মাশরুমের অসাধারন সকল স্বাস্থ্য উপকারিতা ও গুরুত্ব !

মাশরুমকে আমরা সবাই চিনি ছত্রাক জাতীয় উদ্ভিদ হিসেবে। একই সঙ্গে এটি অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর খাবার। দেহের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস দমনে মাশরুমের জুড়ি নেই। এতে রয়েছে প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেল, অ্যামিনো অ্যাসিড, অ্যান্টি বায়োটিক ও অ্যান্টি অক্সিডেন্ট। নিরামিষভোজিদের জন্য এটা একটা মজাদার খাবার। পাশাপাশি মাশরুম পাসতা, ওমলেট, বিফ রোল, চিকেন স্যান্ডউইচ কিংবা ফিশ ফ্রাইয়ে ব্যবহার করলে স্বাদের সাথে বাড়ে খাবারের পুষ্টিগুণ।

মাশরুমের পুষ্টিমান: আমরা দৈনন্দিন যেসব খাবার গ্রহণ করে থাকি সেগুলোর চেয়ে মাশরুমের পুষ্টিগুণ তুলনামূলকভাবে বেশি বলে এটি শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে শরীর সুস্থ সবল রাখতে সাহায্য করে। মাশরুমের পুষ্টি ভ্যালু তুলনামূলকভাবে অত্যধিক এবং এই প্রোটিন অতি উন্নতমানের এবং মানবদেহের জন্য অতিশয় উপকারী। একটি পরিপূর্ণ প্রোটিনের পূর্বশর্ত হলো মানবদেহের অত্যাবশ্যকীয় ৯টি অ্যাসিডের পরিমাণের উপস্থিতি। মাশরুমে অতীব প্রয়োজনীয় এই ৯টি এমাইনো অ্যাসিড বিদ্যমান। মাশরুমে খনিজ পদার্থের পরিমান মাছ ও মাংসের তুলনায় বেশী এবং প্রচলিত সবজীর তুলনায় প্রায় দ্বিগুন। মাশরুমে আমিষের পরিমান আলু থেকে দ্বিগুন, টমেটো থেকে চারগুন এবং কমলা লেবুর থেকে ছয়গুন বেশী। পুষ্টির বিচারে মাশরুম নিঃসন্দেহে সবার সেরা। কারণ আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় যেসব উপাদান অতি প্রয়োজনীয় যেমন– প্রোটিন, ভিটামিন ও মিনারেল সেগুলো মাশরুমে উচ্চ মাত্রায় আছে। অন্যদিকে যেসব খাদ্য উপাদানের আধিক্য আমাদেরকে জটিল ব্যাধীর দিকে নিয়ে যায়, যেমন -ফ্যাট ও কার্বোহাইড্রেড তা মাশরুমে নেই বললেই চলে। প্রতি ১০০ গ্রাম শুকনা মাশরুমে নিম্নলিখিত পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়।

প্রতি ১০০ গ্রাম শুকনা মাশরুমের পুষ্টিগুণ:
আমিষ ২৫-৩৫ গ্রাম, ভিটামিন ৫৭-৬০ গ্রাম, শর্করা ৫-৬ গ্রাম, চর্বি ৪-৬ গ্রাম।

প্রোটিন মূল্য: মাশরুমের প্রোটিন হল অত্যন্ত উন্নত, সম্পূর্ণ এবং নির্দোষ।একটি সম্পূর্ণ প্রোটিনের পূর্বশর্ত হলো মানব দেহের অত্যাবশ্যকীয় ৯টি এমাইনো এসিডের উপস্থিতি। মাশরুমে অপরিহার্য এ ৯টি এমাইনো এসিডই প্রশংসনীয় মাত্রায় আছে। অন্যান্য প্রাণীজ আমিষ যেমন-মাছ, মাংস, ডিমের আমিষ উন্নতমানের হলেও তার সঙ্গে সম্পৃক্ত চর্বি থাকায় তা গ্রহণে দেহে কোলেস্টরল সমস্যা দেখা দেয়। যার ফলে উচ্চ রক্তচাপ,হৃদরোগ,মেদভূড়ি ইত্যাদি জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পক্ষান্তরে মাশরুমের প্রোটিন নির্দোষ। তাছাড়াও প্রোটিনের বিপরীতে ফ্যাট এবং কার্বো-হাইড্রেটের সর্বনিম্ন উপস্থিতি এবং কোলেস্টরল ভাঙ্গার উপাদান লোভাস্টাটিন, অ্যান্টাডেনিন, ইরিটাডেনিন ও নায়াসিন থাকায় কোলেস্টরল জমার ভয় থাকে না। এ কারণে প্রোটিনের অন্যান্য সব উৎসের তুলনায় মাশরুমের প্রোটিন সর্বোৎকৃষ্ট ও নির্দোষ।  ফ্যাট মুল্য: মাশরুমের ফ্যাট অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড দ্বারা তৈরি যা শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী।এছাড়া স্ফিঙ্গলিপিড ও আরগেস্টেরল থাকায় এর মানকে আরও উন্নত করেছে।স্ফিঙ্গলিপিড থাকায় হাড়ের মজ্জা ও ব্রেন ডেভেলপমেন্টে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং আরগেস্টেরলের উপস্থিতির কারণে ভিটামিন-ডি সিনথেসিসে সহায়ক হয় যা হাড় ও দাঁত তৈরি এবং ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়তা করে। এছাড়া মাশরুমের ফ্যাটে ৭০-৮০% লিনোলিক এসিড আছে যা শরীর সুস্থ্য রাখতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখে।  কার্বোহাইড্রেট মূল্য: আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় কার্বোহাইড্রেট গ্রহণের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি যা সম্পূর্ণ খরচ না হয়ে শরীরে জমা হয় এবং নানা ধরণের স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করে। মাশরুমে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ কম এবং তা পানিতে দ্রবনীয়। ফলে মাশরুমের কার্বোহাইড্রেড শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এছাড়া এরমধ্যে অধিকাংশ পলিস্যাকারাইড যেমন- গ্লাইকোজেন, বেটা-ডি গ্লুক্যান, ল্যাম্পট্রোল, লোভাস্টাটিন, অ্যান্টাডেনিন, ইরিটাডেনিন, ট্রাইটারপিন, অ্যাডিনোসিন,ইলুডিন প্রভৃতি থাকায় দেহের জটিল রোগ নিরাময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া মাশরুম এ্যাসিডিক সুগার ও এ্যাসিডিক পলিস্যাকারাইড বিশেষ করে এইচ৫১ সরবরাহ করে। মাশরুমে আঁশের পরিমাণও বেশি।জাত ভেদে ১০-২৮% আঁশ পাওয়া যায়। ফলে ডায়াবেটিকস রোগীদের ইনসুলিনের চাহিদা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মাশরুমে ভিটামিন ও মিনারেল:
মানবদেহের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা সৃষ্টি করাই ভিটামিন ও মিনারেলের প্রধান কাজ। শরীরের চাহিদামতো প্রতিদিন ভিটামিন ও মিনারেল খেতে না পারলে শরীরের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা ক্রমশ দুর্বল হয়ে নানারূপ জটিল রোগে আক্রান্ত হয়। প্রাকৃতিকভাবে মাশরুমেই সবচেয়ে বেশি ভিটামিন ও মিনারেল বিদ্যমান।

