্ভের সন্তানকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। এর কারণে সন্তান জন্ম দেয়ার সময় নানা জটিলতা দেখা দেয়। বাচ্চার জন্মগত বিকলাঙ্গতাসহ প্রতিবন্ধী শিশুর জন্ম হতে পারে। ১০. ফরমালিনসহ যে কোনো রাসায়নিক পদার্থ সব বয়সী মানুষের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি পরিবারের শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে। ফরমালিনযুক্ত দুধ, মাছ, ফলমূল এবং বিষাক্ত খাবার খাওয়ার ফলে শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে ও শিশুদের বুদ্ধিমত্তা দিন দিন কমছে।  বর্তমানে বাংলাদেশে এক আতঙ্কের নাম ফরমালিন। ফল থেকে শুরু করে মাছ, ইদানীং শোনা যাচ্ছে দুধেও ফরমালিন মেশানো হচ্ছে। যে রাসায়নিক পদার্থটি হাসপাতালের মর্গে লাশ পচনরোধে ব্যবহার করা হয়, সেই পদার্থটি আমরা মাছ, ফল কিংবা দুধ সতেজ রাখতে ব্যবহার করছি। বিবেকবর্জিত এ কাজটি যারা করছেন তাদের ছেলেমেয়েসহ নিজেরাও কিন্তু সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমান স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। ফরমালিনের ব্যবহার আমাদের দেশে এতটাই ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে গেছে, যা অকল্পনীয়। তাই ফরমালিনমুক্ত খাবার পেতে আমাদের প্রয়োজন একটি সামাজিক আন্দোলন। সেই সঙ্গে যে যেখানে আছি, সেখান থেকেই সবাইকে ফরমালিনের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে জানাতে হবে এবং সচেতন করতে হবে। [১]

ফরয়ালিন যুক্ত খাবার দাবার চেনার কয়েকটি উপায়: ১. ফলের গায়ে মাছি বসবেনা। ২. ফল গাছ পাকা হলে লক্ষ করে দেখবেন যে ফলের শরীরে এরকম সাদাটে ভাব থাকে কিন্তু ফরমালিন বা অন্য কোন রাসয়নিক এ চুবানো ফল ঝকঝকে সুন্দর হবে। ৩. কারবাই বা অন্য কিছু দিয়ে পাকানো ফলের শরীর হয় মুলায়েম ও দাগহীন কেন না ফলগুলো কাঁচা অবস্থাতে ফরমালিন বা বিষাক্ত ক্যমিকেল দিয়ে পাকানো হয় গাছ পাকা ফলের ত্বকে দাগ পড়বেই। গাছ পাকা ফলের ত্বকে রং ভিন্নতা থাকবে গোড়ার দিকে গাঢ় রং হবে সেটাই স্বাভাবিক। ৪. কারবাইট দেওয়া ফলের আগা গোড়া হলদেটে হয়ে যায়। কখনো-কখনো বেশী দেওয়া হলে সাদাটে হয়ে যায়। ৫. ফল গাছ পাকা হলে নাকের কাছে আনলেই তার আসাধারণ ঘ্রাণ পাওয়া যায়, ফরমালিন বা বিষাক্ত ক্যমিকেল দিয়ে পাঁকালে কোন গন্ধ থাকবে না। ৬. ফল মুখে দেওয়ার পর যদি কোন স্বাদ নেই, কিংবা ফলের টক/মিষ্টি কোনটাই নেই, বুঝবেন যে এ ফলে ফরমালিন বা বিষাক্ত ক্যমিকেল দেওয়া হয়েছে, ফল কেনার পর যে খানে আলো বাতাস নেই সেখানে কিছুক্ষন ফল গুলো রেখে দিন, গাছ পাকা হলে চারপাশে গন্ধ ছড়াবে, ফরমালিন বা বিষাক্ত ক্যমিকেল দেয়া থাকলে গন্ধ ছড়াবে না।

