মানব দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ পায়ের বিভিন্ন সমস্যা ও সমাধান

Share This
Tags

পা আমাদের দেহের অন্যতম প্রধান অঙ্গ। দেহের ভার বহন থেকে শুরু করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার জন্য পায়ের ভূমিকার কথা বিস্তারিত বলার অবকাশ নেই। যে ব্যক্তির পা নেই কেবল তিনিই পা না থাকার যন্ত্রণা বুঝতে পারেন। দেহের অন্যান্য অঙ্গের মত পাও নানা রকম অসুস্থতা বা রোগাক্রান্ত হয়। এসব রোগ দ্রুত আমলে না নিলে পঙ্গুত্বও বরণ করতে হতে পারে। আবার পায়ের এসব সমস্যা দেহের অন্যান্য রোগের লক্ষণ বা উপসর্গ হিসাবেও দেখা দিতে পারে। তাই আসুন জেনে নেই পায়ের এমন কিছু সমস্যা এবং সমাধান সম্পর্কে।

পা যদি ফুলে যায়
পায়ে পানি এলে ফুলে যায়। এ সমস্যার নেপথ্যে সব সময় যে জটিল কারণ থাকে, তা নয়। তবে পা ফুলে গেলে তার সঠিক কারণ বের করতে হবে।
দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে বা বসে থাকলে অথবা দীর্ঘ ভ্রমণে পা ফুলে যেতে পারে। একটানা দাঁড়িয়ে বা বসে থাকার মাঝে বিরতি দিতে হবে। অনেকক্ষণ বসে কাজ করলে পায়ের নিচে টুল দিন। বসে বসেই পায়ের আঙুলগুলো মাঝে মাঝে নাড়াতে পারেন।  গর্ভাবস্থায় পা ফোলা স্বাভাবিক। কিন্তু এর সঙ্গে প্রস্রাবে অ্যালবুমিন গেলে এবং উচ্চ রক্তচাপ দেখা দিলে তা চিন্তার কারণ হতে পারে। তাই সমস্যাটি চিকিৎসককে জানান। কিছু ওষুধ (যেমন: ব্যথানাশক, ইনসুলিন, উচ্চ রক্তচাপে ব্যবহৃত ওষুধ, জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি) গ্রহণের প্রভাবেও পায়ে পানি আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ পরিবর্তন করতে হবে। শরীরের বাড়তি ওজন কমান। কেবল ওজনের কারণেও পা ফুলতে পারে। কিডনির জটিলতায় প্রথমে মুখে পানি আসে, তারপর পা ফোলে। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের পায়ে পানি জমলে কিডনি পরীক্ষা করানো উচিত। যকৃতের সমস্যায়ও পায়ে পানি আসে, সঙ্গে পেটও ফুলে যেতে পারে। জন্ডিস, শারীরিক দুর্বলতা, ওজন হ্রাস, অরুচি থাকতে পারে। হৃদ্রোগজনিত কারণে পায়ে পানি এলে সঙ্গে থাকে বুক ধড়ফড় ও শ্বাসকষ্টের সমস্যা। থাইরয়েড হরমোনের সমস্যায় পা ফুলতে পারে। ওজন বৃদ্ধি, অনিয়মিত মাসিক, কোষ্ঠকাঠিন্য ইত্যাদি থাকলে থাইরয়েড পরীক্ষা করান। তা ছাড়া মারাত্মক রক্তশূন্যতা বা অপুষ্টি, ফাইলেরিয়া, ভেরিকোস ভেইন, পেটের টিউমার, পায়ে আঘাত বা সংক্রমণের ফলে পা ফুলতে পারে। কারণ যা-ই হোক না কেন, দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

