আপনি কি পান খান? পান খাওয়া উপকারি নাকি ক্ষতিকর?

পান একটি গাছের নাম। এর পাতাকে ‘পান’ বলা হয়। চিবিয়ে খাওয়ার জন্য ব্যবহার হয় পানপাতা। সাধারণত বয়স্ক লোকেরা পান খেয়ে থাকে। শহরে ও গ্রামে সর্বত্রই প্রচুর পান দোকান ও পানখাদক দেখা যায়। পান খাওয়ার প্রভাবে দাঁত লাল হয়ে যায়। অনেকে নেশার মত পান খায়। সেদিক বিচারে এটিও একটি নেশা জাতীয় দ্রব্য। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পান একটি অতি পরিচিত খাবার। সাধারণত অতিথি আপ্যায়নে কিংবা কোনো বৈঠকে আলোচনা শুরু করার উপলক্ষ হিসেবে পানের ব্যবহার দেখা যায়। পান গাছের পাতাকে পান বলা হলেও মূলত পানের সঙ্গে সুপারি, চুন ও নানান রকমের জর্দা (তামাক জাতীয় দ্রব্য), খয়ের ইত্যাদি এক সঙ্গে বোঝায়। পানের সঙ্গে সবসময়ই সুপারি দেয়া হয়। তবে অনেকেই সুপারি ছাড়া পান খেতে পছন্দ করেন। পান সাধারণত কোনোকিছু খাওয়ার পর মুখে নিয়ে চিবুনো হয়৷ পান পিপুল পরিবারভুক্ত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের এক প্রকার গুল্মজাতীয় গাছের পাতা। আর্য এবং আরবরা পানকে তাম্বুল নামি অভিহিত করত। নিঃশ্বাসকে সুরভিত করা, ঠোঁট ও জিহ্বাকে লাল করার জন্য মানুষ পান খায়। অবশ্য পানে কিছুটা মাদকতার আনন্দও থাকে।

প্রধানত দক্ষিণ এশিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশসমূহ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানুষ পান খায়। কেবল স্বভাব হিসেবেই নয়, বাংলাদেশে ঐতিহ্যগতভাবে সামাজিক রীতি, ভদ্রতা এবং আচার-আচরণের অংশ হিসেবেই পানের ব্যবহার চলে আসছে।

অনুষ্ঠানাদিতে পান পরিবেশন করে অতিথিদের প্রস্থানের সময় ইঙ্গিত করা হয়। এক সময় উৎসব, পূজা ও পুণ্যাহে পান ছিল অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রাচীন অভিজাত জনগোষ্ঠীর মাঝে পান তৈরি এবং তা সুন্দরভাবে পানদানিতে সাজানো লোকজ শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি পেত।

স্বাস্থ্য সমস্যায় পান পাতার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার সম্পর্কে। 
১. ওজন হ্রাস করতে পানের রস হজমশক্তি বৃদ্ধি করে এবং অতিরিক্ত পানি, বিষাক্ত পর্দাথ শরীর থেকে বের করে দেয়। শুধু তাই নয় এটি মেটাবলিজম বৃদ্ধি করে থাকে। এর ফাইবার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে থাকে। আর এই সবকিছু ওজন হ্রাস করতে সাহায্য করে। তাছাড়া পান পাতায় রয়েছে গ্যাস্ট্রো প্রটেকটিভ , অ্যান্টি-ফ্লটুলেন্ট এবং কার্মিনেটিভ এজেন্ট যার কারণে পান চাবানোর সময় মুখে স্যালাইভা তৈরি করে। যা খাবার হজম করতে সাহায্য করে।  ২. জয়েন্টে ব্যথা পলিফেনাল নামে এক ধরনের অ্যান্টি-ইনফ্লামমেটরি উপাদান রয়েছে পান পাতায়, যা প্রদাহ বা যন্ত্রণা কমাতে দারুন কাজে করে। এইজন্য অনেককে জয়েন্টের ব্যথার জন্য পানের রস সরবারহ করে। ৩. গলা ব্যথা রোধে পান পাতার অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টি ইনফ্লামমেটরি উপাদান ঠাণ্ডা এবং ঠাণ্ডাজনিত সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে। পান পাতা এবং মধু মিশিয়ে খাওয়ার অভ্যাস করুন এটি গলার ইনফেকশন রোধ করবে। ৪. ক্ষত সারাতে পান পাতায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টি অক্সিডেন্ট। এর অক্সিডেটিভ উপাদান ক্ষত দ্রুত সারিয়ে তোলে। ক্ষত স্থানে কিছু পরিমাণ পান পাতার রস লাগিয়ে নিন। এরপর ব্যান্ডেজ করে বেঁধে রাখুন। এভাবে ২-৩দিন থাকুন। দেখবেন ক্ষত সেরে গেছে। ৫. মুখের দুর্গন্ধ দূর মুখের ভিতরের ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলে মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে পান পাতার বিকল্প নেই। পান পাতা চেবানোর সময় মুখে ভিতর স্যালাইভা উৎপাদন করে যা ওরাল ব্যাক্টেরিয়া রোধ করে এবং পিএইচ লেভেলের ভারসাম্য বজায় রাখে। আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনু‌যায়ী পান খেলে ক্যান্সারের মতো ভয়াবহ রোগকেও প্রতিহত করা ‌যায়।

