ত্বকের ফাটা দাগ, ব্ল্যাকহেডস এবং গলা, কনুই ও হাঁটুর কালদাগ দূর করবেন কিভাবে!

ত্বকের ফাটা দাগ
ত্বক ফেটে যাওয়া ঠেকাতে সবচাইতে কার্যকরী উপায় হলো ত্বক ফাটা রোধ করা। বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় মায়েদের পেটের ত্বক অনেক বেশি ফেটে যায়। এক্ষেত্রে পেটের ত্বক ফাটার আগ থেকেই দাগ দূর করার ক্রিম ব্যবহার করতে হবে। কারণ হিসেবে নিউ ইয়র্ক শহরের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. র‍্যাচেল নাজারিয়ান জানান, ত্বক ফেটে যাওয়ার দাগ সম্পূর্ণভাবে দূর করা বেশ কষ্টসাধ্য একটি ব্যাপার। অনেকদিন লেজার চিকিৎসা নিলে দাগ কিছুটা দূর করা সম্ভব হয়। তবে নিজ ঘরে বসেও ত্বক ফাটা রোধ করা সম্ভব। কিছু ঘরোয়া উপাদান ব্যবহারের মাধ্যমে ত্বকে প্রদাহ কমিয়ে ফেলা যায়।

জেনে নিন কোন ঘরোয়া উপাদানগুলো ব্যবহারে ত্বকের ফাটাভাব কমিয়ে ফেলা যাবে।

ধারাবাহিকভাবে চিকিৎসা গ্রহণ করা
ত্বকের ফাটাভাব পুরোপুরিভাবে দূরে রাখতে চাইলে যেকোনো পণ্য অথবা ক্রিম ব্যবহারের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। এটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ধৈর্য ধরে ধারাবাহিকতা ধরে না রাখতে পারলে ত্বকে ফাটা দাগের প্রভাব দেখা দেওয়া শুরু করবে।

নারিকেল তেল ব্যবহার করা
প্রাকৃতিক এই তেলে রয়েছে প্রদাহ-বিরোধী উপাদান। যা ত্বকে উজ্জ্বলভাব আনতে ও ফাটাদাগ দূর করতে সাহায্য করে। ডা. নাজারিয়ান বলেন, ‘হাতের তালুতে পরিমাণ মতো নারিকেল তেল নিয়ে আক্রান্ত ত্বকের চারপাশে ভালোভাবে ম্যাসাজ করতে হবে। টানা তিন মাস প্রতিদিন নারিকেল তেল ব্যবহার অব্যাহত রাখতে হবে।’

আমন্ড অয়েল
ডা. নাজারিয়ানের মতে আমন্ড অয়েলে বিদ্যমান ভিটামিন-ই ত্বকের জন্য দারুণ উপকারী উপাদান। প্রতিদিন নিয়ম করে আমন্ড ওয়েল ব্যবহারে ত্বকের ফাটাদাগ দেখা দেওয়া বন্ধ হয়। একইসাথে ফাটা দাগ তৈরি হলে সেটা সারাতেও আমন্ড ওয়েল কার্যকরী।

ত্বকের ফাটা দাগ রোধে ভিটামিন-সি
ডা. নাজারিয়ান বলেন, ‘ক্লিনিক্যাল গবেষণা থেকে জানা যায়, ১২ সপ্তাহের জন্য প্রতিদিন ভিটামিন-সি গ্রহণে ত্বকের ফাটা দাগের ক্ষেত্রে উপকার পাওয়া যায়।’ ভিটামিন-সি গ্রহণের ক্ষেত্রে খুব বেশি চিন্তার কিছু নেই। লেবু, কমলালেবু, জাম্বুরাসহ বিভিন্ন ধরনের ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-সি পাওয়া যায়।

অ্যালোভেরা জেল ব্যবহার
দারুণ ময়েশ্চারাইজিং প্রাকৃতিক উপাদান অ্যালোভেরা জেল ত্বকের কোমলতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এবং ত্বকের ফাটাদাগ দূর করে। এমনকি চমৎকার এই উপাদান ত্বকের কাটাছেঁড়ার দাগ দূর করতেও কার্যকরী।

