কোন খাবার খেলে আপনাকে সুন্দর দেখাবে !

নানান উপকরণ একসঙ্গে মিলিয়ে বা গুঁড়া করে নানান প্যাক তৈরির ঝক্কিতে হয়তো নিজের ত্বক বা চুলের যত্ন নেওয়াই হয় না। ব্যস্ত জীবনে এই হ্যাপা কজন সামলাতে পারেন, বলুন তো? সময় নেই, তাই বলে থেমে থাকবে রূপচর্চা? একদমই তা নয়। রোজকার খাবারদাবার একটু বুঝেশুনে খেলে খাবার থেকেই মিলবে চুল, ত্বক ও নখের সৌন্দর্যের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চর্মরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হরষিত কুমার পাল বলেন, চুল, নখ ও ত্বক সুস্থ রাখতে প্রয়োজন সুষম খাদ্যাভ্যাস। প্রতিটি খাদ্য উপাদান গ্রহণ করতে হবে পরিমাণমতো। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শর্করা, আমিষ, স্নেহজাতীয় পদার্থ, ভিটামিন, খনিজ উপাদান ও পানি রাখতে হবে সঠিক পরিমাণে। কোনো খাদ্য উপাদান ত্বক বা চুলের জন্য উপকারী বলে সেই উপাদানটি অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রহণ করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি কোনো একটি খাদ্য উপাদান দৈনন্দিন চাহিদার চেয়ে কম পরিমাণে গ্রহণ করাও উচিত নয়।

তিনি আরও জানালেন, পানি যেমন ত্বকে আর্দ্রতা ধরে রাখে, তেমনি প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি পান করলে কিডনিতে সমস্যা হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তাই প্রয়োজনের তুলনায় কম বা বেশি পানি পান করা কোনোটিই ঠিক নয়; যতটা প্রয়োজন, ততটাই পান করতে হবে। আপনার শরীরের পানির চাহিদা মিটছে কি না, তা আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন। পানির চাহিদা পূরণ না হলে প্রস্রাবের রং হলুদ দেখায়, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়াও থাকতে পারে।

রূপচর্চায় খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্ব সম্পর্কে আরও জানালেন রূপবিশেষজ্ঞ সোনালী ফেরদৌসি মজুমদার। দেখুন তাঁর পরামর্শ।
১. প্রতিদিন গড়ে ৫০-১০০ চুল ঝরে যাওয়াটা স্বাভাবিক। স্বাভাবিক নিয়মে তা পূরণ হয়ে যায়। কিন্তু তা অতিরিক্ত হলে দুশ্চিন্তার কারণ। অযত্ন, অতিরিক্ত শ্যাম্পু ব্যবহার, রং ও রাসায়নিকের ব্যবহার, ঘন ঘন স্টাইল পরিবর্তন ইত্যাদি চুলের ক্ষতি করে। চুল মজবুত ও সুস্থ রাখতে আমিষজাতীয় খাবার প্রয়োজন। আমিষের অভাবে চুল পড়ে যেতে পারে। উজ্জ্বল ত্বক ও সুন্দর নখের জন্যও চাই আমিষজাতীয় খাবার। মাছ, মাংস, ডিম, বিভিন্ন ধরনের বাদাম, দুধ ও দুধের তৈরি খাবার থেকে আমিষ পাওয়া যায়।

২. আয়রনের অভাবেও চুল পড়তে পারে। একজন পুরুষের তুলনায় একজন নারীর খাবারের তালিকায় লৌহ বা আয়রনের পরিমাণ অনেক বেশি থাকা উচিত। কেননা, মাসিকের সঙ্গে প্রতি মাসে তাঁদের বেশ খানিকটা লৌহ হারাতে হয়, আর গর্ভাবস্থায় তো আরও বেশি। ১৯ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীদের প্রতিদিন প্রায় ১৮ মিলিগ্রাম আয়রন খাওয়া উচিত, আর গর্ভকালীন দরকার প্রতিদিন অন্তত ২৫ মিলিগ্রাম। তবে পুরুষদের প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ মিলিগ্রাম আয়রন গ্রহণ করলেই চলে। কচুশাকসহ অন্যান্য সবুজ শাক, পেয়ারা, আপেল, কলিজা প্রভৃতিতে আয়রন রয়েছে।

৩. ওমেগা ৩ আসলে অসম্পৃক্ত চর্বি। আমরা জানি, সম্পৃক্ত চর্বি দেহের জন্য ক্ষতিকর। তেল-চর্বিযুক্ত খাবার তাই খেতে মানা। কিন্তু অসম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাবার খেতে বাধা নেই, বরং এটি রক্তের উপকারী চর্বির পরিমাণ বাড়ায় এবং আদতে উপকারই করে। ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড চুলের গোড়া মজবুত করতে সহায়তা করে এবং চুলপড়া রোধ করে। ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিড মাথা ও দেহের ত্বক ভালো রাখে। মাছের তেল ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের ভালো উৎস।

