বাংলাদেশেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে পুষ্টিসমৃদ্ধ ড্রাগন ফল

আমরা অনেকেই ড্রাগন ফলের সঙ্গে পরিচিত নই। এই ফলের বাইরেটা দেখতে উজ্জ্বল গোলাপি, ভিতরের শ্বাস সাদা এবং লাল আর ছোট কালো বীজ ভিতরে ছড়ানো। এই ফল ক্যাকটাস জাতীয় এবং দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এই ফল স্বাদে মিষ্টি এবং দারুণ। এই ফল যে শুধু দেখতেই ভাল তা নয়- এই ফলে প্রচুর পুষ্টি দ্রব্য বর্তমান এবং অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর। পিতায়য়া বা ড্রাগন (ইংরেজি: Pitaya, চীনা: 火龍果/火龙果, থাই: แก้วมังกร), একধরনের ফণীমনসা (ক্যাক্‌টাস) প্রজাতির ফল। মূলত হায়লোসিরিয়াস বা মিষ্টি পিতায়য়াই ড্রাগন ফল হিসেবে পরিচিত। গণচীন-এর লোকেরা এটিকে ফায়ার ড্রাগন ফ্রুট এবং ড্রাগন পার্ল ফ্রুট বলে, ভিয়েতনামে সুইট ড্রাগন, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াতে ড্রাগন ফ্রুট (ໝາກມັງກອນ), থাইল্যান্ডে ড্রাগন ক্রিস্টাল নামে পরিচিত। অন্যান্য স্বদেশীয় নাম হলো স্ট্রবেরি নাশপাতি বা নানেট্টিকাফ্রুট। এই ফলটি একাধিক রঙের হয়ে থাকে। ড্রাগন ফল এই ফল কাঁচা-পাকা উভয়তেই খাওয়া যায়। খাদ্য, ঔষধি ও ভেষজ গুণে সমৃদ্ধ ড্রাগন ফল খেতেও সুস্বাদু। ড্রাগন ফল সারা বিশ্বেই জনপ্রিয়তায় শীর্ষে। আগে চীন ও থাইল্যান্ডে এ ফলের চাষ হলেও বর্তমানে বাংলাদেশে এর চাষাবাদ হচ্ছে। অন্য দেশের মতো আমাদের দেশে ড্রাগন ফল জনপ্রিয় হয়ে ওঠছে। ড্রাগন ফল দেখতে ছোট এবং লাল টুকটুকে।