ব্ল্যাকহেডসের সমস্যা দূর হবে সহজেই
ব্ল্যাকহেডসের সমস্যা দেখা দেওয়া মুখের ত্বকের খুবই সাধারণ ও প্রচলিত একটি সমস্যা। মুখমন্ডলে নাক ও নাকের আশেপাশের অংশ, কপালের সামনের অংশ এবং চিবুকে এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। সাধারণত ব্ল্যাক হেডস তৈরি হয় রোমকূপে জমে থাকা ময়লা থেকে। আমাদের ত্বকের রোমকূপের সাথে সংযুক্ত থাকে সিবাসিয়াস গ্ল্যান্ড। এই সকল সিবাসিয়াস গ্ল্যান্ড সমূহ সিবাম নামক তেল উৎপন্ন করে থাকে। যা আমাদের মুখের ত্বককে কোমল ও নমনীয় রাখতে সাহায্য করে। এই তেল, মুখের মরা চামড়া এবং বাইরের ধুলাবালি ও ময়লা একসাথে মিশে গিয়ে রোমকূপে আটকে যায়। যেটা থেকেই তৈরি হয় ত্বকের গভীরে আটকে থাকা ব্ল্যাকহেডস। কখনো কখনো ব্ল্যাক হেডসের পরিবর্তে হোয়াইট হেডসও তৈরি হয়ে থাকে।

এছাড়াও, হরমোনাল সমস্যা, মুখের ত্বকে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রামণ এবং ব্রণের প্রাদুর্ভাব বেশী দেখা দিলেও ব্ল্যাক হেডসের সমস্যা দেখা দিয়ে থাকে। ত্বকের এই বিরক্তিকর সমস্যাটি থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য সকলেই সহজ ও সাধারণ কিছু উপায় খোঁজেন। একদম সাধারণ কিছু উপাদান দিয়ে ঘরোয়াভাবেই দূর করা যাবে ব্ল্যাকহেডসের সমস্যাটি।

ডিমের সাদা অংশ ও মধু
মাত্র দুইটি উপাদান দিয়ে তৈরি এই মাস্কটি ব্ল্যাক হেডসের সমস্যা দূর করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী কার্যকরি। কারণ ডিমের সাদা অংশে রয়েছে প্রোটিন ও অ্যালবুমিন। যা ত্বককে টানটান করতে সাহায্য করে। এছাড়াও, ব্ল্যাকহেডস দূর করতে ডিমের সাদা অংশ বেশ কার্যকরি। অপর দিকে মধু ত্বককে কোমল রাখতে সাহায্য করে।

যেভাবে ব্যবহার করতে হবে
প্রথমে একটি ডিম ভেঙ্গে সেটা থেকে ডিমের সাদা অংশ আলাদা করে নিতে হবে। এতে এক টেবিল চামচ পরিমাণ মধু ভালোভাবে মিশিয়ে মুখে মাখিয়ে নিতে হবে। এরপর অপেক্ষা করতে হবে মাস্কটি সম্পূর্ণ শুকিয়ে যাবার জন্য। শুকিয়ে গেলে কুসুম গরম পানির সাহায্যে মুখ ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে।

হলুদ ও পুদিনা পাতার মাস্ক
মুখের ত্বকের জন্য অন্যতম উপকারী মাস্ক এই দুইটি উপাদান দিয়ে তৈরি করা হয়। হলুদে রয়েছে খুব দারুণ অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল উপাদান। যা মুখের ত্বককে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে পুদিনা পাতার রস ত্বককে কোমল করে তুলতে এবং ত্বকের জ্বালাপোড়া ভাব দূর করতে সাহায্য করে।

