যদি সুস্থ্য থাকতে চান, খাওয়া দাওয়ায় মানতে হবে যেসব নিয়ম !

সুস্থ থাকার জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার জরুরি। এ কারণে যা পাবেন, তা-ই না খেয়ে দেখেশুনে বাছবিচার করে খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। এ ক্ষেত্রে খাবারের পুষ্টিমান অবশ্যই বিবেচনায় ধরে খেতে হবে। নিয়ম মেনে খেলে উপকার পাওয়া যায়। জেনে নিন এ রকম কয়েকটি নিয়ম সম্পর্কে:

১. প্রক্রিয়াজাতহীন বিভিন্ন খাবার উৎস থেকে যতটা সম্ভব পুষ্টি গ্রহণ করবেন। এর মধ্যে আছে ফল ও শাকসবজি। মাছ, মাংস ও ডিম খেতে পারেন। তবে তা যেন প্রক্রিয়াজাত করা না হয়। বাজার থেকে কেনার সময় খেয়াল রাখবেন, তা যেন রান্না বা অন্য কোনোভাবে ভাজা না হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সাদা চালের পরিবর্তে বাদামি চাল খান। রিফাইন করা শস্যের বদলে পূর্ণ শস্য খান। আপেল জুস খাওয়ার চেয়ে আস্ত আপেল খান। হালকা প্রক্রিয়াজাত করা খাবারও কম খান। যেমন পাস্তা। এ ছাড়া প্রক্রিয়াজাত করা খাবারের মধ্যে পাউরুটি, চিপস, কুকি, সিরিয়াল খাওয়া কমান। গবেষকেরা বলেন, প্রক্রিয়াজাত করা মাংস খেলে স্বাস্থ্যগত নানা সমস্যা দেখা দেয়। ২. যতটা সম্ভব বাড়িতে তৈরি খাবার খাবেন। এতে খাবারদাবার তৈরি ও খাওয়ার ক্ষেত্রে আপনার নিয়ন্ত্রণ থাকবে। সময় লাগলেও ধীরেসুস্থে খান। ৩. খাবার তৈরির সময় লবণ ও চর্বির পরিমিত ব্যবহার করুন। একেবারে বাদ দিলে স্বাদ পাবেন না। তাই যতটুকু না খেলেই নয়, ঠিক ততটুকু ঘি-তেল খান। ৪. রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে ওই রেস্তোরাঁয় খাবার তৈরিতে সঠিক নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা খেয়াল রাখবেন। আপনার বাড়ির মতোই নিয়ম মানা হলে সেই রেস্তোরাঁয় খেতে পারেন। প্রক্রিয়াজাত খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে যান। ৫. সাধারণত বেশি করে পানি খাবেন। কখনো কখনো কফি খেতে পারেন। তবে পানীয় গ্রহণের বিষয়টি পরিমিত হতে হবে। পানীয় গ্রহণের সময় ক্যালরির বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। ৬. বাইরে খাওয়ার সময় যদি পারেন পরিবারসহ খেতে যান। পুষ্টিমান ছাড়াও এর কিছু উপকারিতা আছে। খাবার যতটা সম্ভব ধীরে খাবেন। এতে বেশি সুখী মনে হবে।

সময়মতো খাবার না খেলে কী হয়?