৪. সুস্থ চুল ও সুস্থ ত্বকের জন্য আরেকটি প্রয়োজনীয় উপাদান ভিটামিন এ। ভিটামিন ‘এ’ এর অভাবে শরীরে প্রাপ্ত লৌহের স্বাভাবিক ব্যবহারে ব্যাঘাত ঘটে। তাই চুল ও ত্বকের সুস্থতায় ভিটামিন এ সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া জরুরি। এর সাথে সাথে ভিটামিন এ টিস্যু এবং পেশীকেও মজবুত করে। নিয়মিত এই ভিটামিন গ্রহণে দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতার ঝুঁকি কমে, দৃষ্টিশক্তির উন্নতি ঘটে এবং বয়সজনিত ত্বকের নানা চিহ্ন প্রকাশ ধীরে ঘটে। রঙিন শাকসবজি ও ফলমূলে রয়েছে ভিটামিন এ।

৫. চুলের আগা ফেটে যাওয়া রোধ করতে সাহায্য করবে বায়োটিন। বায়োটিন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন। এটি ওয়াটার সলুবল ভিটামিন বি সেভেন, যা ত্বক, চুল ও নখের স্বাস্থ্য এবং সৌন্দর্যের জন্যও অপরিহার্য। বায়োটিন চুলের জন্য ভালো। ডিম, কলা, চর্বিহীন লাল মাংস, গাঢ় সবুজ সবজি, মিষ্টি আলু, শিমের বিচি, কলিজা প্রভৃতি থেকে মিলবে প্রয়োজনীয় এই উপাদানটি।

৬. আমাদের শরীরে তিন শর বেশি এনজাইমের সঠিক পরিচালনের জন্য জিংক বা দস্তার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। প্রতিদিন আমাদের শরীরের জন্য ১৫ মিলিগ্রাম জিংকের প্রয়োজন হয়।জিংকের অভাবজনিত কারণে আমাদের চুলের স্বাস্থ্য নষ্ট হয়। এছাড়া ত্বকের কোষগুলোর জন্যও জিংক প্রয়োজন। আবার খাবারে বাড়তি একটু জিঙ্ক যুক্ত করলে ডিএনএর ক্ষয় ঠেকানো যায়। জিঙ্কযুক্ত খাবার খেলে তাই বুড়িয়ে যাওয়ার গতি কমে। শরীরে জিঙ্কের ঘাটতি হলে রক্তে শ্বেতকণিকার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। ফলে দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। গম, যবসহ বিভিন্ন শস্যকণায় মিলবে জিংক।

৭. ত্বকের সুস্বাস্থ্য ও উজ্জ্বলতার জন্য বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। এসবের অভাবে অনেক সময় ত্বক বিবর্ণ হয়ে যায়। ত্বকের জন্য এরকম একটি প্রয়োজনীয় উপাদান হলো ভিটামিন সি। এতে রয়েছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান, যা ত্বকের কোষে যেকোনো ধরনের ভাঙন প্রতিরোধ করে। ধূমপান, পরিবেশের বিভিন্ন দূষিত উপাদান এবং সূর্যালোকে অনাবৃত থাকার কারণে এ রকম ভাঙন শুরু হতে পারে। আবার, ভিটামিন সি-তে যে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট আছে, তা ভিটামিন ই-র মতো অন্য অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদানগুলোকে নতুন করে সক্রিয় করে তুলতে পারে। আপনার ত্বককে আরও সুস্থ, মসৃণ এবং তারুণ্যদীপ্ত দেখাতে চাইলে ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ ফলমূল ও শাকসবজি বেশি বেশি খান। লেবু, আমড়া, পেয়ারাসহ বিভিন্ন টক ফলে পাবেন প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি।

৮. নিজেকে সুস্থ সতেজ রাখতেই প্রয়োজন বাড়তি যত্ন। নিজেকে সুস্থ রাখার প্রধান শর্ত পানি পান। সেটা পুরুষ নারী উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।. এ ছাড়া চুল ও ত্বকের সৌন্দর্যে প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করতে হবে। প্রচুর পানি পান শরীরকে যেমন তরতাজা রাখবে তেমনি মসৃণ করবে ত্বক। বিশ্বব্যাপী ত্বকের যত্নে যখন নামি-দামি প্রসাধন সামগ্রীর ব্যবহার নজির বিহীন ভাবে বাড়ছে তখন বৃটিশ বিজ্ঞানীরা ত্বক সুন্দর রাখতে পানি নিয়ে একটি ভিন্নধর্ম দিয়েছে। তারা গবেষণায় দেখিয়েছেন, শুধু পর্যাপ্ত পানি পানের ফলে ত্বকে স্বাভাবিক পরিমাণ পানি থাকলে ত্বকের সৌন্দর্য বেড়ে যায় এবং ত্বকের ভাঁজ কমাতে সাহায্য করে।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>