মাশরুমের শারীরিক উপকারিতা
মাশরুম শুধু মুখরোচক খবারই নয় বরং এটি আমাদের নানা শারীরিক সমস্যাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। চলুন জেনে নেওয়া যাক তেমন কিছু উপকারিতার ফিরিস্তি।

১ বিশুদ্ধ সবজি হিসেবে মাশরুমের ব্যবহার: ভিটামিন ও মিনারেলই মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরিতে সাহায্য করে থাকে। শাকসবজি এবং ফলমূলে ভিটামিন ও মিনারেলের পরিমাণ বেশি। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, সুস্থ সবল জীবনযাপনের জন্য একজন মানুষের দৈনিক ২০০-২৫০ গ্রাম সবজি এবং ফল-ফলাদি খেতে হয়। এই পরিমাণমতো খাওয়া আমাদের অনেকের পক্ষে সম্ভবপর হয় না, যে কারণে আমরা অপুষ্টি ও বিভিন্ন রোগে ভুগী।  ২ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে: মাশরুম মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। প্রাকৃতিকভাবে মাশরুমেই সবচেয়ে বেশি ভিটামিন ও মিনারেল এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বিদ্যমান। মানবদেহের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা সৃষ্টি করাই ভিটামিন, মিনারেলের ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এর প্রধান কাজ। মাশরুমে এডিনোসিন থাকায় রক্ত কনিকায় ভারসম্য রক্ষা করে , ফলে এটি ডেঙ্গু জ্বরের প্রধিরোধক হিসেবে কাজ করে। মাশরুমে নিউক্লিক এসিড এবং এন্টি এলার্জেন থাকায় কিডনি রোগ এবং এলার্জি রোগের প্রতিরোধক। নিয়তিম অন্যান্য শাকসবজির পাশাপাশি এটি যেমন আমাদের রোগ প্রতিরোধ করবে তেমনি প্রতিষেধক হিসিবেও কাজ করবে। মানব দেহের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা সৃষ্টি করাই ভিটামিন ও মিনারেলের প্রধান কাজ। শরীরের চাহিদামতো প্রতিদিন ভিটামিন ও মিনারেল খেতে না পারলে শরীরের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা ক্রমশ দুর্বল হয়ে নানারূপ জটিল রোগে আক্রান্ত হতে হয়। প্রাকৃতিকভাবে মাশরুমেই সবচেয়ে বেশি ভিটামিন ও মিনারেল বিদ্যমান। মাশরুমে আছে প্রচুর ক্যালসিয়াম, আয়রন, পটাসিয়াম ও সেলেনিয়াম। সেলেনিয়াম উপাদানটি শুধু মাছেই পাওয়া যায়। যারা পুরোপুরি নিরামিষভোজী তারা মাশরুমের মাধ্যমে এ উপকারী উপাদানটি গ্রহণ করতে পারেন। মাশরুমে আরও আছে এরগোথিওনেইন নামে এক ধরনের শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা মানব দেহের জন্য ঢালের মতো কাজ করে।  ৩ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে: মাশরুমে সোডিয়ামের পরিমাণ খুবই কম থাকে। এবং এতে উচ্চমাত্রার আঁশ এবং প্রচুর পরিমাণে পটাসিয়াম থাকে যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং হৃদপিণ্ডের কাজে সহায়তা করে। মাশরুমে স্ফিঙ্গ লিপিড এবং ভিটামিন বি-১২ বেশি থাকায় স্নায়ুতন্ত্র ও স্পাইনাল কর্ড সুস্থ রাখে। তাই হাইপার টেনশন দূর হয়, মেরুদণ্ড দৃঢ় হয় এবং ব্রেইন সুস্থ থাকে।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>