সকালে ঘুম থেকে উঠেই অফিসে দৌড়। তাড়াহুড়োয় খাবার খাওয়ার সময় পেলেন না। অফিসে গিয়েই মিটিং। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল। তখনো খাবার খাওয়া হলো না। আবার রাতের খাবার যে কখন খাওয়া হয় তার কোনো সঠিক সময় নেই! সময়মতো খাবার না খেলে তৎক্ষণাৎ কোনো সমস্যা হয় না বলে অনেকে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে অসুস্থ হতেই হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শারমিন রুমী আলীম জানালেন, সময়মতো না খাবার খাওয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি হয় গ্যাসট্রিকের সমস্যা। বদহজম, গ্যাস ও অম্বল হওয়ার আশঙ্কা তো আছেই। সঠিক সময়ে সঠিক খাবার না খাওয়ার কারণে বয়স যখন ৪০ পেরিয়ে যায়, তখন তাঁদের শরীর খুব দ্রুত ভেঙে পড়ে। তাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুব কমে যায়। দ্রুত বৃদ্ধ হয়ে পড়েন তাঁরা। অনিয়মিত খাবারদাবার ও বেশি রাত করে রাতের খাবার খাওয়া প্রভাব ফেলে আপনার নিত্যদিনের কাজেও। কারণ, সঠিক সময়ে খাবার না খেলে শরীর খুব দ্রুত পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ে। লো প্রেশারের সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু খাবার সময়মতো খেয়ে ফেললে শরীর তরতাজা থাকে। মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বজায় থাকে। বেশির ভাগ তরুণ সকালবেলা খাবার খেতে আগ্রহী হন না। কিন্তু দিন যত গড়ায় শরীরের পরিপাক হারও তত বেড়ে যায়। সূর্য ডুবে যাওয়ার পর পরিপাক হারও কমতে থাকে। ফলে দুপুর বা রাতের চেয়ে সকালে খাবারদাবার অনেক বেশি প্রয়োজনীয়। সকালে নাশতা কখনোই বাদ দেওয়া উচিত নয়। সকালের খাবার যেমন গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা থেকে বিরত রাখে, তেমনি সারা দিন কাজ করার শক্তি প্রদান করে। ছোট বয়স থেকেই সঠিক সময়ে খাবার খেলে ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঠিকমতো হয়।

গবেষণা থেকে পাওয়া
১. অক্সফোর্ড জার্নাল অনুসারে, কোনো অন্তঃসত্ত্বা নারী যদি তাঁর খাবার নিয়ম অনুসারে না খান, তাহলে তাঁর অনাগত সন্তানের ওপর এর নানা
প্রভাব পড়ে। ২. চীনের মেডিসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক তাঁর গবেষণায় জানিয়েছেন, কখনোই একসঙ্গে অতিরিক্ত খাবার খাওয়া ঠিক নয়৷ প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খাওয়া উচিত৷ সময়মতো খাবার খেলে হজম-প্রক্রিয়া ভালো হয়, যা স্বাস্থের জন্য ভালো৷ ৩. যুক্তরাষ্ট্রের জীববিজ্ঞানী গিরিশ মেলকানি তাঁর এক গবেষণাপত্রে লিখেছেন, সময়মতো খাবার গ্রহণ করার ফলে কম বয়সে বৃদ্ধ হয়ে যাওয়া ও হার্টের যে সমস্যা হয় তাও দূর হয়। ৪. বোস্টনের ব্রড ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সময়মতো খাবার খাওয়া আপনাকে গ্যাস্ট্রিক, আলসার, ওজনহীনতাসহ মারাত্মক কিছু রোগ থেকে রক্ষা করে আপনাকে রাখবে সুস্থ, সবল ও সতেজ।

খাওয়ার মাঝে কি পানি খাব?