খেতে দারুণ সুস্বাদু। এই ফল শুধু সুস্বাদু নয়, স্বাস্থ্যকরও বটে। ড্রাগন ফল নিয়মিত খেলে জটিল রোগসহ আরও অনেক রোগের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। এছাড়া এই ফল- ডায়বেটিস ও কোলন ক্যান্সার প্রতিরোধ করে, কোলেস্টরেল ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে এবং অ্যাজমা ও ঠাণ্ডা-কাশির রোগীদের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আমাদের দেশে ‘ড্রাগন ফলের জনপ্রিয়তা দিন দিন বেড়ে চলছে। প্রতিকেজি ড্রাগন ফল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি করি। এছাড়া প্রতি পিস ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হয়। ড্রাগন ফল কিনে ঘরে রাখলে ১ সপ্তাহ ভালো থাকে। ফ্রিজে রাখলে ১ মাস পর্যন্ত সতেজ ও সজীব থাকে। এছাড়া বাচ্চারা খেতে খুব পছন্দ করে। ড্রাগনফলের ইংরেজী নাম: Dragon fruit; বৈজ্ঞানিক নাম: Hylocereus undatus – এরউৎপত্তিস্থল সেট্রাল আমেরিকা। সেন্ট্রাল আমেরিকাতে এ ফলটি প্রবর্তন করা হয়এয়োদশ শতাব্দীতে। দণি এশিয়া বিশেষ করে মালেশিয়াতে এ ফলের প্রবর্তন করা হয়বিংশ শতাব্দীর শেষে। তবে ভিয়েতনামে এ ফল সর্বাধিক বাণিজ্যিকভাবে চাষ করাহয়। তবে বর্তমানে এ ফলটি মেঙিকো, সেন্ট্রাল ও দণি আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্বএশিয়া, দণি চীন, ইসরাইল, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ বাংলাদেশেওচাষ করা হচ্ছে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত অনেকগুলো বিদেশী ফল প্রর্বতন করাহচ্ছে। তার মধ্যে এ্যাভোকেডো, ম্যাঙ্গোঁস্টিন, স্ট্রবেরী, কিউই,রাম্বুটান, লংগান, ল্যাংসাট, ব্রেড ফ্রুট, জাবাটিকাবা, শান্তল, পীচফল,ফ্রুট এবং ডুরিয়ান অন্যতম। এদের মধ্যে কিউই ও ডুরিয়ান ছাড়া প্রায় সব ফলইএদেশে কমবেশী হচ্ছে এবং কোন কোনটা থেকে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যাচ্ছে। যাদেখে অনেকে এসব ফলের বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ করার চিন্তা-ভাবনা করছে। লকরা যাচ্ছে যে , এদেশের অনেক জায়গাতেই বিশেষ করে উত্তর বঙ্গ ও ময়মনসিংহেবাণিজ্যিকভাবে স্ট্রবেরী চাষ করা হচ্ছে। এছাড়া বিদেশী ফলগুলোর মধ্যেড্রাগন ফলের চাষ সম্ভাবনাময়। গবেষকরা মনে করেছেন অচিরেই এ ফলটি এদেশেবাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশে এ ফল ২০০৭ সালে প্রথমপ্রবর্তন করে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাউ জার্মপ্লাজম সেন্টার। এসেন্টারের পরিচালক প্রফেসর ড. এম. এ রহিম এ ফলের জাত নিয়ে আসেনথাইল্যান্ড, ফোরিডা ও ভিয়েতনাম থেকে। এখন এ সেন্টার থেকে এ ফলটিবাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বংশ বিস্তার করা হচ্ছে।

পুষ্টি মূল্য
সবধরনের ডায়েটের জন্য এ ফলটি উপযুক্ত। এ ফল শরীরের জন ফাইবার সরবারহ করে যাপেটের পীড়া এবং লিভার এর জন্য উত্তম। খাবারের পর ডেজার্ট হিসাবে পূর্ব ওদণিপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এ ফল খাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। এ ফলটি প্রচুরপরিমানে ভিটামিন সি, মিনারেল এবং উচ্চ ফাইবার যুক্ত। জুস তৈরিতে জন্যওফলটি অত্যন্ত উপযোগী। প্রতি ১০০ গ্রাম ফলে ফাইবার ০.৯ গ্রাম, ফ্যাট ০.৬১গ্রাম, এ্যাশ ০.৬৮ গ্রাম, ক্যারোটিন ০.০১২ গ্রাম, পানি ৮৩.০ গ্রাম, ফসফরাস৩৬.১ মি. গ্রাম, এসকোরবিক এসিড ৯.০ মি. গ্রাম, প্রোটিন ০.২২৯ গ্রাম,রিবোফাবিন ০.০৪৫ মি. গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৮.৮ গ্রাম, নায়াসিন ০.৪৩০ মি.গ্রাম, ও আয়রন ০.৬৫ মি. গ্রাম থাকে। খাদ্যমানের প্রাচুর্যের জন্য হয়তোব এফল উৎপাদনকারী দেশগুলোতে প্রতিবেলার খাবারের সাথে এ ফল না থাকলে যেন তাদেরকাওয়া অপূর্ণ থেকে যায়। ড্রাগন ফল দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও মনোমুগ্ধকর।এমন কথা প্রচলিত আছে যে, একটি তাজা ফল খেয়ে মানব শরীরকে সতেজ ও সুস্থ রাখাযায়। যে সমস্ত মানুষ ডায়াবেটিক রোগে ভোগেন তারা এ ফল খেয়ে শরীরের রক্তেরগ্লুকোজকে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। ফ্রেশ ফলের চেয়ে শুষ্ক ফল বেশকার্যকরী। এ ফল সালাদের সাথেও ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ড্রাগন ফলের উপকারিতা:
ওজন কমায় ড্রাগন ফলে অত্যন্ত কম পরিমাণে কোলেস্টেরল ও ক্যালোরি থাকে। তাই যারা ওজন কমাতে চান ড্রাগন ফল খেতে পারেন।  রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে বেশিরভাগ ফলের মতোই ড্রাগন ফলেও প্রচুর পরিমাণে ফাইবার থাকে ফলে এটা আমাদের রক্তচাপ এবং রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে।  ত্বকের জন্য উপকারী ত্বকের বিভিন্ন সাধারণ সমস্যা দূর করতে দক্ষিণ- পশ্চিম এশিয়ার বহু পরিবারে এই ফল ঘরোয়া টোটকা হিসাবে ব্যবহার করা হয়। এই ফলে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে যা আমদের ত্বকের পক্ষে অত্যন্ত উপকারী।  হার্টের জন্য উপকারী প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ফাইবার থাকায় এই ফল আমাদের হার্ট সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