যেভাবে ব্যবহার করতে হবে এর জন্য প্রয়োজন হবে এক টেবিল চামচ পরিমাণ খাটি হলুদ গুঁড়ো এবং দুই টেবিল চামচ তাজা পুদিনা পাতার রস। দুইটি উপাদান ভালোভাবে মিশিয়ে নিয়ে মুখে মাখাতে হবে। ১৫ মিনিট সময় অপেক্ষা করে কুসুম গরম পানিতে মুখ ধুয়ে নিতে হবে এবং ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে হবে।

দারুচিনি এবং লেবুর মাস্ক
ত্বকের গভীর থেকে ময়লা ও ব্ল্যাক হেডস পরিষ্কার করার জন্য এই মাস্কটি বিশেষ কার্যকরি। মাস্ক তৈরিতে ব্যবহৃত লেবু ব্ল্যাক হেডস, হোয়াইট হেডস এবং ব্রণের সমস্যা নিরসনে কার্যকরী। অন্যদিকে দারুচিনি ত্বকের বয়সের ছাপ কমাতে এবং রোমকূপ ছোট করতে সাহায্য করে।

যেভাবে ব্যবহার করতে হবে এই মাস্ক তৈরিতে প্রয়োজন হবে দুই টেবিল চামচ পরিমাণ দারুচিনি গুঁড়া এবং লেবুর রস। একসাথে দুইটি উপাদান ভালোভাবে মিশিয়ে ঘন পেষ্ট তৈরি করে নিতে হবে। পেষ্ট তৈরি হয়ে গেলে সেটা মুখের ব্ল্যাক হেডস যুক্ত অংশে মাখানোর ২০-৩০ মিনিট পর কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। এরপর অবশ্যই ভালো মানে কোন ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে হবে ত্বকে।

অ্যালোভেরা
নিজের ঘরে যদি অ্যালোভেরার গাছ থাকে তবে ব্ল্যাক হেডসের সমস্যা নিয়ে চিন্তা করার কোন প্রয়োজনই নেই! অ্যালোভেরা জেল মুখের ত্বকের বাড়তি তেল তৈরিতে বাধাদান করে এবং মুখের ত্বক কোমল হতে সাহায্য করে।

যেভাবে ব্যবহার করতে হবে ত্বকে ব্যবহারের জন্য একটি অ্যালোভেরার পাতা মাঝ বরাবর কেটে নিয়ে তার ভেতরের জেল চামচের সাহায্যে বের করে নিতে হবে। এই জেল মুখের ত্বকে মাখিয়ে ১০-১৫ মিনিট সময়ের জন্য রেখে দিতে হবে। এরপর সাধারণ তাপমাত্রার পানি দিয়ে মুখে ধুয়ে নিতে হবে।

গলা, কনুই ও হাঁটুর কালোদাগ
গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলোতে শরীরের নানান স্থানে কালো দাগ অনেকটাই বেশি হয়ে থাকে। কেননা ঘাম হয় বেশি আর ঘামে ভেজা কাপড়ের সঙ্গে ত্বকের ঘর্ষণে দাগও পড়ে বেশি। আজ যে ঘরোয়া রূপচর্চা টিপসটি উপস্থাপন করা হবে, তা পার্লারগুলোতে বহুল ব্যবহৃত। এতে কেবল একটি মিশ্রণ টানা ১০ দিন কালো দাগের স্থানে ব্যবহার করতে হবে। দাগের পাশাপাশি কনুই ও হাঁটুর রুক্ষতা ও শুষ্কতাও দূর করবে এই উপায়টি।

যা লাগবে
২ চা চামচ অরগানিক মধু
১ চা চামচ ভার্জিন অলিভ অয়েল
১ চা চামচ বেকিং সোডা
একটি বড় লেবুর অর্ধেক সদ্য রস করা (ঠিক ব্যবহারের আগে করতে হবে)

যা করবেন
-সমস্ত উপাদানগুলো একত্রে মিলিয়ে পেস্টের মতো করে নিন।
-এই পেস্টটি রোজ রাতে শোবার পূর্বে তৈরি করুন এবং শোবার সময়ে কালো দাগের স্থানে লাগিয়ে রাখুন।
-প্রতিদিন সকালে কালো দাগের স্থান গরম পানি দিয়ে ধুয়ে নিন। তারপর তোয়ালে দিয়ে আলতো করে মুছে নিন। ত্বকে একটু ভেজা ভেজা ভাব থাকবে।
-এরপর ভার্জিন নারিকেল তেল অল্প একটু মেখে নিন। ভালো করে ম্যাসাজ করে মিশিয়ে দিন।