আমরা সাধারণত এক গ্লাস পানি নিয়ে ভাত খেতে বসি। আর পান্তা ভাত তো পানিতে ভাসে। কিন্তু অনেকে বলেন, খাওয়ার মাঝে পানি খেলে ক্ষতি হয়। পানি তাহলে কখন খাওয়া উচিত? এ নিয়ে মতভেদ থাকলেও কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।
১. খাওয়ার সময় মুখে যে লালা বের হয় তাতে অনেক ধরনের এনজাইম থাকে। এগুলো খাদ্যের উপাদানগুলো ভেঙে পরিপাকে সাহায্য করে। পাকস্থলীতে খাদ্য পরিপাকের জন্য অনেক পাচক রস বের হয়। আবার লিভার (যকৃত) পরিপাকে সাহায্য করে। খাওয়ার সময় প্রচুর পানি খেলে এই তিনটি ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি হয়। তাই স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা খাওয়ার সময় পানি খেতে নিষেধ করেন। এ জন্যই বলা হয় ফল বা মূল খাবারের পর পানি খেতে নেই। কারণ, এতে পাচক রস ও এনজাইমগুলোর কার্যকারিতা কমে যায়, শরীর সবটুকু পুষ্টি নিতে পারে না।  ২. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব মেডিসিনের ডিন এ বি এম আবদুল্লাহ জানিয়েছেন, সুস্থ ব্যক্তি খাওয়ার মধ্যে কমবেশি পানি খেলে সমস্যা নেই। তবে কারও অ্যাসিডিটি থাকলে বা খাওয়ার পর বারবার ঢেকুর উঠলে খাওয়ার মাঝে নয়, কিছু সময় পর পানি খেতে হবে।  ৩. খাদ্য পরিপাকের জন্য শরীরে যথেষ্ট পানি থাকা দরকার। পিপাসার্ত অবস্থায় পেট ভরে খেলে লিভার ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। তাই বিশেষজ্ঞরা বলেন, খাওয়ার অন্তত আধা ঘণ্টা আগে ও আধা ঘণ্টা পরে এক গ্লাস করে পানি খেলে শরীর পানিসিক্ত থাকে, খাবার পরিপাক সহজ হয়।  ৪. অনেক বিশেষজ্ঞ আবার বলেন, হিসাব করে পানি খাওয়ার দরকার নেই। প্রয়োজন হলেই পিপাসা লাগে, তখন পানি খেতে হয়। খাওয়ার মাঝে হয়তো পিপাসা লাগে বলে আমরা সাধারণত পানি নিয়ে খেতে বসি। উপকার না থাকলে আমাদের এ অভ্যাসটি হতো না। আর তা ছাড়া, ঝাল লাগলে হেঁচকি ওঠে, তখন যে সামান্য পানি খেতে হয়, সে তো আমরা সবাই জানি।  ৫. খাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে পেট ভরে পানি খেলে ওজন কমানো সহজ হয়, এ কথাও স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের অনেকে বলেন। কারণ, এতে বেশি খাওয়া হয় না।

যখন–তখন ঠান্ডা পানি?
অসহনীয় গরম থেকে খানিক রেহাই পেতে এবং শরীরের ঘাম হয়ে বেরিয়ে যাওয়া পানির ঘাটতি পূরণ করতে পানি পান করার বিকল্প নেই। আবার স্বস্তি পাওয়ার অজুহাতে অনেকে ফ্রিজের ঠান্ডা পানিও পান করেন হরহামেশাই। কিন্তু এ রকম ঠান্ডা পানি যখন-তখন পান করা কি উচিত? পানি পান করার আদর্শ সময় সম্পর্কে রাজধানীর বারডেম জেনারেল হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজি অ্যান্ড মেটাবলিজম বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফিরোজ আমিন বলেন, সাধারণত ভারী খাওয়া-দাওয়ার আগে কিংবা পরে কমপক্ষে এক-দেড় ঘণ্টার মধ্যে খুব বেশি পরিমাণে পানি পান করা উচিত নয়। তিনি আরও বলেন, ‘পাকস্থলীর ধারণক্ষমতা সম্পর্কে আমাদের ধারণা থাকা উচিত। খাওয়ার পর অনেকে প্রায় একই সঙ্গে দু-তিন গ্লাস পানি পান করে ফেলেন। সঙ্গে সঙ্গে শুয়েও পড়েন অনেকে। এতে বুক ধড়ফড় করে। মূলত অ্যাসিড রিফ্লাক্স হয় অর্থাৎ পাকস্থলীর অ্যাসিড খাদ্যনালি দিয়ে অনেক সময় গলা পর্যন্ত উঠে আসে। ফলে গলায় জ্বালাপোড়া, পেটের ওপরের দিকে চিনচিনে ব্যথা ও বুক ধড়ফড় করার মতো সমস্যা অনুভূত হয়।’