পান খাওয়ার অপকারিতা
বহুগুণে ভরপুর এই পান আবার অতিরিক্ত খেলে, অনেক রোগ অথবা শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। পানের সঙ্গে জর্দা মিশিয়ে খেলে পানের গুণ নষ্ট হয়ে যায়, ফলে বেশিমাত্রায় পান খেলে মুখ এবং চোখের রোগ হতে পারে। পানের সঙ্গে বেশি খয়ের খাওয়ার অভ্যাস থাকলে ফুসফুসে ইনফেকশন হতে পারে। অতিরিক্ত পরিমাণে পান, চুন, জর্দা, খয়ের ও তামাকপাতা খেলে মুখের নানা অসুখ, এমনকি ওরাল ক্যান্সারও হতে পারে। পানের সাথে বেশিমাত্রায় চুন খেলে দাঁতের ক্ষতি হয়। যেহেতু পান উষ্ণ এবং পিত্তকারক, তাই শিশুরা এবং অন্তঃস্বত্ত্বা নারীদের পান খাওয়া উচিত না।
১. খাওয়ার পরে পান খাওয়া উচিত। খালি পেটে পান খাওয়া উচিত নয়। ২. পানের সঙ্গে জর্দা মিশিয়ে খেলে পানের সব গুণ নষ্ট হয়ে যায়। ৩. বেশি পান খেলে মুখ ও চোখের রোগ হতে পারে। পানের সঙ্গে বেশি সুপারি খাবেন না। ৪. পানের সঙ্গে বেশি খয়ের খেলে ফুসফুসে ইনফেকশন হয়। ৫. পানে বেশিমাত্রায় চুন খেলে দাঁতের ক্ষতি হয়। ৬. যাদের জ্বর এবং দাঁতের সমস্যা রয়েছে তাদের পান খাওয়া বন্ধ করে দেওয়া উচিত।

পান সুপারি কেন ক্ষতিকারক
পানে রয়েছে টারফেনলস। পান খাওয়ার কারণে ঠোঁট ও জিহ্বাতে দাগ পড়ে যায়। দাঁতে প্রায় স্থায়ী দাগ পড়ে যায়। চুনে রয়েছে প্যারা অ্যালোন ফেনল যা মুখে আলসার সৃষ্টি করতে পারে। এ ধরনের ঘা ধীরে ধীরে ক্যান্সারে রূপান্তরিত হতে পারে। তাইওয়ানে গবেষণায় দেখা গেছে, সুপারি নিজেও ক্যান্সার সৃষ্টি করে থাকে অর্থাৎ সুপারি ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান। সুপারি চুনের সঙ্গে বিক্রিয়া ঘটিয়ে এরিকোলিন নামক একটি নারকোটিক এলকালয়েড উৎপন্ন করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এরিকোলিন প্যারাসিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্রের উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এ কারণেই চোখের মণি সংকুচিত হয় এবং লালার নিঃসরণের পরিমাণ বেড়ে যায়। শুধু তাই নয়, চোখে পানি পর্যন্ত আসতে পারে। কাঁচা সুপারি চিবালে উত্তেজক হিসেবে কাজ করে। সুপারিতে রয়েছে উচ্চমাত্রার সাইকোএকটিভ এলকালয়েড। এ কারণেই উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। কাঁচা সুপারি চিবালে শরীরে গরম অনুভূত হয়, এমনকি শরীর ঘামিয়ে যেতে পারে। সুপারি খেলে তাৎক্ষণিক যেসব সমস্যা দেখা যায় সেগুলো হল- অ্যাজমা বেড়ে যেতে পারে। হাইপারটেনশন বা রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। টেকিকার্ডিয়া বা নাড়ির স্পন্দনের পরিমাণ বেড়ে গিয়ে অস্থিরতা অনুভূত হওয়া। দীর্ঘমেয়াদে সুপারি সেবন করলে ওরাল সাবমিউকাস ফাইব্রোসিস হতে পারে। ক্যান্সারের পূর্বাবস্থা বা স্কোয়ামাস সেল কারসিনোমা হতে পারে। আমাদের দেশে মুখের ক্যান্সারের মধ্যে স্কোয়ামাস সেল কারসিনোমা বেশি হতে দেখা যায়। পানের সঙ্গে সাদাপাতা বা জর্দা ব্যাপকভাবে গৃহীত হচ্ছে। ক্যান্সার গবেষণায় আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএআরসি-এর মতে, যারা পানের সঙ্গে তামাকজাতীয় দ্রব্যাদি গ্রহণ করেন তাদের সাধারণের চেয়ে পাঁচগুণ বেশি ওরাল ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অতএসব পান-সুপারি সেবন থেকে বিরত থাকতে হবে। মুখের অভ্যন্তরে কোনো আলসার বা ক্যান্সার দেখা দিলে চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>