আরো কিছু উপকারিতা
১. ড্রাগন ফলে ক্যালোরি খুব কম থাকার কারনে এই ফল ডায়াবেটিস ও হৃদরোগীরা অনায়াসেই খেতে পারেন।  ২. ড্রাগন ফলে ভিটামিন সি বেশি থাকার ফলে এই ফল খেলে আমাদের শরীরের ভিটামিন সি এর চাহিদা পূরণ হয়। লাল শাঁসের ড্রাগন ফল থেকে বেশি পরিমানে ভিটামিন সি পাওয়া যায়।  ৩. আয়রন থাকার কারনে এই ফল খেলে রক্ত শূন্যতা দূর হয়।  ৪. নিয়মিত ড্রাগন ফল খেলে রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে থাকে। তাই এই ফল ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উত্তম।  ৫. ড্রাগন ফলের শাঁস পিচ্ছিল হওয়ায় এই ফল খেলে কোষ্ঠ কাঠিন্য দূর হয়।  ৬. ড্রাগন ফলে প্রচুর পরিমানে পানি থাকার কারনে এই ফল খেলে শরীরের পানি শূন্যতা সহজেই দূর হয়।  সুতরাং এবার আপনি জানেন ড্রাগন ফল আমাদের শরীরের পক্ষে কতটা উপকারী। তাই এরপর বাজারে যখনই ড্রাগন ফল দেখতে পাবেন কিনতে ভুলবেন না!

রাতের রাণি ড্রাগন ফুল 
ড্রাগনফল ক্যাকটাস গোত্রের একটি ফল। গাছ দেখে সবাই একে চির সবুজ ক্যাকটাস বলেইমনে করেন। এশিয়ার মানুষের কাছে এ ফল অনেক জনপ্রিয়, হালকা মিষ্টি-মিষ্টি। এফলকে ড্রাগন ফল ছাড়াও পিটাইয়া, টিহায়া ইত্যাদিও নামে ডাকা হয়। ড্রাগন ফলগাছে শুধুমাত্র রাতে ফুল দেয়। ফুল লম্বাটে সাদা ও হলুদ, অনেকটা ‘নাইটকুইন’ ফুলের মত। এ কারণে ড্রাগন ফুলকে ‘রাতের রাণি’ নামে অভিহিত করা হয়েথাকে। ড্রাগন ফলের গাছ লতানো ইউফোরবিয়া গোত্রের ক্যাকটাসের মত কিন্তু এরকোন পাতা নেই। ফুল স্বপরাগায়িত; তবে মাছি, মৌমাছি ও পোকা-মাকড় এর পরাগায়নত্বরান্বিত করে এবং কৃত্রিম পরাগায়নও করা যেতে পারে।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>