মধু খুব ভালো একটি ময়েশ্চারাইজার, অন্যদিকে অলিভ অয়েল ত্বককে ভেতর থেকে পুষ্টি যোগায়। লেবুর রস ও বেকিং সোডা ত্বকের মরা কোষ ও কালো দাগ মুছে ফেলে। টানা ১০ দিন ব্যবহারে আপনি পাবেন নরম ও দাগহীন ত্বক।

বলিরেখা মুছে মসৃণ ও ফর্সা ত্বক পেতে
রূপচর্চায় ভাতের ব্যবহার প্রাচীন কোরিয়ান কৌশল। চীনেও সৌন্দর্যচর্চায় রাইস ওয়াটার বা রাইস ফেসপ্যাক ব্যবহার করা হয়। ত্বকের অকাল বলিরেখা মুছে ফেলতে ভাত একটি অত্যন্ত কার্যকর উপাদান। ভাতসমৃদ্ধ নানা রকমের ভিটামিন, যা ত্বকের ক্ষয় পূরণ করে এবং ত্বকে নিয়ে আসে তারুণ্যের দীপ্তি। একইসঙ্গে ত্বকের কালো দাগ ও ছোপ দূর করতেও ভাত অনন্য।

নানাভাবে তৈরি করা যায় রাইস ফেসপ্যাক বা ভাতের ফেসপ্যাক। তৈরি করতে প্রয়োজন হবে ভালো মানের পোলাওয়ের চাল, ভিটামিন ই, মধু ও সামান্য খাঁটি গোলাপ জল। জানিয়ে দিচ্ছি ব্যবহার ও তৈরির প্রণালি।

উপকরণ
১. পোলাওয়ের চাল কয়েক চামচ
২. সামান্য পানি
৩. গোলাপ জল ১ চা চামচ
৪. ভিটামিন ই ক্যাপসুল ২টি
৫. মধু ১ চা চামচ

প্রস্তুত প্রণালি 
১. পোলাওয়ের চাল অল্প পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখুন কয়েক ঘণ্টা। সাড়া রাত রাখলে সবচেয়ে ভালো।
২. সেই পানি দিয়েই চালগুলোকে কম আঁচে রান্না করুন। রান্না করতে করতে একদম জাউ বানিয়ে ফেলুন। সাদা, থকথকে একটা জিনিস হবে।
৩. এ বার ঠান্ডা হতে দিন। খুব বেশি ঠান্ডা করতে হবে না। কারণ এটা মুখে ব্যবহার করতে হবে কুসুম কুসুম গরম অবস্থায়।
৪. কুসুম কুসুম গরম থাকতেই মধু, গোলাপ জল ও ভিটামিন ই মিশিয়ে নিন।

ব্যবহার প্রণালি
১. মিশ্রণটি মুখে মেখে নিন সমানভাবে। মুখ ছাড়াও গলায় ও ঘাড়ে ব্যবহার করুন।
২. এবার শুকাতে দিন।
৩. আধা ঘণ্টা পর ফেসপ্যাক মুখ থেকে তুলে ফেলুন। স্বাভাবিক পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে নিন।
৪. এরপর ভালো কোনো ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন।
৫. সম্ভব হলে দৈনিক, না হলেও এক দিন পর-পর ব্যবহার করুন।
৬. ফ্রিজে রেখে ব্যবহার করবেন না, রোজ তৈরি করে নিন।

রাসায়নিকে ঠাসা প্রসাধনীর চেয়ে ঘরোয়া উপকরণে রূপচর্চা অনেক বেশি ফলদায়ক এবং নিরাপদ। সুস্থ থাকুন, সুন্দর থাকুন এই রমজানে।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>