পা জ্বালাপোড়া:  ‘‘বার্নিং ফুট সিনড্রোম’’ হলো পা জ্বালাপোড়া ও অতিরিক্ত ভার এ ধরনের এক অনুভূতি। এ সমস্যায় যে কেউ ভুগতে পারে। তবে ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সে এবং ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে যে কেউ এ রোগে আক্রান্ত হয়। পুরুষের তুলনায় মহিলারা বেশি ভোগে। পায়ের তলা ছাড়াও গোড়ালি, পায়ের উপরিভাগ ও লেগে জ্বালাপোড়া ও ব্যথা হতে পারে। অনেক সময় পায়ের রং পরিবর্তন হয়, অতিরিক্ত ঘাম হয় এবং পা ফুলে যায়। চাপ প্রয়োগ করলে কোনো ব্যথা অনুভূত হয় না। মাঝে মাঝে অস্বাভাবিক অনুভূতি ও অবশভাব হয় । জ্বালা ও ব্যথা রাতে বেড়ে যায় এবং প্রায়ই ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। সকালে ঘুম থেকে উঠার পর এ ধরনের উপসর্গ থাকে না ।  কারণ:  ১. ভিটামিন বি-এর উপাদান যেমন : থায়ামিন (বি-১), পাইরোডোক্সিন (বি-৬), সায়ানোকোবালামিন (বি-১২), নিকোটানিক এসিড ও রাউবোফ্ল্যাভিন-এর অভাবে পা ও লেগ জ্বালা এবং ব্যথা করে।  ২. অসঙ্গত বিপাকীয় প্রক্রিয়া ও গ্রন্থি সমস্যা (ডায়াবেটিস, হাইপোথাইরোডিসম)।  ৩. কিডনি ফেইলুর (হিমোডায়ালাইসিস রোগী)।  ৪. যকৃত (লিভার) ফাংশন খারাপ।  ৫. কেমোথেরাপি।  ৬. দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত মদপান।  ৭. ইলফিটিং বা ডিফেক্টিভ জুতা পরিধান।  ৮. এলার্জি জনিত কাপড় ও মোজা ব্যবহার করা।  ৯. বংশানুক্রমিক অসঙ্গত স্নায়ু পদ্ধতি।  ১০. স্নায়ু ইনজুরি, অবরুদ্ধ (ইনট্রাপমেন্ট) ও সংকোচন (কমপ্রেসন)।  ১১. মানসিক পীড়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিও এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার হন।  করণীয়:  চিকিৎসার শুরুতেই রোগের ইতিহাস, রোগীর শারীরিক পরীক্ষা ও ল্যাবরেটরি পরীক্ষা থেকে কারণ অনুসন্ধান করতে হবে। রোগীকে আশ্বস্ত করতে হবে যে, প্রতিকার ও চিকিৎসার মাধ্যমে এ রোগ থেকে মুক্ত হওয়া যায়। সুপরিমাপের খোলা ও আরামদায়ক জুতা পরিধান করতে হবে। আরামদায়ক সুতার মোজা ব্যবহার করা উত্তম। পায়ের আর্চ সাপোর্ট, ইনসোল ও হিল প্যাড ব্যবহারে উপসর্গ লাঘব হবে। পায়ের পেশির ব্যায়াম ও ঠান্ডা পানির (বরফ না) সেঁক উপসর্গ নিরাময়ে অনেক উপকারী। রোগ প্রতিরোধে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন সেবন করতে হবে এবং চিকিৎসায় ভিটামিন ইনজেকশন পুশ করতে হবে। মদপান ও ধুমপান থেকে বিরত থাকতে হবে এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রিত রাখতে হবে। স্নায়ু ইনজুরি, অবরুদ্ধ (ইনট্রাপমেন্ট) ও সংকোচন (কমপ্রেসন) হলে যথোপযুক্ত চিকিৎসা গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। ‘বার্নিং ফুট সিনড্রোম’ থেকে সুস্থ্য থাকতে হলে সবাইকে চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধে সচেষ্ট থাকতে হবে। [৩]

হঠাৎ পা মচকে গেলে কী করবেন?
সাধারণত রাস্তাঘাটে হাঁটাচলা করার সময় হোঁচট খেলে পায়ের গোড়ালি মচকে যায়। তবে শুধু পা নয়, মচকাতে পারে হাত থেকে শুরু করে শরীরের যেকোনো স্থানের জয়েন্টই। গর্তে পড়ে গিয়ে, রিকশা বা বাস থেকে নামতে গিয়ে, সিঁড়ি থেকে নামার সময় ধাপে ঠিকমতো পা না পড়লে, খেলাধুলার সময়, জুতার সমস্যার কারণে, এমনকি বিছানা থেকে উঠতে গিয়েও গোড়ালি মচকাতে পারে। বিশেষ করে যাদের উঁচু হিলের জুতা পরার অভ্যাস আছে, তাদের পা মচকানোর আশঙ্কা বেশি। এ বিষয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী শামীমুজ্জামান বলেন, আমাদের শরীরের প্রতিটি জয়েন্টের চারপাশে থাকে লিগামেন্ট। এগুলো জয়েন্টকে শক্ত করে ধরে রাখে। একটা নির্দিষ্ট কোণ পর্যন্ত নড়াচড়া করা যায় সহজেই কিন্তু এর বেশি করতে গেলে ব্যথা লাগে। কোনো কারণে সীমার বাইরে নড়াচড়া হলে লিগামেন্টে টান পড়ে বা কিছু অংশ ছিঁড়ে যায়। এটাকেই মচকে যাওয়া বলে। তবে পা যেহেতু পুরো শরীরের ওজন বহন করে, তাই পায়েই মোচড়টা একটু বেশি লাগে। আর হঠাৎ পা মচকে যাওয়া সমস্যায় অনেককেই ভুগতে হয়। অসহ্য যন্ত্রণা, ফোলার চোটে পা ফেলাই মুশকিল হয়ে দাঁড়ায় তখন। এ সময় ঠিকমতো যত্ন না নিলে এই ব্যথাই ভোগায় বহু দিন।

