কেমোথেরাপির সময় কোন খাবারগুলো সবচেয়ে বেশি উপকারি?

সকলের জন্যে ভীতিকর একটি শব্দ হলো ‘ক্যান্সার‘। যে রোগ মরণব্যাধি হিসেবে পরিচিত সেই রোগের নাম শুনে ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক। শরীরে ক্যান্সারের বীজ দানা বাঁধার একদম প্রথম দিকেই ধরা পড়লে সুচিকিৎসার মাধ্যমে রোগীকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব হয়। তবে, একদম প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ ধরা না পড়লে সেক্ষেত্রে রোগী ধীরে ধীরে মৃত্যুমুখে পতিত হতে থাকে। পূর্বে ক্যান্সারের কোন চিকিৎসা আবিস্কৃত না হওয়ার ফলে, ক্যান্সার শনাক্তকরণ মানেই ছিল নিশ্চিত মৃত্যু! তবে সময় এখন বদলেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যানে ক্যান্সার রোগের চিকিৎসা ও ঔষধ আবিস্কৃত হয়েছে। এগুলোর মাঝে অন্যতম নাম কেমোথেরাপি।

রেডিয়েশনের এই পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যাওয়ার ফলে রোগীর মাঝে অনেক বেশী পার্শ-প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে শুরু করে। এই পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার লক্ষণগুলো হচ্ছে চুল পড়া, ওজন দ্রুত কমে যাওয়া, অবসন্ন বোধ হওয়া, প্রবল বমিভাব দেখা দেওয়া, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া এবং মনোযোগের সমস্যা দেখা দেওয়া। এছাড়াও, অনেকেই খাবারের স্বাদ পাওয়ার অনুভূতি হারিয়ে ফেলেন। যার ফলে, তারা একেবারেই কোন খাবার খেতে আগ্রহী হন না। কিন্তু, কেমোথেরাপির উচ্চমাত্রার রেডিয়েশনের জন্য পুষ্টিকর খাদ্য খাওয়া রোগীদের জন্য খুবই জরুরি। খাদ্য থেকে রোগী তার যাবতীয় শক্তি পেয়ে থাকেন। এছাড়াও, কেমোথেরাপির কষ্টকর সময়গুলো পার করার জন্যেও তার যথেষ্ট শারীরিক শক্তির প্রয়োজন। যা কারণে, একজন ক্যান্সার রোগীর পুষ্টিকর ও গুণাগুণ সমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ করা খুবই জরুরি। এখানে এমন কিছু খাদ্যের তালিকা তুলে ধরা হলো।

শস্যদানা সমৃদ্ধ খাদ্য

শস্যদানা যুক্ত খাদ্যের মাঝে রয়েছে লাল চালের ভাত, হোল হুইট পাউরুটি, বার্লি প্রভৃতি। একজনের খাবার মতো শস্যদানা সমৃদ্ধ খাদ্যে রয়েছে সেলেনিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফাইবার, থায়ামিন, ভিটামিন-বি৬ এবং নায়াসিন। উপরোক্ত সকল খাদ্যই অনেক পুষ্টিকর এবং মুখের রুচি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে থাকে। এছাড়াও, শস্যদানা সমৃদ্ধ খাবারে থাকে  ফ্যাটিক অ্যাসিড (Phytic Acid)। যা সুস্থ মানুষের শরীরে ক্যান্সার তৈরি হতে বাধা প্রদান করে থাকে এবং ক্যান্সার রোগীর শরীরে ক্যান্সারের প্রকোপ বৃদ্ধিতে বাঁধাদান করে।

কমলালেবুর রস

কেমোথেরাপির ফলে অনেক সময় মুখের ভেতরের অংশ একসম শুষ্ক হয়ে ওঠে এবং শুধুমাত্র পানি এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ভূমিকা পালন করতে পারে না। ক্যান্সার ও কেমো রোগীদের জন্য এক্ষেত্রে কমলালেবুর রস খুব ভালো কাজ করে থাকে। কারণ, কমলালেবুর টকভাব স্যালাইভারি গ্ল্যান্ডের উপর কাজ করে পরিমাণের তুলনায় বেশি স্যালাইভা তৈরি করে থাকে। যার ফলে মুখের ভেতরের শুষ্কভাব অনেকটাই কমে যায়। তবে যে সকল ক্যান্সার রোগীদের মুখ ও গলার ভেতরে ব্যাথাভাব রয়েছে তাদের কমলালেবুর রস এড়িয়ে যাওয়া উত্তম।