খাবারের ফরমালিন দূর করবেন যেভাবে: বাংলাদেশে ফরমালিন ছাড়া খাবার জাতীয় কোনো কিছু বাজারে পাওয়া খুব কষ্টসাধ্য ব্যাপার। ফরমালিনযুক্ত খাবার খেয়ে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রতিদিন যদিও সুষম খাদ্য খাওয়া উচিত। তবে ভয়ঙ্ককর ব্যাপার হচ্ছে, মাছ, ফল ও সবজি সুস্বাস্থ্যের পরিবর্তে উল্টো আমাদের স্বাস্থ্যহানি করে। কারণ ফরমালিনযুক্ত খাবার বাজারে সয়লাব। এছাড়া বাজারের বেশিরভাগ ফল ও শাক-সবজি রাসায়নিকে ভরপুর। আমরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রতিদিন বিষ খেয়ে চলেছি। যা থেকে হতে পারে বিভিন্ন রোগ। আসুন জেনে নেই কীভাবে ঘরোয়া পদ্ধতিতে মাছ, ফল ও সবজি থেকে বিষ দূর করতে পারবেন।

মাছ ১ ঘণ্টা মাছ পানিতে ডুবিয়ে রাখলে শতকরা ৬০ ভাগ ফরমালিন নষ্ট হয়ে যায়। সবচেয়ে ভালো হয় ভিনেগার মিশ্রিত পানিতে ১৫ মিনিট মাছ ডুবিয়ে রাখলে শতকরা ১০০ ফরমালিন নষ্ট হয়ে যায়। মাছের শরীর থেকে ফরমালিন দূর করতে মাছটি অন্তত এক ঘণ্টা ঠাণ্ডা পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এতে করে মাছের শরীরে যে ফরমালিন থাকে, সেটি প্রায় ৬১ শতাংশ কমে গেছে। আরও একটি কার্যকর উপায় হলো, মাছটি রান্না করার আগে কমপক্ষে এক ঘণ্টা লবণ পানিতে ডুবিয়ে রাখা। এতে করে মাছের ফরমালিনের পরিমাণ প্রায় ৯০ শতাংশ কমে যাবে। আরেকটি কার্যকর পদ্ধতি হচ্ছে, আপনি যখন চাল ধুবেন এবং প্রথমবার চাল ধোয়ার সময় যে পানি বের হবে সেটি দিয়ে প্রথমে মাছটি ধুয়ে নিন। এরপর আবার সাধারণ পানি দিয়ে ধুবেন। দেখবেন এতে করে প্রায় ৭০ শতাংশ ফরমালিন দূর হয়ে যাবে। আমাদের দেশে এখন শুঁটকি মাছেও প্রচুর পরিমাণে ফরমালিন মেশানো হচ্ছে। শুঁটকি মাছ থেকে ফরমালিন দূর করতে ঠিক একই রকম পন্থা অবলম্বন করবেন। প্রথমে ১ ঘণ্টা লবণ মিশ্রিত হালকা গরম পানিতে পরে ১০ মিনিট ঠাণ্ডা পানিতে ডুবিয়ে রেখে ধুয়ে ফেলুন। এতে করে ফরমালিন তো দূর হবেই পাশাপাশি মাছের স্বাদও বাড়বে।

সবজি সবজি রান্না করার আগে ১০ মিনিট লবণ গরম পানিতে ডুবিয়ে রাখুন। সবজিকে ফরমালিনমুক্ত করার সব চাইতে ভালো পদ্ধতি হলো- ভিনেগার ও পানির মিশ্রণে (পানিতে ১০% আয়তন অনুযায়ী) ১৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখা। এতে প্রায় ১০০ ভাগ ফরমালিন দূর হয়। কোনো ফলমূল খাবার আগে সেটি হালকা গরম এবং লবণ মিশ্রিত পানিতে ১০ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন। এতে করে ফরমালিনের পরিমাণ প্রায় ৯৮ শতাংশ দূর হবে। অনেক সময় ফলমূলে বিশেষ করে আম, লিচুতে স্প্রে করার মাধ্যমে ফরমালিন দেয়া হয়। সেজন্য গাড় বা উজ্জল রঙের ফল কেনা থেকে বিরত থাকুন।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>