কী করবেন? বিশ্রাম নিতে হবে: পা ফুলে গেলে এবং প্রচণ্ড যন্ত্রণা অনুভব হলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিশ্রাম। যন্ত্রণা কমে গেলেও বিশ্রাম না নিয়ে হাঁটাহাঁটি, খাটাখাটুনি করলে গোড়ালির ফোলা থেকেই যাবে। তাই এ সময় অন্তত দুই থেকে তিন দিন বিশ্রাম নিন। ইদানীং ৭ থেকে ১০ দিনের বেশি বিশ্রাম দেওয়া হয় না। বরং সাপোর্ট নিয়ে শিগগিরই হাঁটাচলা শুরু করতে বলা হয়।  বরফ কীভাবে দেবেন? পায়ের ফোলা ভাব কমাতে সবচেয়ে উপকারী বরফ। সরাসরি বরফ দেবেন না, একটা পরিষ্কার কাপড়ে বরফ পেঁচিয়ে সেটা দিয়ে সেঁক দেওয়াটা সঠিক উপায়। চোট পাওয়ার প্রথম ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা বা ফোলা না কমা পর্যন্ত প্রতি এক-দুই ঘণ্টা অন্তর ১০ থেকে ২০ মিনিট ধরে আইস প্যাক লাগান। এতে ফোলা ভাব অনেকাংশে কমে যাবে।  ক্রেপ বা ব্রেস: গোড়ালির ফোলা ভাব কমাতে যেমন সাহায্য করবে আইস প্যাক, তেমনই যন্ত্রণা উপশমে কাজে আসবে ক্রেপ বা ব্রেস। চোট পাওয়ার প্রথম ২৪ থেকে ৩৬ ঘণ্টা অবশ্যই ব্রেস লাগিয়ে রাখুন। এতে ব্যথা নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তবে অতিরিক্ত টাইট করে ব্রেস লাগাবেন না।  পা ওপরে তুলে রাখুন : পা যত নামিয়ে বা নিচে ঝুলিয়ে রাখবেন, তত ফোলা বাড়বে। তাই দিনে অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা পা ওপরে তুলে রাখুন। শোয়ার সময় হার্ট লেভেলের থেকে পা উঁচুতে রাখবেন। এতে খুব দ্রুত ফোলা ভাব কমে আসবে।

সতর্কতা: বারবার একই জায়গায় পা মচকানো, যা পরে ওই সন্ধিতে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়জনিত সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তাই খেলাধুলা ও দ্রুত হাঁটাচলার সময় সাবধানে থাকুন, পায়ের পাতার ভারসাম্য বজায় থাকে এমন জুতা পরুন, সিঁড়ি ভাঙার সময় সাবধান হোন।  পায়ের দুর্গন্ধের কারণ:  পায়ের দুর্গন্ধের প্রধান কারণ পায়ের ঘাম। ঘেমে যাওয়া পায়ে ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জুতার ভেতর থেকে ঘাম বেরোতে পারে না। অনেকক্ষণ এমন অবস্থায় থাকার ফলে পা থেকে দুর্গন্ধ ছড়ায়। জুতা ও মোজা নিয়মিত পরিষ্কার না করলেও পা ও জুতা থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতে পারে।   কী করবেন?: সব সময় পা পরিষ্কার রাখতে হবে। প্রতিদিন ব্যবহার করা মোজা ধুয়ে ভালোভাবে শুকিয়ে ব্যবহার করতে হবে। জুতাও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। জুতার মধ্যে পাউডার দিতে পারেন। প্রয়োজনে মাঝেমধ্যে এসব রোদে দেওয়া যেতে পারে। সুতি মোজা ব্যবহার করাই ভালো, কারণ এতে পা কম ঘামে ও ঘাম শোষণ করে। আর যাদের পা বেশি মাত্রায় ঘামে, তাঁরা বেশি ঘাম শোষণ করতে পারে এমন জুতা কিনতে পারেন।

চিকিৎসা: সঠিক কারণ বের না করে চিকিৎসা করা উচিত নয়। আগে অনুসন্ধান বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কারণ খুঁজতে হবে। তারপর সঠিক চিকিৎসা নিলে এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। সাধারণত বিভিন্নভাবে হাত-পা ঘামা কমানো যেতে পারে। অ্যালুমিনিয়াম ক্লোরাইডযুক্ত একধরনের বিশেষ লোশন হাত-পায়ে ব্যবহার করলে হাত-পা ঘামা কমে যায়। বিশেষ ধরনের বৈদ্যুতিক যন্ত্রে হাত-পা সেঁকে নিলে হাত-পা ঘামা কমে যাবে। পরবর্তী সময়ে এটি দেখা দিলে আবার একইভাবে সেই বৈদ্যুতিক যন্ত্রে হাত-পা সেঁকে নিতে হবে। এসব পদ্ধতি ছাড়াও একটি বিশেষ ধরনের নার্ভের অস্ত্রোপচার করেও হাত-পা ঘামা কমানো যায়। তবে হাত-পায়ের ঘাম রোধে যা-ই করা হোক না কেন, এর আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। [৪]

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>