বিশেষজ্ঞরা বলেন, খাওয়ার পর অতিরিক্ত পানি পান করা এবং সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়ার কারণে গলায় ঘা পর্যন্ত তৈরি হতে পারে। তবে খাওয়ার পর অন্তত মুখ পরিষ্কার করার দোহাই দিয়ে সামান্য পানি পান করাই যায়, কিন্তু খুব বেশি পরিমাণে নয়। আর খাওয়ার মাঝ পর্যায়ে গলা ভেজানোর জন্যও পান করতে পারেন স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি। পরিপাকের সুবিধার জন্যও এটুকু পানি পান করা দরকার। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা করা পানি পান করলে মেদ ঝরে। এর ব্যাখ্যা হলো, ঠান্ডা পানির তাপমাত্রা আর শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার বিরাট পার্থক্যের কারণে পানির তাপমাত্রাকে স্বাভাবিক করতে শরীর অতিরিক্ত শক্তি ব্যয় করে, এতে মেদ ঝরতে পারে। তবে এই মেদ হ্রাসের পরিমাণ খুবই সামান্য। তাই এতে খুশি হওয়ার কারণ নেই। বরং ফ্রিজের ঠান্ডা পানি পান করার ক্ষতিকর দিকটি এতই প্রকট যে এই সামান্য ভালো দিকটির অস্তিত্ব তার কাছে প্রায় নেই বললেই চলে। খাওয়ার মাঝে কিংবা শেষে ফ্রিজের ঠান্ডা পানি পান করলে তা খাবারের চর্বি অংশটুকুকে কঠিন অবস্থায় নিয়ে যায়। বুঝতেই পারছেন, এতে শরীরে মেদ কমে নাকি বাড়ে। একই সঙ্গে ঠান্ডা পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিক করতে শরীর ব্যস্ত হয়ে পড়ে, আর এ কারণে খাবার পরিপাকের প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটে। পরবর্তী সময়ে ঠান্ডা পানির সহায়তায় খাবারের সেই কঠিন হওয়া অতিরিক্ত চর্বিকে পরিপাক করাটা শরীরের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। এসব অতিরিক্ত চর্বি কখনো কখনো রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে শোষিত হয়। ধমনিতেও ধীরে ধীরে জমতে থাকে চর্বি। পরিণাম, উচ্চ রক্তচাপ। এই সমস্যা একজন মানুষকে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। আরেকটি ব্যাপার লক্ষণীয়, হঠাৎ তাপমাত্রা পরিবর্তনকে আমাদের শরীর সহজে গ্রহণ করতে পারে না। অনেক সময় বাইরের গরম পরিবেশ থেকে এসে ঘরে ঢুকেই ফ্রিজের পানির লোভ আর কিছুতেই সামলানো যায় না। এটি অত্যন্ত ক্ষতিকর। কিছুটা সময় নিয়ে স্বাভাবিক হওয়া প্রয়োজন। সুস্থ থাকার মূলমন্ত্র হিসেবে শরীরের তাপমাত্রা এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশের তাপমাত্রার মধ্যে যোগসূত্র থাকাটা খুব জরুরি। ফ্রিজের ঠান্ডা পানি তাহলে কখন পান করবেন? পিপাসা হচ্ছে সেই অনুভূতি, যা খুব সহজেই জানিয়ে দেয়, শরীরে পানির ঘাটতি হয়েছে। তাই তৃষ্ণা মেটাতে তাড়াতাড়ি পানি পান করতে হবে। সুতরাং একমাত্র পরিতৃপ্তির জন্য মাঝেসাঝে স্বাভাবিক পানির সঙ্গে ফ্রিজের পানি মিশিয়ে পান করা যেতে পারে। তবে অবশ্যই সেই পানির শীতলতা থাকবে পরিবেশ ও শরীরের তাপমাত্রার সহ-অবস্থানে। চিকিৎসক ফিরোজ আমিন বলেন, যাঁদের অ্যাজমা, টনসিলাইটিস কিংবা ঠান্ডাজনিত সমস্যা আছে, তাঁদের জন্য ফ্রিজের ঠান্ডা পানি একেবারেই নিষিদ্ধ।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>