আদা

ক্যান্সার রোগীদের উচ্চ রেডিয়েশন সম্পন্ন কেমোথেরাপি চলার ফলে অনেক সময় প্রবল বমি ভাব দেখা দেয়। এক্ষেত্রে আদা ও আদার লজেন্স খুব ভালো কাজ করে থাকে। প্রতিবেলার খাবার খাওয়ার পূর্বে কিছু পরিমাণে আদা খেলে পেট ও পাকস্থলীতে ভালো বোধ হবে। যার ফলে খাবার খেতে কষ্ট হবে না।

রসুন

কেমোথেরাপি গ্রহণের ফলে স্বাভাবিকভাবেই রোগী অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়েন। যার কারণে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে থাকে এমন খাদ্য উপাদান গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পরে। কারণ, এতে করে শরীরে শক্তি সঞ্চয় হয় ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়ায় করার জন্য। তাই প্রতিদিন ২-৩ কোয়া রসুন খাওয়া প্রয়োজন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য।

পেঁয়াজ

ক্যান্সার রোগীদের জন্য পেঁয়াজ দারুণ উপকারী একটি খাদ্য উপাদান। পেঁয়াজে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমূহ, যা ক্যান্সার রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে থাকে। কাঁচা অথাব রান্না করে যেভাবেই খাওয়া হোক না কেন, পেঁয়াজ খুবই জরুরি সকলের জন্য। বিশেষ করে ক্যান্সার রোগীর জন্য। কারণ পেঁয়াজ ক্যান্সারের কোষ বৃদ্ধিতে বাঁধাপ্রদান করে থাকে।

 

বাদাম

যে কোন ধরণের বাদাম, যেমন-কাজুবাদাম, কাঠবাদাম, ওয়ালনাট, হ্যাজেলনাট, পেস্তাবাদাম প্রভৃতি খাওয়ার ফলে স্তন্য ক্যান্সারের ক্ষেত্রে দারুণ সকল উপকারিতা পাওয়া যায়। যা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। বাদামে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমূহ। যা ক্যান্সার রোগীর শরীরে ক্যান্সার ছড়ানোর হার কমিয়ে আনে প্রায় অর্ধেক! প্রতিদিন অল্প পরিমাণে বাদাম খাওয়ার ফলে ক্যান্সারের প্রভাব ও প্রকোপ কমে যায় অনেকখানি।

ডাল

ডাল এবং ডাল জাতীয় খাদ্য উপাদান যেমনমটরশুঁটি, শিমের বিচি ও বিভিন্ন প্রজাতির ডালের রয়েছে নানা রকমের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা। প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে ডাল ও ডাল জায়িত খাদ্য যোগ করার ফলে, সেটা শরীরে ক্যান্সারের বিরদ্ধে লড়তে সাহায্য করে থাকে। গবেষণা জানাচ্ছে- ডালে রয়েছে সেলেনিয়াম, স্যাপোনিন্স, ফাইটাটেস, জিঙ্ক, আঁশ ও ফোলেট। যেগুলো অ্যান্টি-কারসিনোজেনিক (ক্যান্সার-বিরোধী) প্রভাব তৈরি করে শরীরে। ডালে থাকা আঁশ শরীরের ক্যান্সার কোষ কমাতে লক্ষণীয়ভাবে কাজ করে থাকে। প্রতিদিন ৪০০ মিলিগ্রাম পরিমাণ ডাল খাওয়ার ফলে শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণ পাওয়ার পাশাপাশি ক্যান্সার প্রতিরোধেও কাজ করে থাকে।

ক্যান্সার হলও অন্যতম ভয়ঙ্কর ও প্রাণঘাতী ব্যাধি। ধূমপান, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন প্রভৃতি কারণে ক্যান্সার দেখা দিতে পারে। শরীরে ক্যান্সারের উপস্থিতি দেখা দিলে একমাত্র চিকিৎসা হলো দ্রুত কেমোথেরাপি নেওয়া শুরু করা। যেহেতু কেপথেরাপি শরীর কে দূর্বল করে দেয়, সেক্ষেত্রে সঠিক খাদ্যাভাস এই সময়ে খুবই জরুরি একজন ক্যান্সার রোগীর জন্য।

About the Author

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>